আন্তর্জাতিক

স্নায়ুযুদ্ধ ও পরবর্তী সশস্ত্র যুদ্ধ

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০     আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

আবদুল লতিফ মাসুম

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর অপ্রতিরোধ্য পরাশক্তিতে পরিণত হয়। এ সময়ে মার্শাল প্ল্যানের (১৯৪৭) মাধ্যমে ইউরোপ পুনর্গঠনে প্রধান ভূমিকা রাখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। একে একে পুরোনো উপনিবেশগুলোকে স্বাধীনতা প্রদানে যুক্তরাষ্ট্র সনাতন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ব্রিটেন, ফ্রান্স, স্পেন ও নেদারল্যান্ডসের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এভাবে ইন্দোচীন, আরব বিশ্ব, আফ্রিকা ও ভারতের স্বাধীনতা ত্বরান্বিত হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এতদিন ধরে যারা সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করছিল তারাই নানা কার্যক্রমের মাধ্যমে নব্য সাম্রাজ্যবাদে পরিণত হয়। ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, কোরিয়া, চিলি এবং ইরানে তাদের কার্যধারা এর প্রমাণ।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হওয়ার মাধ্যমে দুটো বিপরীত বৈশ্বিক শক্তি ও আদর্শের বিকাশ ঘটে। পূর্ব ইউরোপে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পশ্চিম ইউরোপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সমাজতন্ত্রের শত্রু বলে অভিযোগ করে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নকে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার জন্য অভিযুক্ত করে। এভাবে শুরু হয় 'স্নায়ুযুদ্ধ'। 'যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব অথচ যুদ্ধ নয়' এ অবস্থাকে রসিকজনেরা বলেন, ঠান্ডাযুদ্ধ। এর কেতাবি নাম স্নায়ুযুদ্ধ। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একক পরাশক্তি হয়ে দাঁড়ায়।
স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন দুটো পরাশক্তির দ্বন্দ্ব প্রকারান্তরে তৃতীয় বিশ্বের ভারসাম্যের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এখন একচ্ছত্র আধিপত্যে জাতিসমূহের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ক্রমবর্ধমানভাবে হুমকির সম্মুখীন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অপর রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে আরও বেশি করে হস্তক্ষেপ করতে থাকে। 'শান্তি, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা'- এখন এ নামে হস্তক্ষেপ ঘটছে যত্রতত্র। বিগত ২০ বছরে তাদের হস্তক্ষেপের প্রবণতা নগ্নভাবে বেড়েছে। আফগানিস্তানে এখনও মার্কিন সামরিক অবস্থান রয়েছে। ইরাক থেকে সেনা প্রত্যাহারের কথা বলা হলেও সেখানে সামরিক কার্যক্রম চলছে। ইরানকে সমূলে বিনাশের প্রতিজ্ঞা নিয়ে ব্যাপক নৌ ও সামরিক শক্তির প্রদর্শনী চলছে পারস্য উপসাগর এলাকায়। সৌদি আরবের দোসর হিসেবে ইয়েমেনে গণহত্যা চালাচ্ছে মার্কিনিরা। গৃহযুদ্ধের পর থেকে দৃশ্যমান প্রত্যাহার সত্ত্বেও সিরিয়া, তৎসংলগ্ন অঞ্চল ও ভূম্যধসাগরীয় এলাকায় আমেরিকার উপস্থিতি রয়েছে। প্রতিরোধ করতে হবে পীত সাগরে মহাচীনকে। পৃথিবীর সকল সাগর ও মহাসাগর, জলপথ ও বিভিন্ন জনপদে রয়েছে তাদের অসংখ্য সামরিক স্থাপনা।
১৭৭৬ সালে স্বাধীনতার পর থেকে একটু একটু করে ক্রমশ হস্তক্ষেপের দাঁত বের করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা মোটা তিনটি দাগে এসব হস্তক্ষেপের বর্ণনা দিয়েছেন। প্রথমত, সরাসরি সামরিক অভিযান। এর দুটো ধরন রয়েছে- প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ। দ্বিতীয়ত, রেজিম চেঞ্জ। যে বা যারা মার্কিন স্বার্থের বা নিরাপত্তার সহায়ক নয় তাদের গায়ের জোরে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে আনা। বিষয়টি যতই অনৈতিক বা আন্তর্জাতিক আইনের বিরোধী হোক, তারা তোয়াক্কা করে না। তৃতীয়ত, নির্বাচনী হস্তক্ষেপ। যে মানবিকতায় বা নিরাপত্তায় মার্কিন স্বার্থ নেই সেখানে তারা নীরব। আবার বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যদি পটকা ফোটে, আর তা যদি হয় মার্কিন সমীকরণের বিপরীতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যৌক্তিকতা খুঁজে পায় হস্তক্ষেপের। স্নায়ুযুদ্ধের পর বিস্তৃতির কয়েকটি ঘটনা নিম্নরূপ-
১. ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার পর ইরানকে শায়েস্তা করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই সাদ্দাম সরকারকে অস্ত্র দিয়ে ফুলিয়ে ফাপিয়ে তোলে। ২. ১৯৯১ সালে কুয়েত অভিযানের পর পরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরাকের উত্তর অংশে 'নো ফ্লাই জোন' কার্যকর করে। উদ্দেশ্য মার্কিন স্বার্থের তাঁবেদার কুর্দি জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করা। ৩. ১৯৯০ সালে মার্কিন বাহিনী সোমালিয়ায় হস্তক্ষেপ করে। সেখানে মার্কিনবিরোধী শক্তি ক্ষমতা দখল করলে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ৪. ১৯৯৫ সালে ক্যারিবিয়ান রাষ্ট্র হাইতিতে সরাসরি অভিযান চালানো। সেখানে তারা সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত মার্কিন সমর্থিত প্রেসিডেন্ট জিন বার্টান্ড এরিস্টাইডকে ক্ষমতায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে। গণতন্ত্রের নামে এখানে সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও সাম্প্রতিককালে মিসরে গণতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে সামরিক সরকার প্রতিষ্ঠায় সর্বাত্মক সহায়তা করে যুক্তরাষ্ট্র। ৫. ১৯৯৫ সালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ন্যাটোর মাধ্যমে বসনিয়ায় হস্তক্ষেপ করেন। ৬. ১৯৯৮ সালে আলকায়দা পূর্ব আফ্রিকায় হামলা চালায়। এর জবাবে বিল ক্লিনটন সুদান ও আফগানিস্তানে আক্রমণের নির্দেশ দেন। ৭. ১৯৯৬ সালে সিআইএ সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্র করে।
পৃথিবী কাঁপানো ৯/১১-এর ঘটনার পর প্রেসিডেন্ট বুশ 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ' নামের ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করেন। ঘটনার জন্য ওসামা বিন লাদেনকে অভিযুক্ত করা হয়। আফগানিস্তান ওসামা বিন লাদেনকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে হস্তান্তর করতে অস্বীকার করলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো দেশটির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। একই সময়ে পাকিস্তানে পরিচালিত হয় ড্রোন অ্যাটাক। এ সময়ে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ মার্কিন স্বার্থের কাছে আত্মসমর্পণ করলেও দেশটির সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষা হয়নি। একই সময়ে ইয়েমেন এবং সোমালিয়ায় সন্দেহজনক ঘাঁটিতে আক্রমণ পরিচালিত হয়।
২০০৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বহুজাতিক কোয়ালিশন ইরাকে আক্রমণ চালায়। সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করে সেখানে মার্কিন মদদপুষ্ট সরকার প্রতিস্থাপিত হয়। এ সময়ে সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র উৎপাদন ও মজুদের অভিযোগ আনা হয়। পরবর্তীকালে তা ডাহা মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়। ২০১১ সালে লিবিয়ায় গাদ্দাফিবিরোধী শক্তিকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন নৌবাহিনী সৌদি আরবকে সহায়তা করে ইয়েমেন অবরোধে। সিরিয়ায় ২০১২ সালের দিকে বাশার সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
১৯১৬ সালে মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচালিত গবেষণাটি 'জার্নাল অব কনফ্লিক্ট রেজুলেশন'-এ প্রকাশিত হয়। এতে ১৯৮১-২০০৫ পর্যন্ত ২৫ বছরের সমীক্ষা রয়েছে। গবেষণা উপসংহারে বলা হয়, 'বিষয়টি যতটা না মানবাধিকার বা গণতন্ত্রের জন্য, তারচেয়েও বেশি মার্কিন নিরাপত্তার স্বার্থে পরিচালিত'।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এতসব অন্যায়-অপকর্মের সাথী রাষ্ট্রশক্তির অভাব নেই। এর বিপরীতে দেশে দেশে জনশক্তির বিকাশ আছে। আছে প্রগতির পথে অগ্রসরমান অবস্থান। 'দিনে দিনে বাড়িয়াছে দেনা, শুধিতে হইবে ঋণ'। আমরা বিশ্বাস করি, 'বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা জনগণের ভেতর থেকেই আত্মপ্রকাশ করবে উন্নততর নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার ভাবুক ও কর্মী তথা নেতৃত্ব'। (আবুল কাসেম ফজলুল হক :২০০৮ :২৩২)
অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়