রাজনীতি মানে 'নীতির রাজা'। অর্থাৎ যে নীতিটা সাধারণের জন্য সবচেয়ে বেশি কল্যাণময়ী, মঙ্গলজনক এবং সর্বোত্তম ব্যবস্থা হিসেবে গৃহীত হয় তা-ই হলো রাজনীতি। তবে এই নীতি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে যারা রাজনীতি করতে চান তারা আজ নানাভাবে বিপদগ্রস্ত বা উপেক্ষিত। যাদের কুৎসিত নীতির কাছে এই খাঁটি নীতি প্রতিনিয়ত মার খাচ্ছে, তাদের নীতিই এখন 'পলিটিক্স' হিসেবে পরিচিত।
মানুষ যখন মহামারি করোনাভাইরাসের আতঙ্কে একেবারে দিশেহারা তখন সাধারণের মধ্যে এরূপ বদ্ধমূল ধারণা জন্ম নিতে শুরু করল যে, মানুষ অন্তত এখন তাদের স্বাভাবিক সুন্দর জীবনযাপন করবে এবং রাজনীতিবিদরা তাদের সর্বোত্তম রাজনীতিতে ফিরে আসবেন। মানুষ মানুষের জন্য সবকিছু নিঃস্বার্থভাবে উজাড় করে দেবে। মানুষ মানুষের পাশে এসে দাঁড়াবে, মানুষের কল্যাণের জন্য যা যা প্রয়োজন সম্মিলিতভাবে তাই করবে। মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না, দেশে দেশে কোনো যুদ্ধবিগ্রহ তো নয়ই; বরং প্রতিবেশীসুলভ বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে এক দেশ আরেক দেশের পাশে এসে দাঁড়াবে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আর কোনো দ্বন্দ্ব্ব-সংঘাত কখনও হবে না। অর্থাৎ মানুষ মনে করল, করোনার এই ক্রান্তিকালে স্বতঃসিদ্ধ পূর্ণতায় মানুষ সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠবে।
বাস্তবে আমরা কী দেখছি? কেউ কারও পাশে এসে দাঁড়ানো তো দূরের কথা, যেন কেউ কারও নয়। পরিবারের যে কোনো সদস্য আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছে অস্পৃশ্য হয়ে যাচ্ছেন। নিকটজনের করোনায় মৃত্যু হলে কেউ তার কাছে ঘেঁষছে না, নিরুপায় হয়ে থানার পুলিশ বা ইউএনওরা সৎকার করছেন। একে অন্যের বাড়িতে স্বাভাবিক যাওয়া-আসা প্রায় বন্ধ। এদিকে যারা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় ব্যক্তি সেই চিকিৎসকরা চেম্বার বন্ধ করেই ক্ষান্ত হননি; নিতান্ত জরুরি না হলে কভিড রোগীর কাছেই যাচ্ছেন না। নন-কভিড রোগীদের করোনার ভয়ে হয় তাদের অন্যসব রোগ চাপা পড়ে গেছে, না হয় তারা প্রয়োজনীয় ট্রিটমেন্ট পাচ্ছেন না।
বিশ্বে কভিড রোগীর সংখ্যা শতকরা ০.৩২ জন। অথচ বাকি মানুষকে কভিড রোগী সন্দেহে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে না। জীবন চলাচল সাংঘাতিক রকম বিপর্যস্ত, দর্শকবিহীন মাঠে খেলাধুলা হয়, শিল্পীরা তাদের শৈল্পিক কর্মকাণ্ড ভুলে যেতে বসেছেন, স্কুলের শিক্ষকরা কৃষিকাজ করছেন, ছাত্রছাত্রীরা জানে না তাদের শিক্ষার ভবিষ্যৎ কী, কোনো সরকারই জানে না তাদের দেশটি কবে নাগাদ কভিডমুক্ত হবে।
অণুজীব বিজ্ঞানীরা বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হলেন। অন্য বিজ্ঞানীরাও হাত-পা গুটিয়ে আধামরা মানুষের মতো মনে মনে শপথ নিলেন- আর কখনও তারা মানুষ মারার মারণাস্ত্র বানাবেন না। তারাও অণুজীব বিজ্ঞানীদের অনুসারী হয়ে গেলেন। কায়মনোবাক্যে সবাই প্রার্থনা করতে শুরু করলেন, তারা যেন দ্র্রুত কিছু একটা আবিস্কার করে মানব জাতিকে উদ্ধার করেন। অণুজীব বিজ্ঞানীরাও সবকিছু বাদ দিয়ে করোনার ওষুধ বা ভ্যাকসিন আবিস্কারে মনোনিবেশ করলেন।
