লেখার শিরোনাম অনুজপ্রতিম এক নদী গবেষকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি পোস্ট থেকে তার অনুমতি নিয়ে ধার করা। তার অনুরোধক্রমে নাম উল্লেখ করছি না। তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৃতীয় শ্রেণির পরিবহন পুলের গাড়িচালক আবদুল মালেকের দুর্নীতির অসামান্য সব কীর্তি দেখে উপরোক্ত মন্তব্য তার ফেসবুকে শেয়ার করেছেন। কীর্তিমান প্রাতঃস্মরণীয় মহাপুরুষ আবদুল মালেকের কাহিনিতে পরে আসছি। আর বাংলাদেশের দুর্নীতির মহাকাব্যেও আবদুল মালেক শেষ আবদুল মালেক নন। আরও বহু আবদুল মালেক আছে। সুতরাং আবদুল মালেকদের কাহিনি আরব্য রজনীর কাহিনির মতো। এক হাজার এক রাত চলতে পারে। স্বাস্থ্য, জ্বালানি, ভূমি, জনপ্রশাসন, স্থানীয় প্রশাসন, স্বরাষ্ট্রসহ সরকারের নানা অধিদপ্তরের দুর্নীতির কাহিনি চলতেই থাকবে। তবে ইদানীং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর একটু বেশি খবর হচ্ছে। মূলত করোনার কারণে।
পাঠক বিরক্ত না হলে একটু পেছনে ফিরে যেতে চাই। দুটি ঘটনা। কোনোটাই আমার ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের বিষয় ছিল না; প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ জড়িত ছিল। সরকারের ভিত প্রতিষ্ঠানের শক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে গেলে সরকারের বদনাম হয়, সরকার দুর্বল হয়। আমার প্রায় পঞ্চাশ বছরের কর্মজীবনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আমাকে দুটো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আর এই দুটি প্রতিষ্ঠান যে আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত তা বঙ্গবন্ধুর আগ্রহ ও নির্দেশে করা। প্রথমটি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আইন-১৯৭৩ ও পরেরটি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন আইন-১৯৭৩। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী যে আস্থায় এই দুটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব আমাকে দিয়েছিলেন, চেষ্টা করেছি তার আস্থার প্রতি সম্মান দেখাতে ও এই আইন দুটির আওতায় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে। তবে সব কাজ যে একশ' ভাগ এই আইনের অধীনে করা গেছে তা নয়, তবে চেষ্টার ঘাটতি ছিল না।
মূল বিষয়ে ফিরে আসি। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করলেন দেশে কয়েকটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হবে। পর্যায়ক্রমে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, খুলনায় এসব বিশ্ববিদ্যালয় হবে। এগুলো প্রথমে হবে এফিলিয়েটিং বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যত মেডিকেল কলেজ হবে, তা এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের  নিয়ন্ত্রণাধীন থাকবে। সে মতে আইনও প্রণয়ন করা হলো এবং তা সংসদে পাস হলো। প্রথমটি চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আইন। চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপন করে একটি সরকারি মেডিকেল কলেজের  সাবেক এক অভিজ্ঞ অধ্যক্ষকে উপাচার্যের দায়িত্ব দেওয়া হলো। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে ফরমান এলো মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকবে। এই সংবাদ জানার পর বলি, এ তো সরাসরি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন আইনের বরখেলাপ। পত্র লিখে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়কে তা জানাই।
