বৈষম্য নয়, শিশুদের জন্য সমমানের শিক্ষাই হোক সমাজের প্রথম চাওয়া। উন্নততর সমাজ নির্মাণের লক্ষ্যে সমান সুযোগ-সুবিধার পরিপ্রেক্ষিত সৃষ্টির জন্য দরকার সামাজিক উদ্বুদ্ধকরণ, তা যে কোনো পর্যায় থেকে শুরু করা যায়, যা অকপটে করে দেখিয়েছে মীনা।
মীনা তৃতীয় বিশ্বের যে কোনো দেশের অগণিত মেয়েশিশুর একজন। ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের পর্দায় তার প্রথম আবির্ভাব। মীনা বিরাজমান শিক্ষা-সংস্কৃতির বৈষম্যকে তুলে ধরে ছেলেশিশু-মেয়েশিশুর সামগ্রিক অধিকার বিষয়ে সমতাভিত্তিক সংস্কৃতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের অভিযান করেছে; যাকে সৃজনশীল গণমাধ্যমের নতুন অভিযাত্রা বলতে পারি। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা ১৯৯০-২০০০ দশককে মেয়েশিশু দশক হিসেবে ঘোষণা করে। এর মূলে ছিল ২০০০ সালের মধ্যে 'সবার জন্য শিক্ষার' অনুপ্রেরণা। উদ্দেশ্য শিক্ষা এবং অধিকার সচেতনতায় পিছিয়ে থাকা নারী ও মেয়েশিশুদের শিক্ষা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা। নো চাইল্ড লেফট বিহাইন্ড- এই ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা। মীনার সঙ্গে তৈরি করা হয় রাজু, মিঠু, মীনার মা-বাবাসহ আরও একঝাঁক চরিত্র। 'দীর্ঘদিনের পথচলায় মীনার সঙ্গে সমাজের সম্পর্ক দৃঢ় এবং ঘনিষ্ঠ হয়েছে তার ইতিবাচক চলন-বলন এবং আদর্শগত চারিত্রিক গুণাবলির কারণে। ছেলেমেয়ের মধ্যে বৈষম্যের বিষয়টি সমাজের মানসপটে গেঁথে থাকা একটা পুরোনো রীতি। মীনা বিরাজমান অসংগতি দূরীকরণে কার্যকর ভূমিকা দেখিয়েছে।
বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, নেপালি ও উর্দু- এই পাঁচ ভাষায় শুরু হয় মীনার সমন্বিত কার্যক্রম। এগুলোই আবার অনূদিত হয় দক্ষিণ এশিয়ার ১৭টি ভাষায়। প্রথম পর্বটি ডাব করা হয় ৩০টি ভাষায়। প্রাথমিকভাবে এই প্রকল্পের চিত্রকল্প দানা বাঁধে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও পাকিস্তানের শিশুদের কথা মাথায় রেখে। এ পর্যন্ত মীনার ৩৭টি পর্ব প্রচারিত হয়েছে।
ইউনিসেফের মতে, বাংলাদেশের ৯৭ ভাগ শহুরে শিশু-কিশোর মীনার কার্যপ্রণালি উপভোগ করে আর গ্রামে ৮১ শতাংশ শিশু-কিশোর মীনার সঙ্গে পরিচিত। এছাড়া বয়স্কদের সঙ্গেও মীনা বেশ পরিচিত। সমাজে মীনার সামগ্রিক প্রভাব এবং জনপ্রিয়তাকে গুরুত্ব দিয়ে, ইস্যুভিত্তিক সচেতনতা সৃষ্টির বিবেচনায়, সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে, সামাজিক উদ্বুদ্ধকরণের গুরুত্ব বিবেচনা করে ১৯৯৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর তারিখকে মীনা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই থেকে বাংলাদেশে প্রতিবছর ২৪ সেপ্টেম্বর জাতীয় মীনা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমে শিশুবিষয়ক প্রতিবেদন ও উপাদান সৃষ্টিতে উৎসাহ জোগাতে ২০০৫ সালে প্রবর্তন করা হয় 'মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড'। ২০১৬ সালে চালু করা হয় স্মার্ট ফোনের জন্য 'মীনা গেম'। এসব উদ্যোগ সামাজিক উদ্বুদ্ধকরণের একেকটা নতুন পদক্ষেপ।
মীনা যে সমস্যা সামনে রেখে শিল্পীদের হাত ধরে পৃথিবীর দেশে দেশে ভ্রমণ করে বেড়াচ্ছে, তাতে কি নির্মাতারা সফল হয়েছেন? সে জবাব সময় এবং সমাজের হাতে। তবে, বাংলাদেশে মেয়েশিশুরা আগের চেয়ে অনেক বেশি স্কুলে যায়। শিক্ষা ক্ষেত্রে মেয়েরা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপনে সক্ষম হলেও সামগ্রিক বিচারে এখনও অনেক পিছিয়ে এবং বৈষম্যের শিকার। ২০০০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ১৮৯টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য ঘোষণাপত্র স্বাক্ষর করেন। উদ্দেশ্য বিশ্বে বিরাজমান মৌলিক বঞ্চনাগুলো কমিয়ে আনা। দারিদ্র্য নির্মূল করার লক্ষ্যে গৃহীত টেকসই উন্নয়ন এজেন্ডা ২০৩০ একটি সর্বজনীন লক্ষ্য। ২০১৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৭০তম অধিবেশনে ১৯৩টি সদস্য দেশ 'রূপান্তরিত আমাদের পৃথিবী :২০৩০ সালের জন্য টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)' অনুমোদন করেছে। শুধু এসডিজির ক্ষেত্রেই নয়, মানবসম্পদ উন্নয়নের চালিকাশক্তি শিক্ষা। উপযুক্ত সামাজিক উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি সমাজকে বদলে দিতে পারে। শিক্ষা এবং অধিকার সর্বক্ষেত্রে, দরকার যথাযথ উদ্যোগ। এটাই মীনা দিবসের মর্মকথা।
কথাসাহিত্যিক