বর্ষায় প্রায় প্রতিবছর রাজধানীর সড়কের বেহাল চিত্র নতুন নয়। এ সময় সড়কের খোঁড়াখুঁড়ি এবং তা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনাও পুরোনো। এবারের অবস্থাও যে তথৈবচ, রোববার সমকালে প্রকাশিত 'রাজপথ তছনছ' শীর্ষক প্রতিবেদনে তা স্পষ্ট। অতিবর্ষণে রাজধানীর অধিকাংশ এলাকায় ভাঙাচোরা সড়কের যে চিত্র প্রতিবেদনটিতে এসেছে তা দুঃখজনক। এমনিতেই সড়কের কারণে নগরবাসীর ভোগান্তি বহুবিধ- গ্যাস-পানি-বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন লাইন বসানোর জন্য খোঁড়াখুঁড়ি, মেট্রোরেলসহ কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য সংকোচন; তার ওপর শহরে মোট আয়তনের কমপক্ষে ত্রিশ ভাগ সড়ক প্রয়োজন হলেও ঢাকায় রয়েছে মাত্র সাত ভাগ। বিপরীতে যানবাহন বেড়েছে আর সড়কের একটি অংশ নানাভাবে রয়েছে অবৈধ দখলে। এ অবস্থায় বর্ষায় সড়কের ভাঙন প্রতিবছর কতটা যন্ত্রণা নিয়ে হাজির হয় তা আমরা দেখছি। অথচ চাইলেই এ সমস্যা এড়ানো অসম্ভব নয়। অতিবর্ষণেও রাস্তায় যাতে পানি না জমে এমন ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এজন্য প্রথমেই রাজধানীর খালগুলোর পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি পানি নিস্কাশন ব্যবস্থা সচল রাখা প্রয়োজন। সাদা চোখে দেখলে, বৃষ্টির কারণে পানি জমে ভালো সড়ক ভেঙে যায়। কারণ রাজধানীর সড়ক তৈরিতে ব্যবহূত বিটুমিনের প্রধান শত্রু পানি। তাছাড়া দেশে সড়কের পিচ ঢালাইয়ে ব্যবহার হয় তরল জাতীয় বিটুমিন। সেই বিবেচনায় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় থেকে তরল জাতীয় বিটুমিনের পরিবর্তে গাঢ় বিটুমিন ব্যবহার নিশ্চিত করতে গত জুলাইয়ে নির্দেশনাও জারি করা হয়েছিল। কিন্তু সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। আমরা অস্বীকার করি না যে, বিটুমিনের তৈরি সড়ক বেশিদিন টেকে না বলে বিশেষজ্ঞরা কংক্রিট দিয়ে সড়ক নির্মাণের পরামর্শ দেন। যেভাবে ফি বছর রাজধানীর সড়ক সংস্কার করতে অর্থ গচ্চা যাচ্ছে, তার চেয়ে বেশি খরচে কংক্রিটের সড়ক নির্মাণ যুক্তিযুক্ত বলে অনেকে মনে করেন। কিন্তু আমরা সেই কারিগরি বিতর্কে যেতে চাই না। আমরা কেবল দেখতে চাই, রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করে নির্মিত রাজপথ টেকসই হয়েছে। এটাও স্বীকার করতে হবে, রাজধানীর কোনো সড়ক খনন করার প্রয়োজন দেখা দিলে সর্বোচ্চ ত্রিশ দিনের মধ্যে তা শেষ করা ও বর্ষা মৌসুমের আগেই খোঁড়াখুঁড়ি সম্পন্ন করার নীতিমালা থাকলেও বাস্তবে বেশিরভাগ সময়ই তা অনুসরণ করা হয় না। এ ক্ষেত্রে নাগরিক সেবার দায়িত্বে থাকা সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়হীনতাও কম দায়ী নয়।

খানাখন্দের পুরো প্রক্রিয়া একটি কাঠামোতে ও একই সময়ে নিয়ে এলে খরচ যেমন কমবে তেমনি নগরবাসীর দুর্ভোগও লাঘব হবে। কিন্তু একই সঙ্গে এই আশঙ্কা অমূলক হতে পারে না যে, বর্ষার আগে তড়িঘড়ি করে সড়ক সংস্কারের নেপথ্যে থাকে অন্য হিসাব। এই সরল বিশ্বাসের অবকাশ নেই যে- রাজপথ, সড়ক, মহাসড়ক সংস্কার কাজের গুণগত মান ও স্থায়িত্বের ঘাটতি নিছক আর্থিক বরাদ্দের জন্য। আমরা দেখছি, প্রতিবছরই রাজপথ বা মহাসড়ক রক্ষণাবেক্ষণে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ হয়। কিন্তু সংস্কার কাজ শেষ হতে না হতেই ফের ক্ষতবিক্ষত হতে থাকে। পরের বছর আবার বরাদ্দ, আবার দরপত্র বিজ্ঞপ্তি, আবার ঠিকাদারি ও ভাগবাটোয়ারা এবং আবার মোটামুটি বছরখানেকের মধ্যে নতুন বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তা। রাজপথ, সড়ক, মহাসড়ক সংস্কারের নামে একটি দুষ্টচক্র গড়ে উঠেছে বললেও অত্যুক্তি হয় কি? বস্তুত অতীতে বিভিন্ন সময়ে সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এমন চক্রের অস্তিত্বও মিলেছে। বর্ষা মৌসুমের আগে এমনকি ভর বর্ষায় তড়িঘড়ি করে সড়ক সংস্কারের যে 'সংস্কৃতি' প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা থেকে বের হয়ে আসতেই হবে। কারণ এতে কাজটি যেমন টেকসই হতে পারে না; তেমনি থাকে দুর্নীতিরও অবারিত সুযোগ। বলা বাহুল্য, বরাদ্দের পর্যাপ্ততা ছাড়াও ঠিকাদারদের দক্ষতা, উপকরণগত উপযুক্ততা, সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের আন্তরিকতা- সর্বোপরি সব পর্যায়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত ছাড়া এই দুষ্টচক্র থেকে মুক্তি কঠিন। সড়ক টেকসই না হওয়া মানে কেবল জনদুর্ভোগ নয়; আমাদের সামষ্টিক সর্বনাশে কারও কারও পৌষ মাস। এই মৌরসি পাট্টা ভাঙতেই হবে।