বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ছিল না। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে একটি আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়। জিয়াউদ্দিন তারিক আলীর জীবন ও কর্ম এই লক্ষ্য অর্জনের মধ্যেই আবর্তিত হয়েছে। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন, '৭২-এর সংবিধানে যে চার মূলনীতি গ্রহণ করা হয়েছে, সে ধারার রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তোলা সর্বজনের পবিত্র দায়িত্ব। আমরা আটজন ১৯৯৪ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর গড়ার স্বপ্ন দেখি, তখন থেকে প্রায় ২৫টি বছর আমাদের একসঙ্গে পথচলা। প্রস্তুতি পর্বের অধিকাংশ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে ট্রাস্টি তারিক আলী ও আক্কু চৌধুরীর বাসায়। আমরা যেহেতু তখন তরুণ ও নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ত ছিলাম তাই বৈঠকগুলো শুরু হতো সন্ধ্যায় আর শেষ হতো গভীর রাতে; আবার কখনও খুব ভোরে।
১৯৯৬ সালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের যাত্রা শুরু হয় সেগুনবাগিচার ভাড়া বাড়িতে। তখন স্বপ্ন ছিল একটি বৃহদায়তনের স্থায়ী মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের। বছরপাঁচেক আগে আগারগাঁওয়ে প্রায় এক একর জমির নিচে তিনটি বেসমেন্ট, ওপরে ছয় তলাবিশিষ্ট মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ভবনটি নির্মিত হয়। আমাদের সৌভাগ্য, এই ভবন নির্মাণকাজের সময় সদস্য সচিব ছিলেন প্রকৌশলী জিয়াউদ্দিন তারিক আলী। তিনি ছিলেন একজন বিশ্বমানের প্রকৌশলী। যন্ত্র প্রকৌশলে তার সনদ রয়েছে বটে, তবে নির্মাণকাজের সব দিক সম্পর্কে গভীর জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ ছিলেন তারিক আলী। নির্মাণকাজ যেন সঠিকভাবে সম্পন্ন হয় সেদিকে তার তীক্ষষ্ট নজর ছিল। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ভবনটি তারিক আলীকে প্রতিনিয়ত স্মরণ করবে। তার কর্মজীবনে তিনি প্রকৌশল দক্ষতার প্রমাণ রেখে গেছেন। একটি মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানির ঢাকা, কায়রো ও জাকার্তায় তিনি বিশ্বমানের ফার্মাসিউটিক্যাল কারখানা নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজ পরিচালনা করেছেন। অবসর গ্রহণের পূর্ব মুহূর্ত অবধি তিনি নিউজার্সিতে ওই কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ে দায়িত্বরত ছিলেন। এই মুহূর্তে ট্রাস্টিদের দুশ্চিন্তা, তার অনুপস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ভবন রক্ষণাবেক্ষণের দায় কীভাবে পালন করব।
শুরুতে বলেছিলাম, তারিক আলী মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে অগ্রসর হয়েছেন। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেছেন বাঙালি সংস্কৃতি; বিশেষ করে বাংলা গানকে অবলম্বন করেই সংবিধানের চার মূলনীতিকে সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। তরুণ বয়সে তিনি বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে সংগীত শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। এ লক্ষ্য অর্জনে যুক্ত হয়েছেন ছায়ানট ও রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদে। মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের সময় চোখের সমস্যার জন্য তিনি সশস্ত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। তাই মুক্তিসংগ্রামী শিল্পী সংস্থার সদস্য হয়ে শরণার্থী শিবির ও মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে গান গেয়ে তাদের উজ্জীবিত করেছেন। তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ সংগৃহীত 'মুক্তির গান'-এর প্রধান চরিত্র ছিলেন তারিক আলী। এই দালিলিক তথ্যচিত্র দেখে অশ্রুপাত করেননি, এমন বাঙালি পাওয়া যাবে না।
ঐতিহাসিক কারণে এবং বর্তমান বৈশ্বিক পরিবেশে সাম্প্রদায়িকতা থেকে সহজে পরিত্রাণ নেই। বক্তৃতায় সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কথা বলা যতটা সহজ, অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে অন্তরে ধারণ করা তার চেয়ে অনেক কঠিন। তারিক আলী এই বিরল মানুষদের একজন। কয়েক বছর ধরে বনানীতে যে শারদীয় পূজামণ্ডপ হয়, তার অন্যতম উদ্যোক্তা তারিক আলী। যেখানেই ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা হামলার শিকার হয়েছে, জমি থেকে উচ্ছেদ হয়েছে, নিগৃহীত হয়েছে- প্রায় সব জায়গায় তারিক আলীর অবস্থান সুনিশ্চিত ছিল। ২০০১-০২ সালে তিনি বিএনপি-জামায়াতের নির্বাচনোত্তর সাম্প্রদায়িক হামলার শিকার মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন সংগীতগুণী ওয়াহিদুল হকের নেতৃত্বে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হওয়ার পর সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু-বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ওপর হামলা হয়েছে; তখন অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের নেতৃত্বে গড়ে তোলা হয় 'বাংলাদেশ রুখে দাঁড়াও' নামে সংগঠন। তারিক আলী তার অন্যতম আহ্বায়ক ছিলেন। এই সংগঠনের সূত্রে তিনি সারাদেশে দুর্ভাগা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

