বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর মন্ত্রিসভা বৈঠকে প্রকৌশল গবেষণা কাউন্সিল গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের এ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব ন্যস্ত হয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ওপর। ফলে বিষয়টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মাসিক সমন্বয় সভায় নিত্যকার কর্মসূচি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে এর বাস্তবায়ন অগ্রগতি সম্পর্কে প্রতি মাসে আলোচনায় আনা হয়। জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নীতি ১৯৮৬-তে প্রকৌশল গবেষণা কাউন্সিল স্থাপনের বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও পরবর্তীকালে প্রণীত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নীতি ২০১১ সালে ওই কাউন্সিল স্থাপনে জোরালো ভূমিকা নেয় বর্তমান সরকার।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা কাউন্সিল ও সর্বশেষ বাংলাদেশ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ গবেষণা কাউন্সিল গঠিত হয় যথাক্রমে ১৯৭২, ১৯৭৩, ১৯৮১ ও ২০১৫ সালে।

২০১৩ সালে আমি তখন পরমাণু শক্তি কমিশনে কর্মরত। কমিশনের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের সদস্য প্রকৌশলী মো. আলী জুলকারনাইন একদিন আমাকে জানালেন, সরকার চাচ্ছে দেশে একটি জাতীয় প্রকৌশল গবেষণা কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করতে। যার কাজ হবে দেশের সব প্রকৌশল সংস্থাকে পেশাদারি কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সংশ্নিষ্ট বিষয়ে গবেষণা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা এবং গবেষণালব্ধ ফলাফল দেশের উন্নয়নের স্বার্থে ব্যবহার করা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে তিনি আমাকে একটি ধারণাপত্র তৈরি করা যায় কিনা পরামর্শ দিলেন। আমি সানন্দে রাজি হয়েছিলাম। ভাবলাম, দেশে যেখানে অন্যান্য পেশাজীবীর জন্য অনেক গবেষণা কাউন্সিল রয়েছে, সেখানে প্রকৌশল পেশাজীবীদের জন্য কোনো গবেষণা কাউন্সিল থাকবে না কেন? বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক গবেষণার তুলনায় প্রযুক্তি ও প্রকৌশলগত বিষয়ের গবেষণার সম্ভাব্য বিনিয়োগ অনেক অনেক গুণ বেশি হয়। সে কারণে প্রকৌশলবিষয়ক প্রয়োগধর্মী গবেষণা কার্যক্রম প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করাকে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করাই বোঝায়। দেশ-বিদেশের অন্যান্য গবেষণা কাউন্সিলের আইন, রূপকল্প, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ইত্যাদি পর্যালোচনা করে প্রকৌশল গবেষণা কাউন্সিল স্থাপনের লক্ষ্যে ধারণাপত্রে রূপকল্প থাকল 'আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে প্রযুক্তি ও প্রকৌশল জ্ঞান আহরণ, এর যথাযথ প্রয়োগ, প্রসার এবং উন্নয়নের মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক সুখী, সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠন'। লক্ষ্য ছিল সুখী, সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে প্রযুক্তি ও প্রকৌশল গবেষণার নিত্যনতুন ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিতকরণ, সম্প্রসারণকরণ, শক্তিশালীকরণ, অর্থ সংগ্রহকরণ, পেশাদারিত্ব অর্জনের লক্ষ্যে মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সংশ্নিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন, গবেষণালব্ধ ফলাফল বাণিজ্যিকীকরণ, বিদেশি প্রযুক্তি আত্তীকরণ ও অভিযোজনকরণ, কারিগরি পরামর্শ এবং সেবা প্রদান।

