স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা শেষ মানে নানাবাড়িতে যাওয়া। গ্রামের সবাই লতায়-পাতায় আত্মীয়। তাই আশপাশের সবাই দেখা করতে আসত। এত ভিড়ের মধ্যেও চোখ গিয়ে পড়ত একটি ঘরের জানালায়। ওখানে একটি কৌতূহলী কিন্তু হাসিমাখা মুখ। কখনও ঘরে ঢুকত না। ফ্রক পরা মেয়েটি জানালার গ্রিল ধরে তাকিয়ে থাকত আমাদের দিকে। চোখে চোখ পড়লে হাততালি দিতে দিতে দৌড়ে পালাত। ওকে সবাই 'পাগলি' বলে ডাকত। আস্তে আস্তে আমরা বড় হয়ে উঠলাম। বড় হতে লাগল পাগলিও। কিন্তু ওর মনটা রয়ে গেল শিশুর মতোই। গ্রামময় সে ঘুরে বেড়াত। পাগলির মা তাকে আগলে রাখতেন। গোসল করানো, খাওয়ানো, চুল আঁচড়ে দেওয়া- সবই করতেন তিনি। জীবনের ব্যস্ততা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নানাবাড়িতে যাওয়া কমেছে। শেষবার গিয়েছিলাম বছরখানেক আগে। পাগলিকে আর দেখিনি। মামাতো ভাইবোনদের কাছে জানলাম, পাগলির মা মারা গেছে। ভাইবোনেরা এখন ওকে ঘরের মধ্যে আটকে রাখে। পাগলি চিৎকার করে, গুমরে গুমরে কাঁদে।
ফরিদপুর জেলা শহরে আমাদের মহল্লায় ছিল 'দেবী'। বিয়ে হয়েছিল অল্প বয়সে। কিন্তু অপ্রকৃতিস্থ হওয়ায় স্বামী পরিত্যাগ করে। মা ভিক্ষা করতেন আর দেবী অন্যের বাড়িতে গৃহস্থালি কাজ করত। রোজ সন্ধ্যায় মহল্লার পুকুরে গোসল করতে নামত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পুকুরে থাকত। দেবীর মা পুকুরপাড়ে বসে মেয়েকে পাহারা দিতেন। সস্নেহে ডাকতেন- 'দেবী, উঠে আয়, উঠে আয়।' দৃশ্যটা একই রকম ছিল অনেকদিন। বার্ধক্য, অপুষ্টি ও অসুখে দেবীর মা মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত। এরপর দেবী পুকুরে নামত বটে, তাকে পাহারা দেওয়ার জন্য পুকুরপাড়ে বসে থাকার কেউ ছিল না। কয়েকদিনের মধ্যে সেও ওই পুকুরে ডুবেই মারা গেল।
পুরোনো ঘটনাগুলো নতুন করে মনে পড়ল গাইবান্ধার ফুলছড়ির সাদিক হোসেনের খবর পড়ে। ১০ বছর ধরে এক পা বেঁধে রাখা হচ্ছে এই মানসিক প্রতিবন্ধী কিশোরের। বাবা মারা গেছেন, মায়ের বিয়ে হয়েছে অন্যত্র। অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছে না দরিদ্র দাদি। দুর্ঘটনা এড়াতে বাধ্য হয়ে বন্ধন-ব্যবস্থা। জন্মের পর এক বছর পর্যন্ত ভালো ছিল সাদিক। টিটেনাসের ইনজেকশন দেওয়ার পর হঠাৎ করে খিঁচুনি ওঠে। তারপর থেকে এমন পরিস্থিতি। জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে প্রতিবন্ধী ভাতা মেলে; কিন্তু তা দিয়ে খাবারের খরচ মেটানোই দায়। চিকিৎসা চলবে কীভাবে?
সন্দেহ নেই, দেশে অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে। কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসায় এখনও পিছিয়ে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতারও অভাব অনেক। গত বছর যুক্তরাজ্যভিত্তিক জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ল্যানসেটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে শিশুদের মধ্যে ৩ দশমিক ৪ থেকে ২২ দশমিক ৯ শতাংশ এবং প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ৩১ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে মানসিকভাবে অসুস্থতার শিকার। অন্যদিকে দেশে প্রতি লাখে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ আছেন শূন্য দশমিক ৭৩ জন। স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দের মাত্র শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশ ব্যয় হয় মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য। সামাজিক কর্মসূচিও অপ্রতুল।
আমাদের মতো স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে মানসিকভাবে অসুস্থরা পরিবার ও সমাজের জন্য যেন বোঝা। পরিবারের বাইরে তো বটেই, পরিবারেও প্রতিনিয়ত নির্যাতন, হয়রানি, অবহেলার শিকার। বিশেষজ্ঞরা বলেন, অনেক মানসিক অসুস্থতা সারানো যায়। এর জন্য তিনটি জিনিস বেশি জরুরি। যেমন- সাইকোলজিক্যাল থেরাপি, ওষুধ এবং কমিউনিটি সাপোর্ট প্রোগ্রাম। কিন্তু অনেক পরিবার জানেই না কোথায় কিংবা কীভাবে তাদের সন্তানের চিকিৎসা করাবেন।
দেখেছি, মানসিক অসুস্থতার শিকার বেশিরভাগ সন্তানের বাবা-মাই চিন্তা করেন তাদের মৃত্যুর পর এই সন্তানের কী হবে। এই যন্ত্রণা তাদের কুরে কুরে খায়। এখানেই প্রয়োজন সমাজ ও রাষ্ট্রের এগিয়ে আসা। আসতে হবে এখনই।
  সাংবাদিক

মন্তব্য করুন