শ্রদ্ধাঞ্জলি

রাহাত ভাই- অনন্তের পাখি

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২০     আপডেট: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

আবেদ খান

এখন হঠাৎ করেই মনে হলো, একটি ঘটনা মনে পড়লে রাহাত ভাইকে জিজ্ঞেস করলে একটা উত্তর পাওয়াই যায়। রসসঞ্চারী বাক্যবিন্যাসে তিনি কিছু একটা বলবেনই। এমনকি অসুস্থ শরীরে ঢাকা ক্লাবের রেস্ট হাউসের রেস্টুরেন্টে দেখা হওয়ার সময়েও।

বলছি রাহাত খানের কথা। কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক রাহাত খান গত শুক্রবার বিষণ্ণ সন্ধ্যার পর আমাদের আরও বিষণ্ণ করে চলে গেলেন। সমকালে প্রকাশিত শোক সংবাদে যদিও বলা হয়েছে- তিনি দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগ, কিডনি, ডায়াবেটিসসহ বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন। কিন্তু আমরা জানি, রাহাত ভাই 'বৃদ্ধ' ছিলেন না। তিনি ছিলেন চিরতরুণ একজন মানুষ।

আসলে রাহাত ভাই ছিলেন মজলিসি মানুষ। ব্যয় করতে পারতেন প্রচুর সময় যে কোনো বয়সীয় সঙ্গে। মজার মজার পুরাণ কথা এবং কথার মধ্যে নানাবিধ প্রসঙ্গের অবতারণা করা ছিল তার অসাধারণ গুণ। দীর্ঘকাল তো দেখেছি তাকে অনেক কাছ থেকে। তার যৌবনকালের সেই ঝাঁকড়া চুল, শান্ত অথচ বুদ্ধিদীপ্ত দৃষ্টির আড়ালে যেন কিছু একটা খুঁজে বেড়ার প্রাণান্ত প্রয়াস, প্রমিত ভাষায় রোমান্টিক উচ্চারণ- সব মিলিয়ে একটা নিঃশব্দ আকর্ষণ বিকিরণ করতেন তিনি। ছোটখাটো মানুষটা কখন যে পড়াশোনা করেন, বুঝতে পারতাম না; কিন্তু আলোচনার আসরে কিছু কিছু উদাহরণ কিংবা উপমায় জানিয়ে দিতেন তার বোধের গভীরতা।

রাহাত খান আমার চেয়ে বছর পাঁচেকের বড়। তাকে প্রথম দেখেছি পাকিস্তান আমলে বড়জোর একদিন কি দু'দিন। তাকে দেখার কৌতূহল আমার প্রবল হয়েছিল আমার নামের পদবির সঙ্গে অদ্ভুত সাদৃশ্যের কারণে। তিনি তার নামটিকে একেবারেই ছোট করে দিয়েছিলেন বোধ হয় আমার ধারণা। বোধ হয় তার আধুনিক মনস্কারই ফসল। অত্যন্ত আধুনিক এবং শৌখিন মানুষ ছিলেন তিনি- পোশাকে পরিপাটি, রংচঙে।

রাহাত ভাই শিক্ষকতার পেশা পরিত্যাগ করে সাংবাদিকতার জগতে কেন এলেন- এ প্রশ্নটি তাকে আমি করেছি একবারই, যখন আমরা দৈনিক ইত্তেফাকে সহকর্মী ছিলাম। সংক্ষিপ্ত তিনটি শব্দে তিনি উত্তরটি দিয়েছিলেন- ভালো লেগেছে তাই। এরপর আর কোনোদিন এ প্রসঙ্গে তার আর আমার কথা হয়নি। অথচ আমরা ইত্তেফাক অফিসে পাশাপাশি কক্ষে কাটিয়েছি প্রায় ৩০টি বছর। এবং ইত্তেফাক অফিসের সম্পাদকীয় বিভাগে বিপুল আড্ডার আসরও বসিয়েছি। দেশের সাহিত্য অঙ্গনের অনেককে দেখেছি তার অপরিসর কক্ষে। রাহাত ভাইয়ের অভিন্ন হৃদয় বন্ধুদের একজন কবি রফিক আজাদ ইত্তেফাক ভবনের সাপ্তাহিক রোববার-এ কাজের ফাঁকে ফাঁকে তার কক্ষে বসে যখন গল্পের ঝাঁপি খুলতেন, তখন উল্টো দিকের মুখোমুখি প্রকোষ্ঠে বসে আমি উৎকর্ণ হয়ে শুনতাম সেসব গল্প। কখনও আসতেন আবু হেনা মোস্তফা কামাল, কখনও কখনও নতুন গল্পকার, কবি, ছড়াকারদের ঝাঁক বসত আসর জমিয়ে। কত যে বন্ধু ছিল তার। অসীম মমতা এবং স্নেহ বিতরণ করতেন তিনি অকৃপণভাবে। চা হাজির হতো ঘন ঘন, কখনও কখনও রাস্তার ওপার থেকে লুচি তরকারি, মিষ্টি। মাঝেমধ্যে রাহাত ভাই বন্ধুদের নিয়ে চলে যেতেন দুপুরের খাবার খেতে- যাওয়ার সময় বলে যেতেন, 'আবেদ, মঞ্জু সাহেব খোঁজ করলে বলো একটা জরুরি কাজে গেছি। জিজ্ঞেস না করলে কিছু বলার দরকার নেই।'

