বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য, ঢাকা জেলা কমিটির সভাপতি, অগ্নিযুগের বিপল্গবী কমরেড সুনীল রায় ১৯২১ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর থানার শ্যামগ্রামে নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা দেবেন্দ্র রায় এবং মা শষীবালা রায়। আট ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। নবীনগরের এম কে মাধ্যমিক স্কুলে পড়া অবস্থায় বাড়ি থেকে পালিয়ে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইলে চিত্তরঞ্জন কটন মিলে তাঁত শ্রমিক হিসেবে যোগদান করেন।
ওই সময় এ অঞ্চলে শ্রমিকদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে শ্রমিক আন্দোলন চলছিল। তিনি সেই আন্দোলনে যোগ দেন। অল্প কিছুদিনের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯৩৮ সালে তিনি কমরেড নলিনী ভট্টাচার্যের মাধ্যমে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৪৪-৪৬ সালে ভারতজুড়ে যে শ্রমিক আন্দোলন প্রবলভাবে সংগঠিত হয়, সেই আন্দোলনে ঢাকা অঞ্চলে কমরেড নেপাল নাগ, কমরেড অনিল মুখার্জি, কমরেড মৃণাল চক্রবর্তী, কমরেড ননী চৌধুরী, কমরেড অমর গাঙ্গুলীর সঙ্গে কমরেড সুনীল রায় ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। তিনি নারায়ণগঞ্জ-শ্যামপুর-পোস্তগোলা অঞ্চলে শ্রমিকদের সংগঠিত করেন। এই কাজ করতে গিয়ে ১৯৪৮ সালে তিনি চাকরিচ্যুত হন। তাতে দমে যাননি।
সুনীল রায় নিজের জীবন থেকে সাম্যবাদের দীক্ষা নিয়েছিলেন। পড়ালেখা না করতে পেরে অল্প বয়সে শ্রমিকের কাজ করতে যেয়ে তিনি শ্রমিক শোষণ হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন। আর ওই সময়ের কমিউনিস্টদের আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত থেকে তিনি মুক্তির পথ খুঁজে পেয়েছিলেন। তাই তো আমৃত্যু কমিউনিস্ট জীবনযাপন করেছেন। কমরেড সুনীল রায় শুধু স্বল্পভাষী ছিলেন না, ছিলেন মিত্যবায়ী, সাদাসিধে জীবনযাপনে অভ্যস্ত। সততা-আদর্শ ও ত্যাগের এক মূর্তমান প্রতীক। শান্ত স্বভাবের হলেও তিনি আর্দশের প্রশ্নে অগ্নিরূপ ধারণ করতেন।
সোভিয়েত বিপর্যয়ের পর ১৯৯৩ সালে বিলোপবাদী-সংস্কারবাদীরা পার্টিকে চরম সংকটে ফেলে দেয়। ডাকসাইটে নেতারা যখন বিভ্রান্ত, তখন সুনীলদারা ইস্পাতদৃঢ়তায় লাল পতাকা উড্ডীন রেখে কমিউনিস্ট পার্টিকে আবার সংগঠিত করেছেন। তিনি পার্টির কাজ করতে যেয়ে বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন, আত্মগোপনে গিয়েছেন, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কিন্তু পার্টির কাজ শ্রমিক-মেহনতি মানুষের সংগ্রাম থামিয়ে দেননি।
সুনীল রায় স্বাধীনতার পর সূত্রাপুরের রেবতি মোহন দাশ রোডে ন্যাপ নেতা মনিন্দ্র গোস্বামীর বাড়িতে থাকতেন। ঢাকা শহরে পার্টির যতগুলো গোপন আস্তানা ছিল এটি তার মধ্যে একটি। তিনি প্রতিদিন সূত্রাপুর থেকে পার্টি অফিস পল্টনে হেঁটে যেতেন ও আসতেন। পথে বিভিন্ন বাড়িতে যেতেন, কথা বলতেন। তার পকেটে চকলেট দেখতাম, হাতে খেলনা। যে বাড়িতে গিয়েছেন, সেখানকার শিশু-কিশোরদের জন্য।
অকৃতদার সুনীল দা নিজের প্রতি খুবই উদাসীন ছিলেন, শেষ দিকে বিভিন্ন রোগে ভুগেছেন। অসুস্থতা যখন দীর্ঘস্থায়ী হলো, প্রিয় এলাকা নারায়ণগঞ্জে থাকতেন। কমরেড শিবনাথ চক্রবর্তীর দেশ ফার্মেসির দ্বিতীয় তলায়। তাকে ওই সময় নিবিড়ভাবে সেবা করতেন কমরেড মহিবুল্লাহ, কমরেড কালাচান মিয়া, কমরেড শিশিরসহ অনেকেই।
সুনীল রায় ১৯৯৮ সালের দিকে হাসপাতালে ভর্তি হন। একজন করে পার্টি কমরেড তার সেবার জন্য থাকত। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল কয়েক রাত থাকার। তিনি বলতেন- 'শুধু তত্ত্ব পইড়ো না মিয়া। মাকর্সবাদী সাহিত্য পইড়ো। শরৎ-নজরুল-রবীন্দ্র-সুকান্তগো না পড়লে বাংলাদেশ জানবা কী কইর‌্যা? আগে দেশটারে জানো, তাইলে দেশের জন্য কাজ করে যাইব্যা।'
২০০১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ৮১ বছর বয়সে কমরেড সুনীল রায়ের জীবনাসান ঘটে। মৃত্যুর কিছুদিন আগে জানতে চেয়েছিলাম, দাদা বিপ্লব কি হবে? তিনি উঠে শয্যা থেকে উঠে বসে তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন- 'বিপ্লব হইবো না মানে? বিপ্লব হইবোই। দেখসনা দেশেটার কী অবস্থা? দেশের মানুষগুলার কী অবস্থা? বইয়্যা না থাইক্যা মানুষের মাঝে যা।'
আজ কমরেড সুনীল রায়ের ১৯তম মৃত্যুবার্ষিকী। কমরেড সুনীল রায়ের আদর্শ ও চেতনা ধারণ করা আজ সবচেয়ে জরুরি।
সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, ঢাকা মহানগর সংসদ

বিষয় : সুনীল রায় আমাদের প্রেরণা

মন্তব্য করুন