'রবীন্দ্রনাথ কেন জরুরি' শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। নাতিদীর্ঘ লেখা, কিন্তু তাতেই চোট লেগেছে অনেকের। তাদের মধ্যে একজন দৈনিক আল ইহসান ও মাসিক আল বাইয়ি্যনাত পত্রিকার সম্পাদক। তিনি এক পা এগিয়ে আইনি নোটিশও পাঠিয়েছেন। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছেন, 'আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করব, তার পরিচয়ে নিজেদের পরিচয় দেওয়া গর্ববোধ করব।' কিন্তু নোটিশদাতার কাছে মনে হয়েছে, এ রকম মনে করার কোনো যৌক্তিকতা নেই; তার মতে, 'রবীন্দ্রনাথ নিয়ে এসব মন্তব্য প্রকৃত সত্যের অপলাপ, ইতিহাসবিকৃতি ও রবীন্দ্রনাথের ওপর দেবত্ব আরোপের অপচেষ্টা মাত্র।' তা তিনি মনে করতেই পারেন। কিন্তু মুশকিল হলো, তার সেই মনে করাটাকে তিনি চাপিয়ে দিতে চাইছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ওপর, সবার ওপর।
এর আগে ধর্মের অবমাননা করা হয়েছে, এমন অভিযোগে গত ১৯ আগস্ট চট্টগ্রামের একটি আদালতে মামলা করা হয়েছে ডা. জাফরুল্লাহ্‌ চৌধুরীর বিরুদ্ধে (দেশ রূপান্তর, ২০ আগস্ট)। মামলা করেছেন চট্টগ্রামের হাটহাজারীর বিপ্লব দে। তার অভিযোগ, জাফরুল্লাহ্‌ চৌধুরী এক সমাবেশে সনাতন ধর্ম, ধর্মগ্রন্থ এবং ধর্মপ্রবর্তকদের নিয়ে যেসব মন্তব্য করেছেন, তা দেশের কোটি সনাতন ধর্মাবলম্বীর মনে আঘাত দিয়েছে।
এদিকে গত ২৪ আগস্ট সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ নিষিদ্ধ করেছে 'জংশন' থেকে ছাপা হওয়া সাইফুল বাতেন টিটোর লেখা বই 'বিষফোঁড়া'। উপন্যাস হওয়ার পরও বইটির বিষয়বস্তু 'শিশু ধর্ষণ', 'দেশের শান্তিশৃঙ্খলার পরিপন্থি' বা 'জননিরাপত্তার জন্য হুমকি' মনে করা হচ্ছে। এর আগে ১০ আগস্ট দেশের অন্যতম প্রধান বই বিপণিকেন্দ্র 'বাতিঘর'-এর স্বত্বাধিকারী দীপঙ্কর দাশ ও লেখক সালেহ আহমেদ মুবিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার। বাতিঘরের বিভিন্ন বিক্রয়কেন্দ্রে বিক্রির উদ্দেশ্যে রাখা সালেহ আহমেদ মুবিনের 'লোশক' বইটির সংক্ষিপ্তসার প্রতিষ্ঠানটির ফেসবুক পেজে প্রকাশের পরপরই এ নিয়ে আপত্তি ওঠে। ধর্মানুভূতিতে আঘাত করায় ১০ কোটি টাকার মানহানির মামলা করেছেন রূপায়ণ কান্তি চৌধুরী।
আমাদের গ্রামাঞ্চলে এবং আমার ধারণা, সারাদেশেই কৌতুকচ্ছলে এই কথাটি বলা হয়ে থাকে,- 'টাউনে যখন আসলামই, তখন চাচার নামে একটা মামলা করেই যাই'। কৌতুকচ্ছলে বলা হয় বটে, কিন্তু এর অর্থ অনেক গভীর। এর অর্থ, মানুষ হিসেবে আসলে আমরা এমন যে, সব সময়ই একজন আরেকজনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব-বিরোধ তৈরির ছুতা খুঁজে ফিরি এবং ছুতা তৈরি করেও ছাড়ি; কলম নয়, তরবারিকেই আমরা গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। কিন্তু তলোয়ার কিংবা অস্ত্রকে, মামলাবাজিকে শুভবোধসম্পন্ন মানুষ সবসময়ই ত্যাগ করতে চেয়েছে। তাই মানুষ ও তার সমাজ ক্রমশ এমনভাবে পরিশীলিত হয়ে উঠেছে যে, তারা চিন্তার স্বাধীনতাকে ধারণ করতে পারে, চিন্তার মিথস্ট্ক্রিয়া ঘটানোর ঔদার্য দেখাতে পারে। মানুষ যত এগিয়েছে, ততই এমন সমাজ প্রত্যাশা করেছে, যেখানে সে প্রচল চিন্তাকে পরিত্যাগ কিংবা বিরোধিতা করার পরিসর পাবে। মানুষের কলম যে তরবারির চেয়েও এত শক্তিশালী