উচ্চশিক্ষা

কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমন উপাচার্য চাই

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০     আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ড. জহিরুল হক শাকিল

একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে ধরা হয় সভ্যতার ধারক ও বাহক। সে হিসেবে বলা যায়, আমাদের এতদঞ্চলে যেহেতু সর্বপ্রথম বিশ্ববিদ্যালয় ছিল সেহেতু আমরা পৃথিবীর যে কোনো জাতি থেকে বেশি সভ্য। ধীরে ধীরে যখন আমাদের এতদঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ধ্বংস করা হলো প্রকারান্তরে আমরা আমাদের সভ্যতা থেকে ছিটকে পড়লাম। আমাদের দেশে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এতদঞ্চলে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা হচ্ছে। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক রেজিস্ট্রার স্যার পি. জে. হার্টগকে তৎকালীন সময়েই মাসিক ৪ হাজার টাকা বেতন, আবাসিকসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা দিয়ে প্রথম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাকে নিয়োগের উদ্দেশ্য ছিল লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। জাতিতে ব্রিটিশ আর ধর্মীয় পরিচয়ে ইহুদি হওয়া সত্ত্বেও তার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দিয়ে বিশেষত এতদঞ্চলে শিক্ষাদীক্ষায় পিছিয়ে পড়া মুসলমানদের অগ্রসর করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার তীর্থস্থানে পরিণত করেন স্যার পি. জে. হার্টগ।

শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পথচলা ছিল এ উপমহাদেশে ঈর্ষণীয়। দেশের বড় বড় অর্জনের সঙ্গে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম জড়িত। তবে প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য স্যার পি. জে. হার্টগের প্রচেষ্টা ছিল পূর্ব বাংলায় অসাম্প্রদায়িক ও জ্ঞানভিত্তিক মধ্যবিত্ত শ্রেণি যাতে গড়ে ওঠে। আর এ মধ্যবিত্ত অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ ঘটায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে নতুন রাষ্ট্র জন্ম নেয়। তাই একটি বিশ্ববিদ্যালয় সঠিক পথে চললে একটি সমাজ কাঠামো তথা রাষ্ট্র কাঠামো কীভাবে পরিবর্তন করে তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সিলেট অঞ্চলের সর্বপ্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। যদিও চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয় নামে একটি প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখায় ছিল বলে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে জানা যায়। আমি ও আমার এক ছাত্র (যিনি পরবর্তীকালে শিক্ষক হয়েছেন) মিলে এ সম্পর্কে একটি গবেষণা প্রবন্ধ শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় জার্নালে প্রকাশ করি। যার সূত্র ধরে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ব্যাপক গবেষণা চালাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্ব অনুসন্ধানে।

যাহোক, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুটা ভালো হওয়ায় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে দক্ষ, কর্মঠ, সৎ ও নিষ্ঠাবান উপাচার্য পাওয়ায় এবং দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ায় এ প্রতিষ্ঠানকে পেছনে ফিরে থাকাতে হয়নি। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় আজ কেবল সিলেটের নয়, দেশের গর্ব। দেশের সেরা ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়। এখানকার গ্র্যাজুয়েটরা কেবল দেশে নয়, বহির্বিশ্বে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা ও নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আজকের ডিজিটাল বাংলাদেশের অন্যতম অংশীদার হচ্ছে শাবিপ্রবি। এখানে সেশনজট শূন্যের কোঠায়। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হলে প্রতিটি ছাত্রকে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হতে হয়। দেশের এক কোণে অবস্থান হলেও সারাদেশের জ্ঞানপিপাসুদের দৃষ্টি কেড়েছে এ বিশ্ববিদ্যালয়। তাই সিলেটের চতুর্থ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় (অন্য দুটি হলো সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) তথা হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সেই ধারায় যাত্রা শুরু করবে, সে প্রত্যাশা রইল। আশা করছি, সৃষ্টিশীলতা ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার স্থান হবে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস।

