আইনশৃঙ্খলায় নিয়োজিত পুলিশ বাহিনীর বদলির চাকরি হলেও বদলির ক্ষেত্রে তদবির ও রাজনৈতিক সংশ্নিষ্টতার অভিযোগ নতুন নয়। বিশেষত পুলিশের কোনো কোনো কর্মকর্তার দীর্ঘদিন একই জেলা বা থানায় দায়িত্ব পালন করে বদলি হলেও ফের পুরোনো কর্মস্থলে ফিরে আসার চিত্রও পুরোনো। একই কর্মস্থলে এভাবে ফিরে আসা নিছক কাকতাল হতে পারে না। এতে দুর্নীতি ও অনিয়মের সুযোগ থাকে। তাই মঙ্গলবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ঘুরেফিরে একই স্থানে পুলিশ কর্মকর্তাদের থাকতে না পারার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাকে আমরা স্বাগত জানাই। জুলাই মাসের শুরুতে পুলিশের মহাপরিদর্শকও এক অনুষ্ঠানে একই প্রস্তাব করে বলেছিলেন, 'পুলিশ অফিসার এবং ফোর্সের জন্য বাস্তবসম্মত বদলি ও পদায়ন নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে বদলির তদবির কালচারকে বিদায় করা হবে।' এ ক্ষেত্রে তিনি বাস্তবসম্মত বদলি ও পদায়নের যে নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন তার সঙ্গে আমরা বহুলাংশে একমত। বস্তুত নিয়মতান্ত্রিক বদলি ও পদায়নের জন্য একটি নীতিমালার বিকল্পও নেই। আমরা দেখেছি, বিশেষ করে ঢাকায় যেসব থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পদায়ন হয় তারা বছরের পর বছর রাজধানীতেই থাকতে চান। এ থানা থেকে আরেক থানা করে কারও কারও ক্ষেত্রে এক যুগও ঢাকায় থাকার রেকর্ড রয়েছে। অভিযোগ আছে, ঢাকা মহানগরীতে পদায়নের জন্য ওসিদের রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের শক্তিশালী তদবির প্রয়োজন হয়। দীর্ঘদিন একই এলাকায় থাকার কারণে সন্ত্রাসী-মাস্তানদের সঙ্গে ওসিদের সখ্য গড়ে ওঠা অস্বাভাবিক নয়। কেউ কেউ নানা রকম অনৈতিক কর্মকাণ্ডেও যে জড়িয়ে পড়েন- সেই প্রমাণও মিলেছে। অনেকে সুযোগ-সুবিধার জন্যও একই কর্মস্থলে থাকতে চান; সন্তানের লেখাপড়ার সুবিধার কথা বিবেচনা করেও ঢাকার বাইরে যেতে চান না অধিকাংশ কর্মকর্তা। এ সংকট নিরসনের লক্ষ্যে ঢাকার বাইরে বিভাগীয় শহরে মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের উদ্যোগ জরুরি। তাছাড়া ঢাকার বাইরে পুলিশের চাকরিকে আকর্ষণীয় করতে বিভাগীয় শহরগুলোতে পুলিশ সদস্যদের জন্য মানসম্মত চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করার প্রত্যয়ও পুলিশের মহাপরিদর্শকের বক্তব্যে উঠে আসে। আমরা মনে করি, প্রত্যন্ত এলাকায় দায়িত্ব পালনকারী পুলিশের চিকিৎসার পাশাপাশি অন্য সুযোগ-সুবিধাও বাড়ানো যেতে পারে। কিন্তু বদলির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বরাবরই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্ম দিয়েছে। কর্মস্থলে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় পুলিশের বদলির ঘটনা যেমন রয়েছে, একইভাবে প্রভাবশালী রাজনীতিকের তদবিরেও কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পুলিশ পদায়ন পাচ্ছে। প্রভাবশালীদের আশীর্বাদ পাওয়া পুলিশ কর্মকর্তারা কারও নির্দেশ মানতে চান না বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও সহজে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। এ অভিযোগ কতটা গুরুতর সহজেই অনুমেয়। আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে, যেখানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নেই সেখানে পুলিশ সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালন করে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। আমরা দেখেছি, করোনাকালে পুলিশ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে কীভাবে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে। এ দুর্যোগে পুলিশ জনগণের পাশে গিয়ে আন্তরিকভাবে সেবা দিয়েছে। হয়তো অনেক কাজই পুলিশের ছিল না কিন্তু তারা একান্তই নিজের দায়িত্ববোধ থেকে কাজ করে মানুষের ভালোবাসা অর্জন করেছে। আমরা চাই, আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি পুলিশের বদলির যে সুপারিশ করেছে বাহিনীর শৃঙ্খলার স্বার্থেই তা বাস্তবায়ন হোক। নিয়মতান্ত্রিক বাহিনীর সদস্য হিসেবে মানুষের স্বার্থেই সেবার মানসিকতা নিয়ে পুলিশকে কাজ করতে হবে। আমরা জানি, জনগণের নিরাপত্তা প্রদানে পুলিশ কতটা কর্মতৎপরতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের অবদান ও অর্জন অনেক। কিন্তু কিছু কিছু সদস্যের অনিয়মের কারণে গোটা পুলিশ বাহিনীর দুর্নাম হয়। পুলিশ যাতে বেপরোয়া হতে না পারে, অনিয়ম ও দুর্নীতি করতে না পারে, সেজন্য কঠোর হওয়া চাই। এক্ষেত্রে পুলিশের বদলি ও পদায়নে শৃঙ্খলা ফেরানো হোক আগে। আমরা মনে করি পুলিশের জনসেবার মানসিকতা, প্রশাসনের সুযোগ-সুবিধার উদ্যোগ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তির পাশাপাশি বাস্তবসম্মত নীতিমালাই বদলি ও পদায়নজনিত সংকট বহুলাংশে নিরসন করতে পারে।