ইতোমধ্যে কেউ কেউ প্রতিষেধক আবিস্কার করে ফেলেছে বলে দাবি করতে শুরু করল। অর্থাৎ শুরু হলো রাজনীতির পলিটিক্স। ভ্যাকসিন আবিস্কারের ম্যারাথন দৌড়ে অণুজীব বিজ্ঞানীরা অংশ না নিলেও পলিটিশিয়ানরা কেউ বসে নেই। তাদের রাজনৈতিক ছক বিজ্ঞানের চেয়েও জটিল। বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তা কখনও অপ্রকাশিত থাকে না। প্রথমে কাগজে কলমে এবং শেষে তার ব্যবহারিক পরীক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। পলিটিশিয়ানদের কার্যকলাপে যা কিছু দৃশ্যমান তার চেয়ে বেশি থাকে তাদের মগজে। বিজ্ঞানীরা যেটুকু করেন; বলেন তার চেয়েও অনেক কম। আর রাজনীতিবিদরা যেটুকু করেন; বলেন তার চেয়ে ঢের বেশি।
বিজ্ঞানীদের যে কোনো বিষয়ে একটা শেষ কথা থাকে কিন্তু পলিটিশিয়ানদের শেষ কথা বলে কোনো কথা নেই। করোনাভাইরাসের জন্মের উৎস থেকে এখন পর্যন্ত তার যে বিশ্বময় বিস্তার তাতে সংশ্নিষ্ট বিজ্ঞানীরা যেটুকু কথা বলেছেন তার চেয়ে শতগুণ কথা পলিটিশিয়ানরা বলে ফেলেছেন। পলিটিশিয়ানরা করোনাকে মারতে কটকটে রৌদ্দুর থেকে শুরু করে ডিটারজেন্ট পাউডার পর্যন্ত কোনো কিছু বাদ রাখেননি। পলিটিশিয়ানরা এসব কথা বলে বলে একজন মানুষকে বাঁচাতে না পারলেও সংখ্যার হেরফেরে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে ফেলেছেন প্রচুর। ভ্যাকসিন আবিস্কারের নিয়মমাফিক চৌহদ্দি পার না করেও শতভাগ সাফল্যের দাবি আগেভাগে পলিটিশিয়ানরাই করেছেন। এ জন্যই হয়তো হ্যারল্ড ল্যাজয়েল বলেছিলেন- 'রাজনীতি হলো যে যা, যখন যেভাবে পায় সেটাই।'
একশ' বছরের মধ্যে এরকম মহামারির আবির্ভাব না ঘটলেও ইতোমধ্যে এই ভাইরাসের কারণে বিগত একশ' বছরের সব রাজনৈতিক হিসাবনিকাশ পাল্টে গেছে। ভদ্মাদিমির লেনিনের মতে, 'রাজনীতি হলো অর্থনীতির সবচেয়ে ঘনীভূত বহিঃপ্রকাশ।' এই কথার চূড়ান্ত প্রতিফলন আমরা দেখতে পাচ্ছি। অধিকাংশ দেশের অর্থনীতিতে শনির দশা চললেও আবার করোনার কারণে কারও কারও বৃহস্পতি এখন তুঙ্গে। ভ্যাকসিন আবিস্কারে পুরোপুরি সাফল্য না এলেও এটাকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক চিন্তা মাথায় রেখে রাজনীতির পলিটিক্স শুরু হয়ে গেছে পুরোদমে। ভ্যাকসিন বণ্টনের কারণে কোন দেশ কতটা আক্রান্ত তার চেয়ে অনেক বেশি বিবেচ্য হয়ে উঠতে পারে কোন দেশ কতটা রাজনৈতিক কূটকৌশলে এগিয়ে বা বাণিজ্যিক বিবেচনায় অগ্রগামী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যতই ওষুধ বণ্টনে সমতার বুলি আওড়াক না কেন, মোড়ল রাষ্ট্রের বিবেচনাকে তারা দমাতে পারবে না মোটেও। সুষম বণ্টনের সেই সুন্দর রাজনীতি কুৎসিত পলিটিক্সের কাছে কতটা টেকসই হয়, তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতেই হবে।
সমাজকর্মী

বিষয় : ভ্যাকসিনের 'পলিটিক্স'

মন্তব্য করুন