শিক্ষা দিবস

আটান্ন বছরের মূল্যায়ন ও অগ্রযাত্রা

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

কাজী ফারুক আহমেদ

করোনার কারণে সৃষ্ট নানা বিপর্যয় সামাল দিতে বিশ্বের উন্নত, উন্নয়নশীল ও উন্নয়ন প্রয়াসী দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও যখন বিশেষ করে শিক্ষা ব্যবস্থায় রূপান্তর প্রয়াস অব্যাহত, তখন এক অসাধারণ পরিস্থিতিতে দেশে আজ পালিত হচ্ছে শিক্ষা দিবস। উল্লেখ্য, ৫৮ বছর আগে তৎকালীন পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা যে ব্যতিক্রমী আন্দোলন গড়ে তোলে ওই বছর অর্থাৎ, ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তা পরিণতি লাভ করে। দুঃখ হয়, আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক অর্জন সত্ত্বেও বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনের স্মৃতিবাহী দিনটি আজও জাতীয় শিক্ষা দিবসের স্বীকৃতি পায়নি। এ কথা সত্য, শিক্ষা মানবাধিকারের অপরিহার্য অংশ এবং এর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রাসঙ্গিকতা দুটোই গুরুত্ববহ হলেও জাতীয় পরিপ্রেক্ষিতে সময়োচিত কাম্য পদক্ষেপ গ্রহণে অসামর্থ্য অনেক ক্ষেত্রে বেশি করে আশা ভঙ্গের বেদনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্মর্তব্য, যে চারটি মোটা দাগের ঘটনা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে, তা হলো বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও সত্তরের সাধারণ নির্বাচন। এর প্রত্যেকটির যথাযথ মূল্যায়ন যে জাতীয় মর্যাদার জন্য অপরিহার্য, তা মানতে আমরা আর কত সময় নেব? অন্যদিকে, পাহাড়সম ভুলের কথাও বলতে হয়। উল্লেখ্য, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে কতিপয় চিহ্নিত ব্যক্তি রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য জিয়াউর রহমানের জন্মদিন ১৯ জানুয়ারি জাতীয় শিক্ষক দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়, সরকারিভাবে তা পালন শুরু করে। শিক্ষকদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তীব্র প্রতিবাদ উত্থাপিত হয়। জাতীয় শিক্ষক-কর্মচারী ফ্রন্ট এভাবে দিবসটি পালনের অসারতা উল্লেখ করে বলে, কুদরাত-ই খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্টে একটি জাতীয় শিক্ষক দিবস পালনের কথা বলা হয়েছে ঠিকই। সেই অনুযায়ী সরকার যদি শিক্ষাবিদ ড. কুদরাত-ই খুদা, ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌, বিজ্ঞানী সত্যেন বসু অথবা প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁর মতো কোনো বিশিষ্ট শিক্ষাবিদের নামে এই দিবসটি উদযাপন করত, তাহলে তাই হতো যৌক্তিক।
বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের কারণে আজকের দিনটি আমাকে আটান্ন বছর আগের ঘটনাবহুল দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। যখন পরাধীন আমরা একটি গণমুখী শিক্ষানীতির দাবিতে আন্দোলন করেছিলাম। বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা, গণমুখী শিক্ষা প্রসার, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ ও শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য-বঞ্চনা নিরসন, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণের লক্ষ্যে। তবে এর আশু বা প্রত্যক্ষ কারণ ছিল ১৯৬২ সালে শরীফ শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর পাকিস্তানের পূর্ব অংশের জনগণ শিক্ষা, অর্থনীতি, সামরিক-বেসামরিক চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য সব ক্ষেত্রে চরম বিমাতাসুলভ, বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হয়। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আগ্রাসন, রবীন্দ্রসংগীত চর্চায় নিষেধাজ্ঞা, নজরুলের কবিতার বিকৃতি, যেমন- 'মহাশ্মশান'-এর পরিবর্তে 'গোরস্তান', 'সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি সারাদিন আমি যেন ভাল হয়ে চলি', এর পরিবর্তে 'ফজরে উঠিয়া আমি দিলে দিলে বলি সারাদিন যেন আমি নেক হয়ে চলি' ইত্যাদি শিক্ষাবিদ সংস্কৃতিসেবীদের ক্ষুব্ধ করে তোলে। এ প্রেক্ষাপটে সংস্কৃতিসেবী, শিল্পী, সাহিত্যিকদের গণজাগরণমূলক বিভিন্ন কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হয় বাঙালি অর্থনীতিবিদদের দুই অঞ্চলের জন্য 'দুই অর্থনীতি তত্ত্ব'। এ পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬২ সালে প্রকাশিত হয় শরীফ শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট। ছাত্রসমাজ এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে।
