এটা ঠিক, ২০৫০ সালের মধ্যে শতভাগ সৌরবিদ্যুতের লক্ষ্যমাত্রা একটু উচ্চাকাঙ্ক্ষী। কিন্তু প্রচেষ্টা চালাতে হবে এবং কাজটা শুরু করার জন্য আমাদের হাতে সময় খুবই কম। প্যারিস চুক্তি অনুসারে ২১০০ সালের মধ্যে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হলে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন শূন্যে নামিয়ে আনতেই হবে। জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাধারণ মেয়াদ ২২-২৫ বছর। ২০২১ সালে যদি একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে তাহলে তার কার্যকাল শেষ হবে ২০৪৩-২০৪৬ সালে। কিন্তু যে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ২০২৫ সালের পরে উৎপাদন শুরু করবে সেটি ২০৫০ সালেও বন্ধ করা যাবে না। ফলে ২০৫০ সালে শূন্য নির্গমনের লক্ষ্যও পূরণ করা যাবে না।

শূন্য নির্গমন নিশ্চিত করার আগে ধীরে ধীরে নির্গমন কমানোর উদ্যোগ নিতে হয়। এই সময়টাকে রূপান্তরকাল বলে। এই সময়ের মধ্যে ক্রমে একটা একটা করে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যায় আর সেই জায়গা দখল করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি। সাধারণত ১০-১৫ বছর সময়কে রূপান্তরকাল ধরা হয়। এই হিসাব অনুযায়ী ২০৩৫-২০৪০ সালের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করতে হবে। এর মধ্যে অন্যান্য খাতে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার বন্ধ হলে তবেই ২০৫০ সালে শূন্য নির্গমন নিশ্চিত করা যাবে। ২০৪০ সাল যদি চূড়ান্ত সময়সীমা হয়, তাহলে ২২ বছর আগেই বা ২০১৮ সালের মধ্যে নতুন জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করা উচিত ছিল। সুতরাং পৃথিবীর বহু দেশের মতো আমরাও সময়ের চেয়ে একটু পিছিয়ে পড়েছি। বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিলে আমরা দৌড়ে এগিয়েও যেতে পারি, যেমন এগিয়ে গেছি জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক নিজস্ব কৌশলপত্র ও তহবিল তৈরি করে।

গত ১০ আগস্ট দৈনিক সমকালে 'শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্ভব' শিরোনামে নিবন্ধ প্রকাশ হওয়ার পর কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। ১৮ লাখ একর খাসজমি থাকলেও সব জমি কি ব্যবহার করা সম্ভব? জমিগুলো ছোট ছোট আকারে নানা জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এ ছাড়া অনেক জমিতে দরিদ্র মানুষের বসবাস বা চাষাবাদ। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতি ইঞ্চি জমিতে শস্য উৎপাদন ছাড়া কোনো উপায় নেই। কিছু জমিতে বাজারঘাট, মসজিদ-মন্দির বা সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। শক্তিশালী ভূমি দখলকারীদের কবলে প্রায় অর্ধেক খাসজমি। আবার কোনো কোনো জমিতে ঠিকমতো সূর্যালোক পড়ে না। ঔচিত্যবোধ ও আইনের শাসনের প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে পারলে সমস্যাগুলো বাংলাদেশে নির্মমভাবে বাস্তব।

প্রথমেই খুঁজে বের করতে হবে, তিন থেকে চার একর অনাবাদি জমির কতটি খণ্ড দখলমুক্ত করা সম্ভব। এজন্য ভূমি অধিদপ্তরের বিশেষ কর্মসূচি দরকার। জমির ছোট খণ্ডগুলো এক মেগাওয়াট সৌর-বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য বরাদ্দ বা ভাড়া দেওয়া যায়। সেক্ষেত্রে গ্রাম বা মহল্লাভিত্তিক মিনিগ্রিড ও ন্যানোগ্রিডভিত্তিক বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে জুতসই উপায়। এ ধরনের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থা প্রচুর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। জাতীয় গ্রিডের জন্য নিবিড় পদ্ধতির সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বড় আকারের জমিই দরকার হবে।

