সাক্ষাৎকার: ডা. আনোয়ারুল ইকবাল

ভ্যাকসিনের রাজনীতি বুঝেশুনে এগোতে হবে

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০     আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: শেখ রোকন

মহামারি ও সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডা. আনোয়ারুল ইকবাল বর্তমানে থাইরোকেয়ার বাংলাদেশ লিমিটেডের প্রেসিডেন্ট। তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহামারি বিষয়ক বৈশ্বিক টাস্কফোর্সেরও সদস্য। এর আগে তিনি আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) মহামারি নিয়ন্ত্রণ ও প্রস্তুতি বিভাগের ইউনিটপ্রধান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। আনোয়ারুল ইকবাল ১৯৯৪ সালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করেন। পরে সুইডেনের উমিও ইউনিভার্সিটি থেকে এমএস ডিগ্রি অর্জন করেন। তার ২০টির বেশি প্রকাশনা রয়েছে।
সমকাল: করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন বা টিকা উদ্ভাবন ও পরীক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ ও বিশ্বে অনেক কথাবার্তা হচ্ছে। আমরা সংবাদমাধ্যমে দেখছি, ৩৫টি টিকা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে আছে। নয়টি টিকা রয়েছে তৃতীয় ধাপের ট্রায়ালে। আসলে পরিস্থিতি কী?
আনোয়ারুল ইকবাল:
দেখুন, করোনা ভ্যাকসিনের জন্য আমাদের আকাঙ্ক্ষা অনেক তীব্র। আমরা সবাই চাইছি এটা তাড়াতাড়ি পেতে। আমরা সবাই ভ্যাকসিনের জন্য তাড়াহুড়া করতে চাইছি।
সমকাল: আমরা মানে বাংলাদেশ, না বিশ্ব?
আনোয়ারুল ইকবাল: আমরা মানে গোটা মানব জাতি। কারণ করোনাভাইরাস উন্নত, অনুন্নত সব দেশকেই কাবু করে ফেলেছে। কিন্তু কার্যকর ভ্যাকসিন উদ্ভাবন তাড়াহুড়ার কোনো বিষয় নয়। এটা এমন নয় যে, অর্থ থাকলেই আপনি দ্রুত একটি রকেট তৈরি করলেন। ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের অনেক ধাপ আছে। সব ধাপ নিশ্চিতভাবে পেরিয়ে তবেই চূড়ান্ত কথা বলা যাবে। বরং তাড়াহুড়া করতে গেলে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাতে ভালোর বদলে খারাপ হতে পারে।
সমকাল: রাশিয়ার আবিস্কৃৃত টিকা নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ পশ্চিমা বিশ্ব প্রভাবিত পক্ষগুলো এ ধরনের প্রশ্ন তুলছে।
আনোয়ারুল ইকবাল: আপনাকে মনে রাখতে হবে, রাশিয়া কোনো অংশে কারও থেকে কম নয়। জ্ঞান-বিজ্ঞান, পরমাণু প্রতিযোগিতা, রকেট, ফাইটার বিমান- সবকিছুতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টক্কর দিয়ে চলে। ভ্যাকসিন উদ্ভাবনেও তাদের সক্ষমতা খাটো করে দেখার পক্ষে নই আমি।
সমকাল: আমরা ভ্যাকসিন রাজনীতির কথা শুনে আসছি। আপনি বলতে চাইছেন, রাশিয়াও এই রাজনীতির শিকার?
আনোয়ারুল ইকবাল: ভ্যাকসিন নিয়ে রাজনীতি তো চলছেই। বলতে পারেন, বায়ো-পলিটিকস। কিন্তু বিজ্ঞান ও উদ্ভাবন তো রাজনীতি মানবে না। সপ্তাহখানেক আগে বিশ্বের নয়টি শীর্ষস্থানীয় ওষুধ কোম্পানি একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে যে, তারা বিজ্ঞানসম্মত উদ্ভাবন প্রক্রিয়ায় কোনো ছাড় দেবে না। তাড়াহুড়া করতে গিয়ে তারা মানব জাতির জন্য ক্ষতিকর কিছু করবে না। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগেই যে কোনোভাবে হোক একটি ভ্যাকসিন বাজারে নিয়ে আসতে চাইছেন।
সমকাল: এই নয়টি কোম্পানির মধ্যে কি মার্কিন কোম্পানিও আছে?