দেশের ৭ম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পাচ্ছে হবিগঞ্জ জেলা। গত ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০২০ পাস হয়েছে। এখন কেবল সেই আইনের বাস্তবায়ন। এর আগে যে ৬টি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশে স্থাপিত হয়েছে সেগুলো হলো :বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়-ময়মনসিংহ (১৯৬১ সাল), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়-গাজীপুর (১৯৯৮ সাল), শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়-ঢাকা (২০০১ সাল), চট্টগ্রাম ভেটেরেনারি অ্যান্ড অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় (২০০৬ সাল), সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (২০০৬ সাল) ও খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (২০১৯ সাল)। আর ২০২০ সালে ৭ম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপিত হতে যাচ্ছে হবিগঞ্জে।

হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে :'কৃষিবিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিশ্বের সঙ্গে সংগতি রক্ষা ও সমতা অর্জন এবং জাতীয় পর্যায়ে কৃষিবিজ্ঞানে উন্নত শিক্ষাদানের পাশাপাশি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রচলিত অন্যান্য বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি এবং নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনসহ দেশে কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে হবিগঞ্জ জেলায় এই কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।' তাই রাজনৈতিক রেষারেষি ও সংকীর্ণ মনোবৃত্তি থেকে মুক্ত হয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয় শুধু দেশের নয়; বিশ্বের একটি সেরা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে, সেই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে হবে। এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুধু গতানুগতিক ডিগ্রিধারী সৃষ্টি হবে না; এখান থেকে উদ্যোক্তা সৃষ্টি হবে। যার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে আমাদের এলাকায়, সমগ্র দেশে, দেশের গণ্ডি পেরিয়ে সমগ্র বিশ্বে। দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টি হবে এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির দেশে নতুন নতুন প্রজাতি সৃষ্টি হবে; প্রযুক্তির উদ্ভাবন হবে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের নব দ্বার উন্মোচন হবে হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। যার মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে, দেশ সমৃদ্ধির দিকে অগ্রসর হবে। মনে রাখা প্রয়োজন, বিশ্ববিদ্যালয় হলো বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও প্রয়োগের কেন্দ্র। হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে সেন্টার অব এক্সেলেন্স হিসেবে গড়ে তুলতে হবে শুরুর দিকেই।

আর এজন্য শুরুতেই একজন সত্যিকারের স্কলার, মেধাবী, সৎ, নিষ্ঠাবান, কর্মঠ, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, প্রগতিশীল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী শিক্ষাবিদকে শীর্ষ পদে তথা উপাচার্য হিসেবে নিয়োগের বিকল্প নেই। অনেকে বলবেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী- এটা কি উপাচার্য বা উপ-উপাচার্য হওয়ার কোনো যোগ্যতা হতে পারে? মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানে অসাম্প্রদায়িক ও সামাজিক ন্যায়বিচারে বিশ্বাসী। সত্যিকারের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী একজন ব্যক্তি অবশ্যই দুর্নীতি, অবিচার, অপশাসন মনেপ্রাণে ঘৃণা করবেন, দূরে থাকবেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অন্যায়ের কাছে মাথানত করতে শেখায় না। সেজন্য আমি বলছি- মেধাবী, কর্মঠ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী হতে হবে। কারণ একজন ব্যক্তির মধ্যে দেশপ্রেম না থাকলে, দেশের নীতি-আদর্শ তথা মূলনীতির ওপর বিশ্বাসী না হলে তার কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করা যায় না।

বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। উপাচার্য তার কর্মকাণ্ডের জন্য সিন্ডিকেটের (যার প্রধান তিনি নিজেই) কাছে দায়বদ্ধ। বৃহৎ অর্থে আচার্য বা রাষ্ট্রপতির কাছে দায়বদ্ধ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুতেই কয়েক হাজার কোটি টাকার অবকাঠামো নির্মাণ হবে। হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। সবই হবে উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের মাধ্যমে। এ প্রতিষ্ঠানে যদি একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তি নেতৃত্বে না থাকেন তাহলে কিন্তু সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া কষ্টসাধ্য হবে। হবিগঞ্জবাসীর উল্লাস দীর্ঘশ্বাসে রূপ নেবে, যা আমাদের মোটেই কাম্য নয়।

স্বাগতম হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার সম্প্রসারণে হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ভূমিকা রাখবে, এ প্রত্যাশা।

অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট
jahirul-psa@sust.edu