আর অপরিহার্য হয়ে উঠল, তার কারণও এই। শুধু তরবারির চেয়ে কেন, মানুষের কলম আইন ও বিধির চেয়েও শক্তিশালী, যে কোনো অধ্যাদেশের চেয়েও শক্তিশালী। কারণ কলম মানুষের নতুন চিন্তাকে পরিশীলিতভাবে লিপিবদ্ধ করতে পারে, মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারে, তার মনে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের বোধ তৈরি করতে পারে এবং এভাবে প্রতিটি মানুষকে প্রচলিত আইন, সমাজ, রাষ্ট্র, মূল্যবোধ, নীতিনৈতিকতার অসংগতি দেখিয়ে দিয়ে তার মধ্যে এসবকে নতুন করে সৃজনের তাগিদ জাগিয়ে তুলতে পারে।
তবে আমাদের আশপাশে এখন এমন অনেক মানুষ, যারা বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার অজুহাত দেখিয়ে, আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে আসামির সদর্পে মুক্ত হওয়ার ঘটনার উদাহরণ দেখিয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন; তেমনি 'গুজব' ও 'অপপ্রচার'কে তাৎক্ষণিকভাবে দমন করতে না পারলে, কথিত 'ধর্মানুভূতিতে আঘাত দেওয়া'র বিষয়কে বল প্রয়োগে সামাল দিতে না পারলে সামাজিক নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে- এমন অজুহাত দাঁড় করিয়ে কার্যত মানুষের বাকস্বাধীনতা ও লেখার স্বাধীনতাকেই সীমিত করার চেষ্টা চালান।


পাকিস্তানিরা দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এ দেশের মানুষকে শোষণ করার কাজে নিপুণভাবে ব্যবহার করেছিল ধর্মানুভূতিকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় মানুষকে রক্তাক্ত করা হয়েছিল ধর্মের অজুহাতে। মুক্তিযুদ্ধের পর ১০ জানুয়ারি স্বাধীন রাষ্ট্রে ফিরে রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার প্রথম ভাষণেই বলেছিলেন, 'এই বাংলাদেশে হবে সমাজতন্ত্র ব্যবস্থা। এই বাংলাদেশে হবে গণতন্ত্র। এই বাংলাদেশ হবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র।' বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে নিশ্চিত করেই বলা যায়, ধর্মনিরপেক্ষতার সংগ্রাম ছাড়া এখানে গণতন্ত্রের সংগ্রাম পূর্ণাঙ্গ হয় না। এই সংগ্রামের পথে ঠিকমতো হাঁটা হয় না বলেই একটি গোষ্ঠী বারবার ধর্মানুভূতির অজুহাতে আসলে রাজনৈতিক ও সামাজিক নৈরাজ্য, মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদকেই আহ্বান করতে পারে।
ওই ঘটনা আমাদের সকলেরই জানা,- বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'দুর্গেশনন্দিনী' পড়ে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল ইসমাইল হোসেন সিরাজীর ভেতরে। কিন্তু তিনি কারও বিরুদ্ধে মামলা করতে যাননি, চাপাতি নিয়ে কাউকে হত্যা করতেও ছোটেননি। বরং তিনি লিখেছিলেন, 'রায়নন্দিনী'। তার এই উপন্যাসের মূল্যায়ন করতে গিয়েও নিশ্চয়ই দশ কথা বলা যাবে, কিন্তু মূল কথাটি হলো এই, কলমের জবাব কলম দিয়েই দিতে হবে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যে কেবল এই গত আগস্টে 'রবীন্দ্রনাথ কেন জরুরি' লিখেছেন, তা তো নয়; একই নামে বছর দুয়েক আগে তার একটি প্রবন্ধ সংকলনও ছাপা হয়েছে অবসর প্রকাশনী থেকে। কিন্তু যিনি আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন, সেটি হয়তো তার চোখে পড়েনি। অথবা চোখে পড়লেও ঠিক অত বড় একটি বইয়ের প্রত্যুত্তর দাঁড় করানো তার ধৈর্যে কুলাচ্ছে না। আইনি নোটিশে তিনি কিছু প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন। কিন্তু যারা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত, তারা জানেন, সেসবই চর্বিত চর্বণ এবং বাঙালির জাতি হিসেবে উঠে দাঁড়ানোর বিষয়টিকে বৃত্তাবদ্ধ করে ফেলার চেষ্টা মাত্র।