আনোয়ারুল ইকবাল: অবশ্যই আছে। মডার্না আছে, ফাইজার আছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কোম্পানি আছে। অবশ্য সিনোভ্যাক বা অন্য কোনো চীনা কোম্পানি নেই।
সমকাল: চীনা ভ্যাকসিনগুলোর কী পরিস্থিতি?
আনোয়ারুল ইকবাল: আপনাকে সোমবারের আপডেট দিতে পারি। তাদের চারটা কোম্পানির ভ্যাকসিন অ্যাডভান্স স্টেজে আছে। তারা বলছে, তিনটি ভ্যাকসিন সবচেয়ে এগিয়ে- সিনোভ্যাক, সিনোফার্ম, ক্যানসিনো। এর মধ্যে ক্যানসিনো চীন ও কানাডা যৌথভাবে করছে। এই ভ্যাকসিন দ্রুতই সেনাবাহিনীর সদস্যদের দেওয়া হবে বলে তারা জানিয়ে দিয়েছে।
সমকাল: দুই দেশের সেনাবাহিনীকে?
আনোয়ারুল ইকবাল: না, শুধু চীনা আর্মির মধ্যে দেওয়া হবে।
সমকাল: সাধারণ মানুষের জন্য কবে নাগাদ ভ্যাকসিন আসতে পারে- এই প্রশ্ন দ্য গার্ডিয়ান থেকে অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন গবেষণা দলের প্রধান সারাহ গিলবার্ডকে করা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, আমাদের হাতে 'ক্রিস্টাল বল' নেই। আপনি কী বলবেন?
আনোয়ারুল ইকবাল: বিলিয়ন ডলার প্রশ্ন। ফলে আমিও একই কথা বলব। ভ্যাকসিন কোনো ম্যাজিক দেখানোর বিষয় নয়। যখন সব ধাপ নিশ্চিতভাবেই পূরণ হবে, তখনই কেবল আমরা এটা পেতে পারি।
সমকাল: বাংলাদেশের জন্য কোন ভ্যাকসিন সবচেয়ে সম্ভাবনাময়? মানে কোন ভ্যাকসিন আগে পেতে পারি?
আনোয়ারুল ইকবাল: এ প্রশ্নের জবাবও এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। আগে ভ্যাকসিনটার উদ্ভাবন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে হবে, তারপর বলা যাবে। ভারত আমাদের দিতে চেয়েছে। উদ্ভাবন হলে তারা দিতে পারবে। কোন টিকা দেবে, সেটা বলেনি। তাদের হাতে একাধিক অপশন আছে। যেমন ব্রিটিশ-সুইডিশ ওষুধ কোম্পানি অ্যাস্ট্রোজেনিকায় ভারতের ৪০ শতাংশ মালিকানা আছে। তাদের নিজেদের কোম্পানি আছে ভারত বায়োটেক। তারাও ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সিনোভ্যাক আমাদের এখানে ট্রায়াল করবে। সেই ভ্যাকসিন প্রস্তুত হলে সেখানে আমাদের অবশ্যই অগ্রাধিকার থাকবে।
সমকাল: চীনের বাইরে আর কোনো দেশ কি আমাদের এখানে ভ্যাকসিনের ট্রায়াল দিতে চায়?