তখন স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রয়াত মোহাম্মদ নাসিম। তার মন্ত্রণালয়ে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ও আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে একটি সভা ডাকা হলো। আমার অস্ত্র বঙ্গবন্ধুর আমলে করা মঞ্জুরি কমিশন আইন। সঙ্গে আইনটি নিয়ে যাই। আর সঙ্গী করি বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক কামরুল হাসান খানকে। সভায় বেশির ভাগই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র কর্মকর্তা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষা সচিব ও একজন উপসচিব ছিলেন। শুরুতেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানতে চাইলেন বিষয়টি প্রসঙ্গে। তার মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বিষয়টি উত্থাপন করলেন। তখন আমি ফ্লোর নিয়ে বলি বঙ্গবন্ধু সরকারের করা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের আইন যদি সবাই মানেন তাহলে বাংলাদেশে যত বিশ্ববিদ্যালয় হবে বা আছে, তার কর্মকাণ্ড তদারক করার একমাত্র এখতিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের, অন্য কারও নয়। এই কমিশন পৃথক আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত সম্পূর্ণরূপে একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান। আইনের ৫ নম্বর ধারাটি পড়ে শোনাই। সব শুনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বললেন চেয়ারম্যনের বক্তব্য ঠিক, সভা এখানেই শেষ।
আর একটি ঘটনা বলি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রস্তাব করল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উন্নয়ন খাতের চেক মন্ত্রণালয় থেকে বণ্টন হবে, যা সব সময় মঞ্জুরি কমিশন থেকে বণ্টন করা হয়েছে। আবার ১৯৭৩ সালের আইনের আশ্রয় নিলাম। পরিস্কার বলা আছে, 'বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের সকল ধরনের আর্থিক বিলিবণ্টন কমিশনের মাধ্যমে হবে। মন্ত্রণালয় মেনে নিল। সামনের মে মাসে কমিশনে আমার দায়িত্ব শেষ করার দু'বছর পূর্তি হবে। কিন্তু এখনও বিভিন্ন মহল শিক্ষা নিয়ে কোনো কিছু জানতে হলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে। তাদের নিরুৎসাহিত করি; কারণ, আমি তো এখন এই প্রতিষ্ঠানের কেউ না। অনেকে নাছোড়বান্দা।
এবার আবদুল মালেক। এতদিন পর বোঝার চেষ্টা করছি কেন সেদিন সব মেডিকেল কলেজের দায়িত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিতে চেয়েছিল বা উন্নয়নের চেক বিতরণের দায়িত্ব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। হয়তো যিনি বা যারা এটা চিন্তা করেছেন তারা একটি সৎ উদ্দেশ্যে তা করেছেন, মনে করেছেন এতে প্রতিষ্ঠান লাভবান হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব অনেক দুর্বলতা আছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই, তবে তা শোধরানোর উপায় ওইসব বিশ্ববিদ্যালয় আইনেই আছে। যিনি বা যারা  চিন্তা করেছিলেন তাদের উদ্দেশ্যে হয়তো কোনো বদ মতলব ছিল না। কারণ একটি মন্ত্রণালয় বা সরকারি অধিদপ্তরগুলোর সব মানুষ তো খারাপ হতে পারে না। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় বলা যেতে পারে সমাজে ভালো মানুষের কদর বা চাহিদা তেমন আর নেই। এখন সর্বক্ষেত্রে বাটপাড় সাহেদ আর আবদুল মালেকদের রমরমা অবস্থা। 
