আতাউস সামাদ কত বড় সাংবাদিক ছিলেন, সে মূল্যায়ন করতে গেলেও যোগ্যতা দরকার। তবে মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন আকর্ষণীয় চরিত্রের অধিকারী। তার মতো নির্লোভ, সদালাপী, প্রাণখোলা, উদার, মিশুক মানুষ আমি কমই দেখেছি। আধুনিকতা ও ধর্মপরায়ণতার এক অনন্য সমন্বয় ঘটেছিল তার মধ্যে। তিনি বাংলাদেশের অল্প কয়েকজন সাংবাদিকের মধ্যে অন্যতম, যারা ইংরেজি ও বাংলায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। আতাউস সামাদ স্যার এত প্রাঞ্জল ভাষায় লিখতেন যে, তার নজির মেলে না। তার সঙ্গে দুটি ব্যক্তিগত স্মৃতি উল্লেখ করব। তাতে কিছুটা হলেও বোঝা যাবে, তিনি কেমন মানুষ ছিলেন।
২০০৬ সালের দিকে 'আমার দেশ' পত্রিকায় ঢাকায় ভবন নির্মাণে আধুনিকতা ও নান্দনিকতার ছোঁয়া নিয়ে একটা বিশেষ প্রতিবেদন করেছিলাম। রিপোর্ট জমা দিয়ে আমি সিলেট বেড়াতে যাই। রিপোর্টটি সম্পাদনার জন্য চিফ রিপোর্টার আতাউস সামাদকে অনুরোধ করেন। তিনি প্রথমে নাকি কিছুটা বকাঝকা দিয়েছিলেন। পরে নিজেই বিভিন্ন জায়গায় ফোন করে তথ্য সংগ্রহ করে রিপোর্টটিকে দারুণভাবে সমৃদ্ধ করেন। সিলেট থেকে ঢাকায় ফেরার পথে আমি রিপোর্টটি পড়ে মুগ্ধ হই। দেখি, সেটির আকার দ্বিগুণ হয়ে গেছে। একজন সম্পাদক সাধারণত কোনো রিপোর্টে মৌখিক নির্দেশনা দেন। ফোন করে করে তথ্য সংগ্রহ করে সেটিকে সমৃদ্ধ করার সময় তার থাকে না। তবে তিনি সেই কাজটা করতেন।
২০০৭ সালের শুরুতে আমি সাংবাদিকতা ছেড়ে একটি টেলিকম কোম্পানিতে যোগ দিই। ঘটনাচক্রে তিনি ওই কোম্পানির ইন্টারনেট সেবা নিতেন। তখন খুব কম লোকই বাসায় ইন্টারনেট ব্যবহার করতেন। একদিন তার গাড়িতে উত্তরা থেকে আসার পথে আমাদের সেবা নিয়ে কথা উঠল। তিনি বললেন, বিল নিয়ে সমস্যা হয়। তিনি নিয়মিত বিল পান না। ফলে বকেয়া পড়ে যায় এবং লাইন কেটে যায়। অনেক সময় বিল দেওয়ার সময় পান না তিনি। অর্থাৎ স্যার নিজেই বিল জমা দেন। তখন বিল দেওয়া এখনকার মতো এত সহজ ছিল না। আমি বললাম, আমি বিলটা নিতে প্রতি মাসে আপনার বাসায় একটি ছেলেকে পাঠিয়ে দেব। তিনি বললেন, 'বিল নিতে আসার দু-এক দিন আগে জানাইও। বাসায় সব সময় তো টাকা থাকে না।' অথচ মাসে সম্ভবত তখন ৮০০-৯০০ টাকা বিল আসত। তার বাসায় অনেক সময় এই সামান্য টাকাও থাকে না! এমনই এক জীবন কাটিয়েছেন তিনি। অথচ বিবিসি কাঁপানো আতাউস সামাদ চাইলে টাকা তার পেছনে ছুটত। তার ব্যক্তিগত গাড়িটাও ছিল সেকেলে মডেলের।
এসবের জন্য তার কোনো কষ্ট ছিল না। তবে কষ্ট ছিল, তিনি এমন একটি দেশে জন্মেছিলেন যেখানে তার সাংবাদিকতা জীবনের বেশিরভাগ সময়ই কেটেছে অগণতান্ত্রিক পরিবেশে। ফলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ছিল না; বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করাও কঠিন ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি কোনো অপশক্তির কাছে মাথা নত করেননি।
মৃত্যুর কয়েক মাস আগে আতাউস সামাদ স্যার তার প্রিয় কর্মস্থল বিবিসির ওয়েবসাইটে তার সেই কষ্টের কথা লিখেছিলেন। স্যার লিখেছিলেন, 'চাপ আর বাধার মধ্যে কাজ করার দুর্ভাগ্য আমার বরাবরের। আমি যখন প্রথম কোনো দৈনিক সংবাদপত্রে (সংবাদ) কাজ শুরু করি (১৯৫৯), তখন জেনারেল আইয়ুব খানের সামরিক শাসন চলছিল। ১০ বছর শাসন চালিয়ে আইয়ুব খান যখন বিদায় নিল, তখন তার জায়গা দখল করল আরেক সেনাশাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান। এ লোক তো যুদ্ধ ও গণহত্যাই চালিয়ে দিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার বিশেষ সংবাদদাতার চাকরি নিয়ে গেলাম ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি। সেখানে থাকতে থাকতেই ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রীর গদি রক্ষার জন্য ১৯৭৫ সালে জারি করলেন জরুরি অবস্থা। সেই সঙ্গে প্রয়োগ করলেন কঠোর সেন্সরশিপ।' '১৯৭৬-এর আগস্টে যখন দেশে ফিরলাম, তখন এখানে চলছে আবারও সামরিক আইনের শাসন। ...১৯৯০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। অর্থাৎ যুদ্ধ, সেন্সরশিপ, সামরিক শাসন ও অগণতান্ত্রিক জরুরি আইনের শাসনের মধ্য দিয়ে কেটেছে আমার রিপোর্টার জীবনের প্রায় পুরোটা সময়।'
সাংবাদিক