শহুরে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ হতে পারে আমাদের জন্য আরেকটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। আমরা এখনও জানি না ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী, রংপুর সিলেট, গাজীপুর, ময়নসিংহ, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা বিভাগীয় শহরে কত বর্গমিটার ছাদ ব্যবহার করা সম্ভব। এজন্য ত্বরিত তবে বিস্তারিত জরিপ দরকার। এ ছাড়া সৌরবিদ্যুতের সরঞ্জামের কর অবকাশ, খানাভিত্তিক কর রেয়াত ও নগদ সহায়তা দিলে সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে বাড়ির ভাড়ার অতিরিক্ত অর্থ আয় করা যাবে। এর ফলে শহুরে মালিকরা বাড়ির ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে উৎসাহী হবেন। সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সরকারের টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) ও ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিডেট (ইডকল) উদ্যোগ নিলে এ কাজটি দ্রুতই সম্পাদন করা সম্ভব।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক পরিবর্তন এনে দিতে পারে সমন্বিত কৃষি-বিদ্যুৎ উৎপাদন পদ্ধতি। এশিয়ার মধ্যে প্রতিবেশী দেশ ভারত, চীন, জাপান, কোরিয়া, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামে ইতোমধ্যে অ্যাগ্রিভোল্টাইক্স সুফল দিতে শুরু করেছে। এ পদ্ধতিতে ভূমি থেকে ১২-১৫ ফুট উঁচুতে এক সারি সৌরবিদ্যুৎ মডিউল স্থাপন করে দুই সারি বা তার বেশি জায়গা ফাঁকা রাখা হয়। একটি সাধারণ মডিউল লম্বায় এক মিটার ও চওড়ায় ১.৬৫ মিটার। অর্থাৎ প্রতি এক সারি মডিউল বসানোর পর দুই মিটার ফাঁকা রেখে আবার এক সারি মডিউল বসানো হয়। এর ফলে মাঠের ফসল পর্যাপ্ত আলো পেতে পারে। অ্যাগ্রিভোল্টাইক্স পদ্ধতিতে জমির উৎপাদন ক্ষমতা গড়ে ৮০ শতাংশ অক্ষুণ্ণ থাকে।

প্রতি মেগাওয়াট অ্যাগ্রিভোল্টাইক্সের জন্য আমাদের দেশে ৮-১০ একর জমি দরকার হতে পারে। এ হিসাবে দেশের ২ কোটি ১১ লাখ একর জমিতে অ্যাগ্রিভোল্টাইক্স বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা ২১ লাখ ১০ হাজার মেগাওয়াট। এতটা নিশ্চয়ই সম্ভব নয়, দরকারও নেই। তবে ২০৫০ সাল নাগাদ আমাদের যে পরিমাণ বিদ্যুৎ লাগবে, সেটা এখান থেকেই মেটানো খুবই সম্ভব। অ্যাগ্রোভোল্টাইক্স-এর অন্য সুবিধাও আছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদে জমি ভাড়া দিয়ে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক তাদের আয় বাড়িয়ে নিতে পারে। শস্য উৎপাদন করে বছরের পর বছর লোকসানের মুখে থাকা কৃষক প্রতি একরে বার্ষিক নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা পেলে শস্য উৎপাদন লাভজনক হয়ে উঠবে। অপরদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা, বিতরণ, রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ইত্যাদি খাতে নতুন কর্মশক্তিও গড়ে উঠবে।

মানব জাতিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচাতে, বাংলাদেশকে বাঁচাতে আর সাশ্রয়ী মূল্যে টেকসই ও পরিবেশসম্মত বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেওয়া দরকার এখনই।

সদস্য সচিব, বাংলাদেশের বৈদেশিক দেনাবিষয়ক কর্মজোট