উদ্দেশ্যাবলির মধ্যে আরও কয়েকটি বিষয়ে :১. টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শিল্প, শক্তি, কৃষি, পরিবেশ, সেবাসহ অর্থনীতির সব খাতে প্রযুক্তি ও প্রকৌশল বিদ্যার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিতকরণ, ২. বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত জ্ঞানভিত্তিক সমাজে একটি শক্তিশালী, সৃজনশীল, উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন এবং প্রতিযোগী জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে উপযুক্ত জ্ঞানসম্পন্ন উন্নত মানবসম্পদ, অবকাঠামো ও প্রতিষ্ঠান তৈরিকরণ, ৩. প্রযুক্তি ও প্রকৌশল গবেষণার প্রধান ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিতকরণ এবং তদানুযায়ী স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা পরিকল্পনা প্রণয়ন, পরিচালন এবং তার সমন্বয়, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন, ৪. মৌলিক, ফলিত ও উন্নয়ন গবেষণার উপযোগী প্রযুক্তি সৃষ্টি, অভিযোজন, হস্তান্তর ও আত্তীকরণে উৎসাহিতকরণ, ৫. আধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ দেশ গড়তে প্রযুক্তি ও প্রকৌশল গবেষণার নানাবিধ ক্ষেত্রে যথাযথ প্রশিক্ষণ ও পেশাগত দক্ষতার উন্নয়ন এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রকৌশল শিক্ষায় উদ্বুদ্ধকরণ, ৬. বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রকৌশল জ্ঞানচর্চা প্রতিষ্ঠানগুলোয় তাত্ত্বিক জ্ঞানের সঙ্গে শিল্প-কারখানায় ব্যবহূত আধুনিক প্রকৌশল জ্ঞানের গভীর সম্পর্ক স্থাপনে সহায়তা প্রদান এবং সমন্বয় সাধন, ৭. প্রকৌশল খাতের প্রায়োগিক গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান এবং গবেষণালব্ধ ফলাফলের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিতকরণ, ৮. দেশে বিদ্যমান প্রকৌশল গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তবতা ও চাহিদার নিরিখে যুগোপযোগী বিষয়ের ওপর গবেষণা কার্যক্রম গ্রহণের বিষয়ে পরামর্শ প্রদান ও কার্যক্রম সমন্বয়করণ।

প্রকৌশল গবেষণা কাউন্সিল গঠনের রূপরেখা চূড়ান্তকরণের লক্ষ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় আমাদের ধারণাপত্র উপস্থাপনের জন্য ২০১৪ সালের ১৮ মে একটি সেমিনার আয়োজন করে। সেমিনারে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রযুক্তি-সংশ্নিষ্ট অধ্যাপক, বিজ্ঞানী, আইইবির প্রতিনিধি ও প্রকৌশল শাখার বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান এবং সভাপতিত্ব করেন প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী। ওই সেমিনারে ধারণাপত্রের ওপর বিস্তারিত আলোচনা শেষে বাংলাদেশ প্রকৌশল গবেষণা কাউন্সিল গঠন করতে একটি আইন তৈরি করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় একটি খসড়া আইন তৈরি করার জন্য একটি উপকমিটি গঠন করে।

উপকমিটির আমরা চার সদস্য (অধ্যাপক ড. হাবিবুর রহমান, বুয়েট; অধ্যাপক ড. এম কামাল উদ্দিন, বুয়েট ও প্রকৌশলী মেজবাহুর রহমান টুটুল, আইইবি) বহির্বিশ্বের প্রকৌশল গবেষণা কাউন্সিল আইন পর্যালোচনা করে একটি খসড়া আইন প্রণয়ন করে ২০১৫ সালের ৩ ডিসেম্বর মন্ত্রণালয়ে দাখিল করি। মন্ত্রণালয় বিষয়টি বিভিন্নভাবে আলোচনা-পর্যালোচনা করে পরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। গত বছর ১৪ অক্টোবর মন্ত্রিসভায় বাংলাদেশ প্রকৌশল গবেষণা কাউন্সিলের খসড়া আইনটি অনুমোদন লাভ করে। চলতি মাসের ৮ তারিখে মন্ত্রিপরিষদ অনুমোদিত খসড়া আইনটি অনেক যাচাই-বাছাই শেষে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের পর বিল আকারে পাস হয়। আজ আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রকৌশল গবেষণা কাউন্সিল বাস্তবায়ন করা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

শিগগির হয়তো দেশে প্রকৌশলী সমাজের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল গবেষণা কাউন্সিল প্রতিষ্ঠিত হবে। অন্যান্য গবেষণা কাউন্সিল যেমন দু-একটি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থেকে কাজ করে। কিন্তু বাংলাদেশ প্রকৌশল গবেষণা কাউন্সিলকে প্রায় ২০টি মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তিগত গবেষণার কাজ করার দরকার হবে। এ ক্ষেত্রে সমন্বয়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে, যাতে করে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের মাধ্যমে গবেষণার কাজ ও লব্ধ ফলাফল দেশের উন্নয়নে ব্যবহার করতে বাধাগ্রস্ত না হয়।

আজ দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিদের অভাব অনুভূত হচ্ছে। ফলে জনসাধারণ তথা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। তাই সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সনির্বন্ধ অনুরোধ করব, দেশের সিংহভাগ বাজেট যাদের মাধ্যমে ব্যয় হয় এবং মেধাবী প্রকৌশলীদের প্রায়োগিক গবেষণার কাজে উদ্বুদ্ধ করে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব বাস্তবায়ন করতে একটি যোগ্য, দক্ষ ও অভিজ্ঞ, উদ্যমী পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে সুযোগ করে দিন।

গোড়ায় গলদ হলে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো এটিও একটি গতানুগতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার ক্ষেত্রে তৈরি হবে বিস্তর ফারাক।

সহযোগী অধ্যাপক, নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়