বিজিবি-বিএসএফ সম্মেলন

সীমান্ত হত্যা বন্ধ করুন সর্বাগ্রে

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০     আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয়

ঢাকায় শনিবার সমাপ্ত চার দিনের বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত সম্মেলনে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) আলোচ্য সূচিতে অন্যান্য বিষয় ছাপিয়ে দুই দেশের সীমান্তরেখায় হত্যার ঘটনা যে শীর্ষে উঠে এসেছে, তার সংগত কারণ রয়েছে। বিজিবি ছাড়াও বেসরকারি বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও সংবাদমাধ্যম সূত্রে আমরা দেখছি, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেও সীমান্তে প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ৩৫ জন বাংলাদেশি নাগরিক। বিএসএফের নির্যাতনে আহত বাংলাদেশি নাগরিকের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। স্বীকার করতে হবে, সীমান্ত হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিজিবির পক্ষে অতীতে প্রায় সব সীমান্ত সম্মেলনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে এবং বিএসএফের পক্ষ থেকে তা 'শূন্যে নামিয়ে আনা'র প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বাস্তবে সীমান্ত হত্যা বন্ধ হয়নি। আমাদের মনে আছে, গত বছর জুন মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সীমান্ত সম্মেলনেও বিএসএফের তৎকালীন মহাপরিচালক 'অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানি' রোধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তা প্রতিপালিত হয়নি। প্রতিবেশী দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বর্তমান প্রধানও সম্মেলনপরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে একই প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেলেন। এ ক্ষেত্রে আমরা কতটা আশা ও আস্থা ব্যক্ত করতে পারি? সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা নিয়ে বারংবার প্রতিশ্রুতি প্রদান ও ভঙ্গের এই চিত্র আমাদের উদ্বিগ্ন শুধু নয়; হতাশও করে তোলে। বিভিন্ন সময়ে এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা এ ব্যাপারে স্পষ্ট অবস্থান প্রকাশ করে এসেছি- সীমান্ত হত্যা বন্ধ করতে হবে সর্বাগ্রে।

অতীতের মতো এবারও ভারতীয় পক্ষের এই যুক্তি কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না- বিএসএফ সদস্যরা 'প্রাণ বাঁচাতে' মারণাস্ত্র ব্যবহার করে। তর্কের খাতিরে আমরা যদি বিএসএফের এই ভাষ্য সঠিক বলেও মেনে নিই; কথিত ইট-পাথর ছোড়ার বিপরীতে বুলেটের আঘাত কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। বরং আমরা বিভিন্ন সময়ে দেখেছি, সীমান্তের এপাশ থেকে বাংলাদেশি নাগরিকদের ধরে নিয়ে গিয়ে পরবর্তীকালে মৃতদেহ ফেরত দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি ঠাকুরগাঁও সীমান্ত এলাকায় বাংলাদেশি ভূখণ্ডে প্রকাশ্য দিবালোকে মাছ ধরতে যাওয়া আমাদের একজন নাগরিককে গুলি ছুড়ে হত্যা করেছে বিএসএফ। ফলে শনিবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বিএসএফের বর্তমান প্রধানের এই বক্তব্য মেনে নেওয়া যায় না- শুধু পরিস্থিতি চরমে পৌঁছলেই তারা প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে। আমরা অস্বীকার করি না- সীমান্ত হত্যাকাণ্ডের একটি বড় কারণ চোরাচালান। কিন্তু এও স্বীকার করতে হবে- বিশ্বের সব দেশের সীমান্তেই এ ধরনের তৎপরতা রয়েছে। কিন্তু সে জন্য কোন সীমান্তে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটে? আরও বেদনার বিষয়, বাংলাদেশ-ভারত সরকার পরস্পরকে 'বন্ধুরাষ্ট্র' বিবেচনা করে। এ ক্ষেত্রে অতিরঞ্জনও নেই। শুধু ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিকভাবেই দুই দেশ ঘনিষ্ঠ নয়; দুই দেশের বন্ধুত্বের ভিত্তি নবায়ন হয়েছে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে।

একাত্তরে যেখানে ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশের জনসাধারণের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে, সেই বাহিনীর কাছ থেকে প্রাণঘাতী বুলেট কি দুঃস্বপ্নেও দেখা দিতে পারে? বাস্তবে বন্ধুত্বের এই আবহ দুই দেশের বিস্তীর্ণ সীমান্তরেখায় বরাবরই হোঁচট খেয়েছে। আমরা মনে করি, কারণ যাই হোক না কেন, একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর এমন হত্যাকাণ্ড আর চলতে দেওয়া যায় না। অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম নিশ্চয়ই সমর্থনযোগ্য নয়। তার জন্য প্রচলিত আইন ও দণ্ড রয়েছে। আমরা চাই, ভারত সরকার বিলম্বে হলেও তাদের 'ট্রিগারহ্যাপি' সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে সামলানোর ব্যবস্থা নেবে। স্বীকার করতেই হবে- বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, সাংস্কৃতিক বিনিময়, সীমান্ত হাট স্থাপনসহ নানা ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে; ছিটমহল বিনিময় ও অপদখলীয় ভূমি নিষ্পত্তির মতো আক্ষরিক অর্থেই ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে। কিন্তু সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যাকাণ্ডে এসব ঢাকা পড়ে যায়। আমরা এর অবসান দেখতে চাই যে কোনো মূল্যে। দুই দেশের সীমান্ত স্থিতিশীল রাখতে অন্যান্য ইস্যুও নিশ্চয়ই আলোচনা হতে পারে; গৃহীত হতে পারে যৌথ ব্যবস্থাপনা; কিন্তু সীমান্ত হত্যা বন্ধ না হলে বাকি সব আলোচনা অনেকাংশে অর্থহীন।