আবদুল মালেক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন গাড়িচালক। তার মাস শেষে সর্বসাকল্যে বৈধ পন্থায় আয় নাকি অনূর্ধ্ব পঞ্চাশ হাজার টাকা। চেহারাতে বেশ রোশনাই আছে। তিনবার হজ আর একাধিকবার ওমরাহ পালন করেছেন। পরের জমি দখল করে বাবার কবরকে মাজার বানিয়েছেন। করোনার আগে সেখানে মাহফিল হতো বলে গণমাধ্যম জানিয়েছে। এলাকার মানুষ তার নামের আগে সম্মান জানিয়ে 'হাজি' শব্দটি ব্যবহার করে। স্থানীয়দের কাছে  হাজি বাদল নামে পরিচিত। সেই আবদুল মালেক কিনা র‌্যাবের হাতে দুর্নীতির দায়ে আটক হলেন।
দুর্নীতির তালিকা বেশ চোখ ধাঁধানো। চব্বিশটি ফ্ল্যাট, দুটি সাততলা বাড়ি, পনেরো কাঠার একটি ডেইরি ফার্ম, সেখানে কমপক্ষে পঁয়ষট্টিটি গরু, একটি বিদেশি পিস্তল, বাড়িতে বড় অঙ্কের টাকার মজুদ। মালেক সাহেবের এসব সম্পত্তি এই ঢাকা শহরে, হিসাবে কমপক্ষে শতকোটি টাকার বেশি বলে র‌্যাবের ধারণা। বেশ কামিয়াব ব্যক্তি আবদুল মালেক। আমি আমার আগের সরকারি দায়িত্ব ছাড়ার পর যখন পরিচিত দু-একজনকে বললাম আমার জন্য একটা বাসা দেখতে। তাদের প্রশ্ন, ঢাকায় কি আমার কোনো ঘরবাড়ি নেই? যখন তাদের জানালাম নেই। তাদের মতে, আমার মতো এত বড় অপদার্থ আর নেই। মেনে নিই। থাক নিজের কথা। মালেকদের কথায় ফিরে আসি। 
বছর খানেক ধরে মালেকদের একটু খারাপ সময় যাচ্ছে। ক্যাসিনো সম্রাট, জি কে শামীম, ডা. সাবরিনা ও তার স্বামী আরিফ, ওসি প্রদীপ দাশ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আবজাল হোসেন। তালিকা চলমান। ক্যাসিনো সম্রাটের ২২৭ কোটি টাকা পাচারের খবর পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্য পাপুলের দুর্নীতির অভিযোগে বিচার চলছে একটি ভিন্ন দেশে, কুয়েতে। এটি একটি জাতীয় লজ্জা। সে উপনির্বাচনে জিতেছিল। সেখানে আওয়ামী লীগেরও একজন প্রার্থী ছিল। পাপুলকে তার জায়গায় প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল পঞ্চাশ কোটি টাকার বিনিময়ে বলে গণমাধ্যমে খবর বের হয়েছিল। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, এ রকম আর কত মালেক বা তার সমগোত্রীয়দের কাহিনি এই দেশের মানুষকে শুনতে হবে? মালেকরা তো আসলে মুরিদ। আসল পীরেরা কোথায়? পীর ছাড়া মুরিদ হওয়া যায় না। আর এই মালেকরা এক দিনে সৃষ্টি হয় না। তবে এটা ঠিক, আগে এই মালেকদের কথা তেমন একটা শোনা যেত না। এখন শোনা যায়। আটক হয়। বিচার হয়। এখানে সরকারকে ধন্যবাদ দিতে হয়। 
মানুষ কিন্তু এখনও প্রধানমন্ত্রীর ওপর আস্থাশীল। কিন্তু এও সত্য, প্রধানমন্ত্রী একা কত দূর যেতে পারবেন? সিঙ্গাপুর যখন ১৯৬৫ সালে স্বাধীন হয় তার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন লি কুয়ান ইউ। দ্বীপরাষ্ট্রটি জেলেদের একটি গ্রাম ছিল। আর ছিল জলদস্যুদের অভয়াশ্রম। প্রধানমন্ত্রী লি এই দ্বীপরাষ্ট্রটিকে একটি আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করে তোলার জন্য তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। মেধার লালন, সবকিছুকে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত রাখা আর সব শেষে অপ্রিয় হলেও সর্বক্ষেত্রে বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত নিতে সাহস রাখা। লির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে একশ' ভাগ অঙ্গীকারবদ্ধ থাকায় আজ সিঙ্গাপুর বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি। বাংলাদেশেরও এমন পরাশক্তি হওয়ার সম্ভাবনা আছে প্রধানমন্ত্রী যদি লি কুয়ান ইউর এই ফর্মুলাকে তার মতো করে বাস্তবায়ন করতে পারেন। শেখ হাসিনার পর তেমনটি কেউ করতে পারবেন তা মানুষ তেমন একটা বিশ্বাস করতে চায় না। অপেক্ষা করছি নতুন আবদুল মালেকের আত্মপ্রকাশ করার জন্য। তবে তার চেয়েও বড় অপেক্ষা মালেকদের পীরদের জন্য। পীররা যদি অক্ষত থাকে তাহলে ঘরে ঘরে এক দিন মালেকদের জন্ম হবে।
বিশ্নেষক ও গবেষক