সরকারি চাকরি

বয়সসীমা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত ইতিবাচক

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয়

করোনা দুর্যোগের মধ্যে চাকরিপ্রত্যাশীদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বয়সে পাঁচ মাস ছাড়ের সরকারি সিদ্ধান্ত শুধু যৌক্তিকই নয়; আশাপ্রদও বটে। প্রার্থীদের অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে প্রশাসনের সময়োচিত পদক্ষেপকে আমরা স্বাগত জানাই। এর মাধ্যমে করোনা প্রাদুর্ভাবের মধ্যে প্রায় পাঁচ মাস সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না হওয়ায় ত্রিশোর্ধ্ব হাজারো চাকরিপ্রত্যাশীর বর্ধিত সময়ে চাকরির আবেদনের সুযোগই তৈরি হবে না; একই সঙ্গে তাদের পরিবারও উপকৃত হতে পারে। বস্তুত বৈশ্বিক এ দুর্যোগের প্রভাব দেশের অনেক পরিবারের ওপরে পড়েছে। আয় হ্রাস, চাকরি হারানোর বেদনাও হয়তো অনেক পরিবারকে বইতে হচ্ছে। আমরা জানি, করোনার এ সময়ে বেসরকারি অনেক উদ্যোগ থমকে গেছে। পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক না হওয়ায় বেসরকারি খাতের কর্মসংস্থানে সংকোচন ঘটেছে এবং এর প্রভাব অনেক দিন থাকবে। এ অবস্থায় সরকারি কর্মসংস্থান বাড়ানো প্রয়োজন। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে জনশক্তির যে ঘাটতি রয়েছে, অন্তত সেগুলো পূরণে প্রশাসন উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে পারে। একই সঙ্গে সরকার পাঁচ মাস ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে যে সদিচ্ছা প্রদর্শন করেছে, চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা যৌক্তিক ও স্থায়ীভাবে বাড়িয়ে সে পথ আরও প্রশস্ত করতে পারে। আমরা দেখেছি, চাকরিপ্রার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। এমনকি বিভিন্ন সময়ে বয়সসীমা বাড়ানো হবে বলে প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা তাদের আশ্বস্ত করলেও বাস্তবে তা কার্যকর হচ্ছে না। এখন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে; দীর্ঘমেয়াদে তা কার্যকরের জন্য আলোচনা হতে পারে। চাকরিতে প্রবেশের সীমা বাড়ানোর দাবি যৌক্তিক এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি প্রয়োজনীয়ও বটে। দেখা গেছে, একজন শিক্ষার্থী যে বয়সে পড়াশোনা শেষ করেন; এর পর সরকারি চাকরির বাজার বুঝতে বুঝতেই তার বয়স ৩০ বছর হয়ে যায়। দেশে যেভাবে দিন দিন সরকারি চাকরি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে, যেভাবে মেধাবীরা এদিকে ঝুঁকছেন, তা ইতিবাচক। অপরদিকে এ চাকরিতে যে প্রতিযোগিতা রয়েছে, তার কারণে অনেকেরই স্বপ্ন-ইচ্ছা-প্রচেষ্টা এমনকি মেধা থাকা সত্ত্বেও বয়সের কারণে কাঙ্ক্ষিত 'সোনার হরিণ' ধরা সম্ভব হয় না। তা ছাড়া সরকারি চাকরির দীর্ঘসূত্র দুর্বিপাকেও অনেক তরুণের বয়স হারিয়ে যায়। অথচ কর্মসংস্থানের যোগদানের নিমিত্তে বয়সসীমা যৌক্তিক পর্যায়ে বাড়ালে সম্ভাবনাময় অনেকেই দেশসেবার সুযোগ পেতে পারেন। সরকার যেমন করোনার প্রভাব বিবেচনায় বয়সে ছাড় দেওয়ার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তেমনি যৌক্তিকতার বিচারে স্থায়ীভাবে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধির বিষয়ে ভাবাও প্রয়োজনীয় বলে আমরা মনে করি। আমেরিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা, নেপালসহ বিশ্বের অনেক দেশেই সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি। এ দেশেও বয়সসীমা বৃদ্ধি করা হলে কারও ক্ষতির আশঙ্কা তো নেই-ই বরং যারা সরকারি চাকরিতে নিজেদের মেধা প্রয়োগ করতে চান, তাদের বাড়তি সুযোগ সৃষ্টি হবে। এমনকি কেউ উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করলে কিংবা বেসরকারি বিভিন্ন কাজ করে দক্ষতা অর্জনকারী কেউ সরকারি প্রতিষ্ঠানে তার অর্জিত দক্ষতা কাজে লাগাতে চাইলে সে ক্ষেত্রে বয়স বাধা হয়ে দাঁড়াবে কেন? সরকারি চাকরিতে বয়স বৃদ্ধি করতে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় নয়, প্রয়োজন সদিচ্ছা। করোনা দুর্যোগ সে সদিচ্ছায় প্রভাবক ভূমিকা রাখবে বলে আমাদের বিশ্বাস। ইতোমধ্যে সরকারি চাকরিতে অবসরের বয়স বৃদ্ধির দাবি উঠেছে; এমনকি সরকারও এটি বিবেচনা করছে বলে সংবাদমাধ্যমে এসেছে। আমাদের গড় আয়ু যখন ৬০-এর নিচে ছিল তখন অবসরের সময় ৫৭ করা হয়। এখন অবসরের সময় বাড়লে সঙ্গত কারণে ওই দুই বছর চাকরিতে নতুনদের প্রবেশের সুযোগ কমে আসে- এ হিসাবেও চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধি করা উচিত। কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতেও আমাদের নজর দেওয়া চাই। বেসরকারি খাত পুরোপুরি করোনার প্রভাবমুক্ত করতেও পদক্ষেপ জরুরি। সরকারি-বেসরকারি যৌথ প্রচেষ্টা, উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা এবং পথ মসৃণ করার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সংকট মোকাবিলা করা চাই। প্রতি বছর যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক বেরুচ্ছে, তাদের জন্য বাজার সৃষ্টির স্বার্থেও এর বিকল্প নেই।