আনোয়ারুল ইকবাল: চীন তো আছেই। রাশিয়াও ট্রায়াল করতে চায় বলে জানি। ভারত চায় কিনা জানি না। ট্রায়াল মানেই সেই ভ্যাকসিন চূড়ান্ত হওয়া নয়। ভুল হতে পারে, কাঙ্ক্ষিত ফল নাও আসতে পারে। ক্রিকেট খেলায় আমরা যেমন দেখি, খেলতে গেলে ভুল হয়। ভ্যাকসিন উদ্ভাবনও ভুল করতে করতে শেখার মতো।
সমকাল: আমরা কত কোম্পানিকে বাংলাদেশে ট্রায়ালের অনুমতি দিতে পারি?
আনোয়ারুল ইকবাল: যত খুশি ট্রায়ালের অনুমতি দিতে পারি। আমাদের বিপুল জনসংখ্যা। ট্রায়ালের অনুমতি দেওয়া মানে ওই ভ্যাকসিনে আমাদের অগ্রাধিকার পাওয়া। আমাদের মতো দেশের জন্য সেটা ইতিবাচক হবে।
সমকাল: ট্রায়ালের কতদিন পর ভ্যাকসিন পেতে পারি?
আনোয়ারুল ইকবাল: দেখুন, সিনোভ্যাকের ট্রায়াল এখনও শুরুই হয়নি। আমি যতদূর শুনেছি, অক্টোবরের প্রথমদিকে শুরু হতে পারে। শুরু হওয়ার পর অন্তত নয় মাস লাগবে এর ফলাফল পেতে। তারপর ভ্যাকসিন উৎপাদন ও বিতরণের প্রশ্ন। আবার ভ্যাকসিন উদ্ভাবন হলেই সবাই একসঙ্গে পাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। দুই দিন আগের কথা আপনাকে বলতে পারি। ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলে দিয়েছেন যে, বিশ্বের সবার কাছে ভ্যাকসিন পৌঁছতে পৌঁছতে ২০২৪ সাল লেগে যাবে।
সমকাল: ভ্যাকসিন পাওয়ার আগে এ ব্যাপারে আমাদের কী প্রস্তুতি নিতে হবে?
আনোয়ারুল ইকবাল: অনেক প্রস্তুতি নেওয়ার ব্যাপার আছে। শুনছি, প্রথম দফায় তিন কোটি ডোজ ভ্যাকসিন আসবে। বেশিরভাগ টিকার ডাবল ডোজ দিতে হবে। একজন মানুষকে একটি টিকা দেওয়ার এক মাস পর আরেকটি। তাহলে কতজন পাবে? আবার এই টিকা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রাখার ব্যাপার আছে। বিদেশ থেকে হয়তো প্লেনে আসবে। সেগুলো আমাদের এখানে মজুদ রাখতে হবে। শুধু তো ঢাকায় নয়; পটুয়াখালী বা চাঁপাইনবাবগঞ্জে নিয়ে যেতে হবে। পরিবহনের সময় নির্দিষ্ট তাপমাত্রা রক্ষার ব্যাপার আছে। কম হলেও হবে না, বেশি হলেও হবে না। তাহলে কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। এসব বিষয়ে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।
সমকাল: এ জন্য আমাদের আর্থিক প্রস্তুতি কেমন হতে হবে?
আনোয়ারুল ইকবাল: এ বিষয়টি আমি জানি না। সরকারের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা নিশ্চয়ই হিসাব করেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তো বলে দিয়েছেন, যা বরাদ্দ প্রয়োজন তিনি দেবেন। বাইরে থেকে যতদূর বুঝি, সরকার এ ব্যাপারে ইতোমধ্যে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।
সমকাল: করোনা ভ্যাকসিনের যে বৈশ্বিক রাজনীতি, সে ক্ষেত্রেও তো আমাদের সতর্ক হওয়া উচিত।
আনোয়ারুল ইকবাল: অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। আমি মনে করি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে সতর্ক আছেন। সিনোভ্যাকের ট্রায়াল তো আটকে গিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। এই যে চীনের পাশাপাশি ভারত ও রাশিয়ার সঙ্গেও ভ্যাকসিন নিয়ে দেন-দরবার, এটা প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শিতার প্রমাণ। ভ্যাকসিনের বৈশ্বিক রাজনীতি বুঝেশুনেই আমাদের এগোতে হবে। প্রধানমন্ত্রী ঠিক সেটাই করছেন।
সমকাল: যদিও প্রশ্নটি উচ্চাভিলাষী হতে পারে, তবুও করি। বাংলদেশ নিজেই কি করোনা ভ্যাকসিন উদ্ভাবন করতে পারত না?
