একটি প্রবাদ আছে- 'চণ্ডীপাঠ থেকে জুতা সেলাই' অর্থাৎ সব কাজই যাকে করতে হয় তিনি হচ্ছেন মাঠ প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা বা সমন্বয়ক। চোখ বন্ধ করেও একটা বিষয় কল্পনা করে নেওয়া যায়- মাঠ প্রশাসনে সার্বক্ষণিক কে কী কাজ করছেন। জেলা সদর ও উপজেলা সদরে অবস্থান করে জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসাররা (ইউএনও) সমগ্র জেলাবাসীর সেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন; কারণ এটিই তাদের দায়িত্ব। মাঠ প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো ইউএনও। এটি এমনই দপ্তর, যেখানে সব সমস্যার সমাধানই মানুষের প্রত্যাশা। কি দুর্যোগ, কি উৎসব, সাধারণ মানুষ তাকিয়ে থাকে প্রশাসন কী করে তার অপেক্ষায়। সেই মাঠ প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদধারী যদি অরক্ষিত থাকেন, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?
গত ৩ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট ইউএনও ওয়াহিদা খানমের সরকারি বাসভবনে তার ওপর যে মারাত্মক সহিংস আক্রমণ চালানো হয়, তা কোনো সাধারণ অপরাধ নয়। দুর্বৃত্তরা ওয়াহিদা খানমের বাবা মুক্তিযোদ্ধা ওমর আলী শেখের ওপরও চালায় বর্বরোচিত হামলা। গোয়েন্দাদের অনুমান এবং আটককৃতদের জবানবন্দি থেকে চুরির উদ্দেশ্যে অনুপ্রবেশ অতঃপর অপরাধ সংঘটনের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তা মেনে নেওয়া সত্যিই কঠিন। কঠিন এ কারণে যে, চুরিই যদি উদ্দেশ্য হয় তাহলে কোনো কিছু না নিয়েই অপরাধীরা  স্থান ত্যাগ করল কেন? তার মোবাইল ফোনটিও পড়ে ছিল শয্যাপাশে। তারা তো ধরেই নিয়েছিল তীব্র আঘাতের পর ওয়াহিদা খানমের মৃত্যু হয়েছে, অথচ কিছুই নিল না? নিশ্চয়ই আটককৃতদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি থেকে সত্যটা বেরিয়ে আসবে। 
ইউএনওদের বাধ্যতামূলকভাবে কর্মস্থলে থাকতে হয়। করোনার এই মহামারিতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত ইউএনওরা যেভাবে মানুষের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন, তা অনেকের দৃষ্টি এড়ায়নি বলে আমার বিশ্বাস। যে কোনো দৈব দুর্বিপাকে এলাকার সাধারণ মানুষ ইউএনওদের শরণাপন্ন হয়। মাঠ  প্রশাসনের এসব কর্মকর্তা ভুক্তভোগীর অভিযোগ শুনে যথাযথ প্রতিকার বা পরামর্শ দেওয়ার চেষ্টা করেন। পদাধিকারবলে ইউএনও উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি। তাদের দ্বারা সরাসরি নিষ্পত্তিকৃত কাজের বেশিরভাগই বিরোধ নিষ্পত্তিমূলক। তার মধ্যে রয়েছে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে খাদ্য এবং অন্যান্য ভোগ্যপণ্যে ভেজাল দেওয়ার অপরাধ শনাক্ত ও শাস্তি বিধান, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, মাদকদ্রব্য প্রতিরোধ, রাজস্ব প্রশাসন, জলমহাল, বালুমহাল, খাস জমি, হাটবাজার ইজারা বা ব্যবস্থাপনা। অধস্তন অফিসসহ ইউনিয়ন পরিষদের জনবলের অনিয়মে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণও তার অন্যতম দায়িত্ব। বলা বাহুল্য, এসব কাজে যে প্রতিকার বা আদেশ দেওয়া হয়, তা যে কোনো এক পক্ষকে সন্তুষ্ট ও অপর পক্ষকে সংক্ষুব্ধ করে। প্রভাবশালীদের স্বার্থ বিঘ্নিত হয় এমন আদেশও তাদের দিতে হয়। প্রতিটি আদেশের বিরুদ্ধে রিভিউ এবং আপিলের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনো কোনো সংক্ষুব্ধ মহল প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে আদেশদাতার ওপর জিঘাংসা চরিতার্থ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। ঘোড়াঘাটের ইউএনও ওয়াহিদা খানম কি এমন কোনো চক্রান্তের শিকার?
সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পাশাপাশি চলমান প্রকল্পের কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে জেলা প্রশাসক ও ইউএনওদের মতপার্থক্য দেখা দেওয়াসহ তাদের কাজে অন্যায়ভাবে হস্তক্ষেপ করা হয়।
গত ৫ সেপ্টেম্বর দৈনিক সমকালের দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় "আ'লীগ নেতার হুমকিতে কর্মস্থল ছাড়েন ইউএনও" শিরোনামে কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার ইউএনওকে বদলি হতে বাধ্য করার ঘটনার বিবরণ রয়েছে। প্রভাবশালী নেতা উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি এবং বেতবাড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান বাবুল আখতারের অব্যাহত হুমকিতে ইউএনও মৌসুমী জেরীন কান্তা নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কায় কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত আবেদন করেন। প্রভাবশালী মহল অবৈধ সুবিধা নিতে না পেরে বিভিন্ন অভিযোগের নামে তাকে বদলি করে দেয়। পরে এই নেতা জেলা প্রশাসকের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে মাফ চেয়েছেন বলে জানা যায়। 
সম্প্রতি মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক রহিমা খাতুনের বিরুদ্ধে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও কয়েকজন অবৈধ বালু উত্তোলনকারীর প্ররোচনায় ফৌজদারি আদালতে একটি মামলা হয়েছে, যা অসংলগ্ন কথাবার্তায় ভরা বলে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (বিএএসএ) কেন্দ্রীয় কমিটি সূত্রে জানা গেছে।
বিএএসএ গত ৫ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও ওয়াহিদা খানমকে একজন সৎ ও নির্ভীক কর্মকর্তা হিসেবে আখ্যায়িত করে তার ওপর হামলাকে 'পরিকল্পিত'  বলে অভিযোগ করেছে। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে বাধা দেওয়া প্রভৃতি কাজে কোনো কোনো মহল তার প্রতি বিরাগভাজন হতে পারে বলে তাদের ধারণা। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং ইউএনওদের নিরাপত্তায় ব্যাটালিয়ন আনসার নিয়োগের দাবি জানান সংগঠনের নেতারা। 
যে ভয়াবহ পরিস্থিতির মোকাবিলা ওয়াহিদা খানমকে করতে হয়েছে এবং এখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে তিনি যে সময় পার করছেন তা একজন মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তার জীবন কতখানি অরক্ষিত তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। তিনি মৃত্যুকে জয় করে পুরো স্মৃতিশক্তি নিয়ে ফিরে এলে নিশ্চয়ই দুস্কৃতকারীদের বিষয়ে তথ্য দিতে পারবেন। তবে ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে চিহ্নিত করার প্রচেষ্টা নেওয়া হলে তা হবে খুবই দুঃখজনক। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং বৃহত্তর সমাজের, বিশেষ করে পথভ্রষ্ট যুব সমাজের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের একটি বহিঃপ্রকাশ মাত্র। এদের কেউ কেউ যখন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পদপদবি ধারণ করে আস্টম্ফালন করে বেড়ায়, তখন তা নিয়ন্ত্রণের কোনো প্রচেষ্টা তেমন দেখি না। অপরাধ বা অঘটন ঘটলেই তড়িঘড়ি করে তাকে দল থেকে অব্যাহতি দেওয়া যেন এক নতুন সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।
আলোচ্য ক্ষেত্রে সন্দেহভাজন এবং ইতোমধ্যে দল থেকে বহিস্কৃতদের পরিচিতিটা একটু দেখে নেওয়া যাক। পত্রিকান্তরে জানা যায়, ঘোড়াঘাট উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর হোসেন এবং সদস্য আসাদুল ইসলামকে কেন্দ্রীয় যুবলীগ থেকে বহিস্কার করা হয়েছে।  জাহাঙ্গীর হোসেন বেপরোয়া, মাদক ব্যবসায় জড়িত এবং তার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য কর্তৃক ডিও লেটারের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে যুবলীগ থেকে তাকে বহিস্কারের সুপারিশ করা হয়। তখন কিন্তু কোনো ব্যবস্থাই গৃহীত হয়নি। তার ছত্রছায়ায় থেকে মাসুদ রানা, আসাদুল অপরাধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছিল। করোনাকালীন ত্রাণ বিতরণে এই গ্রুপটিই ঘোড়াঘাট পৌর মেয়রের ওপর হামলা চালায়। পত্রিকার মাধ্যমে পাওয়া এসব খবর একটি চলমান চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দেয় আর সেটি হলো রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন।
মাঠ এবং জেলা প্রশাসনে আমি নিজেও কাজ করেছি। ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। সে সময় বিধিমতো ব্যবস্থা নিতে গিয়ে নিজের কিছু অভিজ্ঞতাও তেমন সুখকর নয়। তবে ২০ বছর আগের সেসব ঘটনা এখনকার তুলনায় নিতান্তই সাধারণ ছিল। 
সমাজে, রাজনীতিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার। কতিপয় দুস্কৃতকারীর কারণে এই মহৎ গণতান্ত্রিক উপাদান কোনোভাবেই নস্যাৎ হতে দেওয়া যায় না, যাবেও না। তাই নিরাপত্তা হননকারীদের যথাযথ বিচার ও শাস্তি কাম্য। সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র অনুযায়ী নিষ্ঠুর নির্যাতন এবং অবমাননাকর আচরণসহ হামলার শিকার ইউএনও ওয়াহিদা খানম নিরপেক্ষ বিচার লাভের অধিকারী। একই সঙ্গে মাঠ প্রশাসনের সব পর্যায়ের কর্মকর্তার জীবন সুরক্ষিত করা প্রয়োজন। ওয়াহিদা খানম হত্যাচেষ্টার জন্য দায়ী ব্যক্তিরা যদি পার পেয়ে যায়, তাহলে মাঠ প্রশাসনের জন্য পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে ওঠার আশঙ্কা অমূলক নয়।
সদস্য, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন; সাবেক সচিব