আমার সঙ্গে তার আর একটা বিশেষ বন্ধন ছিল- দাবা খেলা। আমি আমার কক্ষে দাবার বোর্ড আর ঘুঁটি রাখতাম। তিনি অফিসে এসে টুকটাক কাজ সেরেই বলতেন, 'কই আবেদ, তোমার ওইসব সরঞ্জাম বের করো দেখি, আজ তোমাকে হারিয়ে দিই।' যতবার নতুন করে ঘুঁটি সাজাতেন, ততবারই বলতেন- 'এবার অন্তত তোমাকে হারাবই।' আমার সঙ্গে তার বয়সের ব্যবধান বড়জোর বছর পাঁচ-ছয়, কিন্তু আমাকে তিনি ভাবতেন তার একান্ত অনুজ।

সেগুনবাগিচায় যে বাড়িতে আমরা বিয়ের তিন বছরের মাথায় উঠলাম, তারই নিচের তলায় বছরখানেকের মধ্যে রাহাত ভাইও এসে উঠলেন। আমরা ছাদের ওপরে একটা ছোট্ট দু'রুমের আস্তানায়, আর রাহাত ভাই উঠলেন সুপরিসর বেশ প্রশস্ত ফ্ল্যাটে। একই ঠিকানায় হওয়ার কারণে আমাদের যোগাযোগটা অধিকতর ঘনিষ্ঠ হলো। আর এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বড় কারণটি হলেন রাহাত ভাইয়ের দ্বিতীয় স্ত্রী নীনা ভাবি। অসাধারণ মমতাময়ী নারী। দু'হাত উজাড় করে দিতেন যখনই কেউ তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতো। রাহাত ভাইয়ের কাছে বিভিন্ন সময় ভাবির বিশাল মায়াময়ী চরিত্রের বর্ণনা শুনে আমরা হতবাক হয়েছি। আমরা একই ঠিকানায় বছর তিনেক থেকেছি; কিন্তু এই অল্প সময়েই রাহাত ভাই ও তার পরিবারের প্রতিটি সদস্য আমাদের অনেক বেশি কাছাকাছি হয়েছিলেন। সেই বাড়ি ছেড়ে যখন আমরা অন্য ঠিকানায় চলে যাই, তখন থেকে আমাদের পারিবারিক দূরত্ব বাড়তে থাকে- মানসিকভাবে নয়, অবস্থানগত দূরত্বের কারণে। একসময় আমি ইত্তেফাকের চাকরি ছেড়ে দিই, কাজেই আমাদের দেখা-সাক্ষাৎটাও হ্রাস পেতে থাকে ক্রমাগত। নীনা ভাবি প্রয়াত হওয়ার পর আমাদের যোগাযোগটি চলে যায় প্রায় শূন্যের কোঠায়।

কিন্তু আমার সঙ্গে রাহাত ভাইয়ের দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে অনেক অনুষ্ঠানে কিংবা ঢাকা ক্লাবের রেস্ট হাউসের রেস্টুরেন্টে। তার ঠোঁটের কোনায় মিষ্টি হাসির সম্ভাবনা কিংবা ছোটখাটো কোনো বিষয়ের ওপর কৌতুকমিশ্রিত মন্তব্য তাকে চিনিয়ে দিত যে তিনি বাংলা ভাষার একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী কথাশিল্পী।

রাহাত ভাই যদি নিবিষ্ট চিত্তে লেখায় মনঃসংযোগ করতেন, তাহলে আমাদের কথাসাহিত্যের দিগন্ত অনেক প্রসারিত হতে পারত। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, জীবন ও জীবিকার লড়াই তাকে স্থিত হতে দেয়নি। প্রবল অতৃপ্তি, অপরিসীম জীবনতৃষ্ণা এবং অন্তহীন স্বপ্ন তাকে 'অনন্তের পাখি'র মতো গগনচারী করেছে।

রাহাত ভাইকে মিস করি, মিস করব যত দিন বেঁচে থাকব।

সম্পাদক, জাগরণ