বিশিষ্ট চক্ষু চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নেন। তার 'ষাট দশকের ছাত্র রাজনীতি' বইয়ে বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনের কিছু তথ্য ও গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ রয়েছে :
'১৭ সেপ্টেম্বর খুব ভোর থেকে অনেক ছাত্র সাধারণ মানুষ হরতালে সমর্থনে রাস্তায় পিকেটিং করতে থাকে। ... নয়টা, সাড়ে নয়টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকায় বিক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রীদের এক অনির্ধারিত সমাবেশে ছাত্র ইউনিয়নের নেতা কাজী জাফর এক সংক্ষিপ্ত বক্তব্য পেশ করেন। এর পরে সিরাজুল আলম খান, রাশেদ খান মেনন, মহিউদ্দীন আহমেদ, রেজা আলী প্রমুখ ছাত্রনেতাদের নেতৃত্বে এক জঙ্গি মিছিল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ছেড়ে হাইকোর্টের সামনে গিয়ে শহরের কেন্দ্রস্থলের দিকে এগোতে থাকে। কিন্তু মিছিল আবদুল গণি রোডে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ গুলি চালায়। এ গুলিবর্ষণের ফলে ঘটনাস্থলে গোলাম মোস্তফা বাবুল গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারায়। এ ছাড়া মিছিলে অংশগ্রহণকারী ওয়াজী উল্লাহ নামে এক গৃহভৃত্য মারাত্মকভাবে আহত হন। পরের দিন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কোনো রকম সতর্কবাণী ছাড়া পুলিশের এই আচমকা গুলি বর্ষণে আমরা অনেকটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ি। ... ঐরকম একটা পরিস্থিতিতে সিরাজ ভাইয়ের দৃঢ়তায় আমরা অবিচলভাবে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা কোনোদিন ভুলতে পারব না।'
আজ ১৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস। দিনটি কয়েকটি কারণে আমার মনোকষ্ট বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রথমত, এই দিনটি এখনও জাতীয় স্বীকৃতি পায়নি। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে করোনার কারণে গত পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে যেভাবে এই দিনটিতে কর্মসূচি পালন করা হতো যার মধ্যে সভা-সেমিনার, মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি, মিছিল সবকিছু ছিল, তার বেশিরভাগই করা যাচ্ছে না। এ দুঃখ আমার কাছে অনেক বড়। শিশুরা যেমন ঘরে আবদ্ধ থেকে অস্থিরতায় ভুগছে, বয়স্ক মানুষ আমি, বয়স সত্তরের কোটা অতিক্রম করার অপেক্ষায়। দেড় হাজার বর্গফুটের মধ্যে ছ'মাস ধরে আবদ্ধ। শুধু বিকেলে ছাদে আধা ঘণ্টা হাঁটাচলা করতে পারি। এই যে স্বাভাবিক চলাফেরায় নিয়ন্ত্রণ, এটি সহ্য করা সত্যি খুব কঠিন। অন্যদিকে, মনোকষ্টের কারণ শিক্ষার্থীর ঘরে আবদ্ধ থাকায় তাদের যে যন্ত্রণা, আবার শিক্ষকের দুর্দশা, যার মধ্যে আছে, এই করোনার মধ্যে শিক্ষার যে বিশ্বব্যাপী রূপান্তর প্রক্রিয়া চলছে, সে কীভাবে নিজেকে মানিয়ে নেবে এটা একদিক। আরেক দিকে লক্ষাধিক শিক্ষক বিনা বেতনে বছরের পর বছর পাঠদান করে চলেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশনায় তাদের মধ্যে একটা অংশকে অর্থসহায়তা দেওয়া হয়েছে। এই মানবিক দৃষ্টান্ত প্রশংসার দাবি রাখে। তবে বছরের পর বছর বিনা বেতনে স্কুল-কলেজ, কারিগরি প্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা, অনার্স মাস্টার্স কলেজে যেসব শিক্ষক এমপিও না পেয়ে দিন যাপন করছেন, তাদের জন্য দুঃখ প্রকাশের ভাষা আমার নেই। আশা করি, তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবেন। এটা সত্য, সরকার ইতোমধ্যে শিক্ষায় বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে চ্যালেঞ্জ অনেক। সরকার ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা ঋণ প্রদানের কথা ঘোষণা করেছে। শিক্ষার্থীদের একটা অঙ্কের অর্থ প্রদানের সহায়তা ঘোষণা করেছে। শিক্ষা টিভি চালু এবং শিক্ষানীতিতে ই-লার্নিং যুক্ত করার কথা বলেছে। তবে শিক্ষানীতি ২০১০-এ তথ্যপ্রযুক্তি বিকাশের কথা সুনির্দিষ্ট বলা আছে। প্রসঙ্গত, জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠনের মতো বিষয়গুলো সামনে আনা দরকার। শিক্ষার অব্যাহত অগ্রযাত্রায় শিক্ষা দিবসের যথার্থ মূল্যায়ন হবে- কায়মনোবাক্যে এ প্রার্থনাই করি।
শিক্ষা উন্নয়ন গবেষক
prof.qfahmed@gmail.com