আনোয়ারুল ইকবাল: সক্ষমতা থাকলে সরকার নিশ্চয়ই করতে চাইত। আমাদের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতা থাকলে নিশ্চয়ই গবেষণা শুরু করে দিত। গ্লোব বায়োটেক সংবাদ সম্মেলন করে ঘোষণা দিয়েছিল। তাদের ইনস্টিটিউটটা ভালো। কিন্তু এ ব্যাপারে আর কী অগ্রগতি হয়েছে, আমি জানি না।
সমকাল: বাজার হিসেবেও তো বাংলাদেশ গ্লোবাল কোম্পানিগুলোর কাছে আকর্ষণীয় হওয়ার কথা। ১৭-১৮ কোটি জনসংখ্যা; বড় বাজার।
আনোয়ারুল ইকবাল: আমাদের জনসংখ্যা বড়, কিন্তু চীন বা ভারতের তুলনায় অনেক ছোট।
সমকাল: কিন্তু আরও অনেক দেশের চেয়ে তো বড় বাজার। ১৭-১৮ কোটি জনসংখ্যার দেশ খুব বেশি নেই।
আনোয়ারুল ইকবাল: আপনাকে জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতা দেখতে হবে। আমাদের জনসংখ্যার কত অংশ দরিদ্র? করোনা ভ্যাকসিনের বাজারমূল্য কত হবে, আমরা এখনও জানি না।
সমকাল: ইউনিসেফ বলছে, করোনা ভ্যাকসিনের বিশ্বব্যাপী সুষ্ঠু ও ন্যায্য বণ্টনে তারা নেতৃত্ব দেবে। এত বড় বড় দেশের প্রতিযোগিতা এবং বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ব্যবসার মধ্যে সংস্থাটি কি পারবে?
আনোয়ারুল ইকবাল:
ইউনিসেফ ছাড়াও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বিশ্বব্যাংকের মতো বৈশ্বিক সংস্থাগুলো এ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে 'জিএভিআই' বা গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন গঠিত হয়েছে। এসব উদ্যোগ আমাদের মতো দেশগুলোর জন্য নিঃসন্দেহে আশা জাগায়। কিন্তু মনে রাখতে হবে- প্রথম দফায় কত ভ্যাকসিন উৎপাদন সম্ভব? দেশের মধ্যেও কারা আগে পাবে? আপনাকে একটি প্রশ্ন করি- বাংলাদেশে ভ্যাকসিন এলে কাদের আগে পাওয়া উচিত?
সমকাল: সম্মুখযোদ্ধাদের প্রথমে পাওয়া উচিত।
আনোয়ারুল ইকবাল:
ঠিকই বলেছেন। কিন্তু পিপিই বা অন্যান্য সুরক্ষা সামগ্রীর ক্ষেত্রে কি সেটা ঘটেছিল?
সমকাল: আমরা আশা করতে পারি, অতীতের ভুল ও বিভ্রান্তি থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এমন হবে না। আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
আনোয়ারুল ইকবাল:
আমিও আশাবাদী হতে চাই। এ ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ভ্যাকসিন সংক্রান্ত খবর বুঝেশুনে প্রকাশ করতে পারে। আরেকটি কাজ করতে হবে; ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত মাস্ক ব্যবহারে সর্বাত্মক জোর দিতে হবে। কেউ যেন মাস্ক ছাড়া বাইরে না যায়। এর সঠিক ব্যবহার সবাইকে জানতে হবে। সমকালের জন্য শুভেচ্ছা।


বিষয় : সাক্ষাৎকার