করোনাদুর্যোগের এ সময়ে চালের দাম বিশেষ করে মোটা চালের দাম বৃদ্ধি দরিদ্র ও নিন্মবিত্ত এমনকি মধ্যবিত্তের ওপর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে আবির্ভূত হলেও এ ব্যাপারে সরকারের যথেষ্ট উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। আরও উদ্বেগের বিষয়- সরকারি খাদ্য গুদামে যে পরিমাণ চাল থাকার কথা, রয়েছে তার প্রায় অর্ধেক। আমরা জানি, খাদ্য গুদামের ঘাটতি পূরণ হয়ে থাকে মূলত বোরো মৌসুমে। করোনা পরিস্থিতির কারণে এবার ধান কাটা নিয়ে খানিকটা অনিশ্চয়তা দেখা দিলেও শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক উদ্যোগে পাকা ফসল কৃষকের গোলায় উঠেছিল। কিন্তু এক দফা সময়সীমা বাড়ানোর পরও বোরো ধান বা চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি খাদ্য অধিদপ্তর। বিষয়টি নিছক হতাশার হতে পারে। এর সঙ্গে প্রধান খাদ্যপণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ না থাকার বহুমাত্রিক সংকট জড়িত। এ সম্পাদকীয় স্তম্ভতেই আমরা ধান-চাল সংগ্রহের সূচনালগ্নে তাগিদ দিয়েছিলাম, যেন সরকারি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়। কিন্তু আমাদের উদ্বেগ আমলে না নেওয়ার ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। সে সময় চালকল মালিকরা সরকারি দামে খাদ্য গুদামে ধান ও চাল সরবরাহে যে অনীহা প্রদর্শন করে তা দুঃখজনকভাবে এখনও স্পষ্ট। যেসব চালকল মালিক চুক্তি অনুযায়ী সরকারকে চাল সরবরাহ করেননি, সংগ্রহ নীতিমালা ও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সরকার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে কিনা আমরা জানি না। চলমান চালের দাম বৃদ্ধির পেছনে ব্যবসায়ীদের কারসাজিও আমরা দেখছি। মঙ্গলবার এ সংক্রান্ত সমকালের প্রতিবেদনে এসেছে, মিল মালিকসহ কিছু অসাধু ব্যবসায়ী নিজেদের গুদামে চাল মজুদ করে নতুন ধান আসার আগে বাড়তি অর্থের লোভে চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা মনে করি, খাদ্য গুদামে চালের মজুদ হ্রাস এবং বাজারে দাম বৃদ্ধির দায় খাদ্য মন্ত্রণালয় এড়াতে পারে না। মনে রাখতে হবে, কৃষক তার দায়িত্ব পালন করেছে। দেশের প্রধান ধান মৌসুমে করোনা পরিস্থিতি, ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও দফায় দফায় বন্যা মোকাবিলা করেও তারা বাজারে ধান ও চালের জোগান দিতে পেরেছিল। কৃষি মন্ত্রণালয়ও বলছে, দেশে পর্যাপ্ত ধান উৎপাদন হয়েছে। সেই ধান খাদ্য গুদামে তুলে আনার দায়িত্ব ছিল খাদ্য মন্ত্রণালয়ের। আমাদের মনে আছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে মোটা চাল রপ্তানির ব্যাপারে ইতিবাচক কথাবার্তা বলা হয়েছিল। তখন আমরা বলেছিলাম, দুর্যোগ ও দুর্বিপাকের এই দেশে প্রধান খাদ্যপণ্য রপ্তানি দূরদর্শিতার পরিচায়ক হতে পারে না। কৃষি মন্ত্রণালয়ও সংকট নিরসনে আমদানির সিদ্ধান্তকে অনুৎসাহিত করেছিল ধান উৎপাদন বিবেচনায় নিয়ে। যদিও আমরা মজুদ রক্ষায় আমদানি করে রাখার পরামর্শই দিয়েছিলাম। এখন ভরা মৌসুমে চালের দাম যখন বাড়ছে, তখন 'গরিবের কথা বাসি হলে ফলে' প্রবাদটি মনে পড়ছে। বাজারে চালের দাম কেন বাড়ছে- এটা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। বস্তুত এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেও আমরা অনেকবারই আলোচনা করেছি। হতে পারে, করোনা ও বন্যায় ত্রাণ কার্যক্রমে বিশেষত মোটা চাল প্রদানে মজুদে টান ফেলেছে। কিন্তু প্রধান কারণ নিঃসন্দেহে কৃষক ও বাজারের মধ্যস্বত্বভোগীদের ধান-চাল মজুদকরণ। আমরা মনে করি, দুর্যোগের কারণে মোটা চালের চাহিদা আরও বাড়বে এবং সরকার এখনই ত্বরিত পদক্ষেপ না নিলে চালের দাম আরও বৃদ্ধি পাবে। এ অবস্থায় আমরা চাই ধান-চাল সংগ্রহের বর্ধিত মেয়াদ তথা পনেরো সেপ্টেম্বরের মধ্যেই সরকারি মজুদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হবে। একই সঙ্গে মোটা চালের মজুদ কম অথচ চাহিদা বেশি হওয়ার কারণে চাল আমদানি করারও প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। তবে এই মুহূর্তে তার চেয়েও জরুরি হলো স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য কম দামে চাল বিতরণ। মনে রাখতে হবে, চালের বাজারে অস্থিরতার কারণ ও পরিণতি নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। কীভাবে এই সংকট সময় থাকতেই মোকাবিলা করা যায়, সেই আলোচনাও কম হয়নি। এখন প্রয়োজন অবিলম্ব পদক্ষেপ। কৃষি, খাদ্য ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সময় থাকতেই সমন্বিত এক ফোঁড় দিক।