'বিষফোঁড়া' বইটি আমার বা আমাদের অনেকেরই পড়া নেই। তবে কোনো বই-ই নিষিদ্ধ করার পক্ষে আমি নই। কারণ বইকে কখনও নিষিদ্ধ করার প্রয়োজন পড়ে না, মানুষের জীবনে যেসব গ্রন্থ অপ্রয়োজনীয় তা আপনাআপনিই কালের অতলে হারিয়ে যায়। বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে লেখা অপ্রয়োজনীয় বই মানুষের চিন্তাজগতে তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জাগিয়ে তোলে এবং মানুষের নিজস্ব চিন্তাকেই আরও সংঘবদ্ধ করে।
সাম্প্রতিক সময়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরেই শিশু ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে এবং তা নিয়ে সামাজিক অস্থিরতা ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েই আছে। এর ফলে বরং এমন ধারণাই পল্লবিত হবে যে, ধর্ষকরা এত সংঘবদ্ধ যে তারা এ নিয়ে লেখা বইপত্রও নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে প্রভাব রাখতে পারে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, বইটি নিষিদ্ধ করার আগে কোনো মূল্যায়ন কমিটিও করা হয়নি। গেজেট প্রকাশ করে এটি সরাসরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগার অজুহাতে বিবিধ পদক্ষেপ নেওয়ার এসব ঘটনার মধ্যে আপাতদৃষ্টিতে কোনো সংযোগ নেই। কিন্তু সব মিলিয়ে এটি আসলে একটি বিনিসুতোর ফাঁস। বিনিসুতোর এই ফাঁস কেবল সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, জাফরুল্লাহ্‌ চৌধুরী, দীপঙ্কর দাস, সালেহ আহমেদ মুবিন কিংবা সাইফুল বাতেন টিটোর জন্য নয়- শেষ পর্যন্ত তা ধর্মনিরপেক্ষতার জন্যই। বারবার ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের যাত্রাপথকে রক্তাক্ত করেছে সামরিক শাসন, বিকৃত করেছে গণতন্ত্রহীনতা, ক্ষতবিক্ষত করেছে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার। এমনকি সম্প্রতি ব্রিটেনের জাতীয় মহাফেজখানা থেকে পাওয়া গোপন নথি থেকে জানা যাচ্ছে, ১৯৭৬ সালের ২৪ জুনেই বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের একজন কর্নেল ফারুক এক চিঠিতে সুনির্দিষ্টভাবে জানিয়ে গেছেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র না করে ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার কারণেই তিনি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছেন (প্রথম আলো, ১৫ আগস্ট ২০২০)। আমাদের আশপাশে অহরহ যে ধর্মানুভূতির খেলা চলে, তার উদ্দেশ্যও আসলে ধর্মনিরপেক্ষতাকে বিদায় করা।
যদিও এই দেশে তা কখনোই সম্ভব নয়। এই দেশে ষাটের দশকে যেমন, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে যেমন, তেমনি ভবিষ্যতেও রবীন্দ্রনাথ জরুরিই থাকবেন। যেমন জরুরি থাকবে লেখার স্বাধীনতা, কথা বলার স্বাধীনতা এবং ধর্মনিরপেক্ষতা।
লেখক ও সাংবাদিক
imtiar@gmail.com