জিয়াউদ্দিন তারিক আলী (১৯৪৫-২০২০)

তারিক আলী সুবিধাবঞ্চিত প্রান্তিক মানুষের পাশে ছিলেন আমৃত্যু। বিশেষ করে আদিবাসী মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গী ছিলেন তিনি। উপলব্ধি করেছেন, মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে হলে সমাজে এ চার মূলনীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সে জন্য দুই দশক আগে অজয় রায়ের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে 'সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন'। অজয় রায়ের প্রয়াণের পর তারিক আলী আমৃত্যু এই আন্দোলনের সভাপতি ছিলেন। এই সূত্রে সারাদেশে তিনি চারণের মতো ঘুরে বেড়িয়েছেন। অসুস্থ শরীর সত্ত্বেও এ ক্ষেত্রে তাকে বিরত রাখা যায়নি। আমার সৌভাগ্য, এসব কাজে তার সঙ্গী হতে পেরেছিলাম। বিশাল হৃদয় তবে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ এ মানুষটি কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে সে কাজটি নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করা অবধি কঠোর অবস্থানে থাকতেন। তবে হৃদয়ের গভীরে তার সহকর্মীদের প্রতি অসীম মমত্ববোধ লক্ষ্য করা যেত। এ বিষয়টি টের পেলাম তার মৃত্যুর পরে ফেসবুকের পাতায়। হাজারো মানুষকে তিনি যে গভীর ভালোবাসায় আবদ্ধ করে রেখেছিলেন, তা আমাদের নিকটজনেরাও টের পাননি। তারিক আলীর প্রয়াণে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরই কেবল তার একজন ট্রাস্টিকে হারায়নি; বাংলাদেশও একজন অসাম্প্রদায়িক, দৃঢ়চিত্ত মানুষকে হারিয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি আমরা সাত ভাই চম্পা এক বোন পারুল। এর মধ্যে আক্কু চৌধুরী কয়েক বছর ধরে বিদেশে, স্থপতি ও কবি রবিউল হুসাইন বছরখানেক আগে প্রয়াত; তারিক আলীও চলে গেলেন। আমরা বাকিরা কিছুটা বিপর্যস্ত বোধ করছি বটে। তবে তরুণ সহকর্মীরা দায় নিতে শুরু করেছেন। সর্বোপরি সর্বজনের সহায়তায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর জনগণের জাদুঘরে পরিণত হয়েছে। এটিই বড় ভরসার জায়গা। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর যতদিন টিকে থাকবে, তারিক আলীও আমাদের মাঝে ততদিন বেঁচে থাকবেন।


ট্রাস্টি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর