আমার এক সহকর্মী লন্ডন থেকে লিঙ্ক ই-মেইল করে জানালেন, 'ইকরাম, এক অসাধারণ ব্যাপার ঘটিয়েছে এই ফেসবুক। প্রোফাইল তৈরি করে ফেল।'
এখনও মনে আছে তার কথা। শুনে আমিও ফেসবুকে যোগ দিই।
আমিও এর মধ্যে অসাধারণত্ব খুঁজে পাই। মানুষ জমতে শুরু করে আমার লিস্টে। স্কুলের হারিয়ে যাওয়া বা ভুলে যাওয়া বন্ধু, পরিচিতজন, সাংবাদিক, প্রাক্তন ক্যাডেট- আরও অনেকে। লিস্টে মানুষ বাড়তেই থাকে। অনেককেই চিনতাম না, কিন্তু তারা আমার লিস্টে থাকে। আমার স্কুল ও ক্লাবের জন্য পেজ তৈরি করে ফেললাম।
ফেসবুক বেশ ভালোই লাগছিল। ব্যবহার করার অভ্যাস হয়ে গেল। কিন্তু কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছি তাই-ই ভালো করে তখনও বুঝিনি। এমনই অভ্যাস হলো যে, কাজের সময়ও আরেকটি উইন্ডোতে সারাক্ষণ ফেসবুক খোলা থাকত এবং কিছুক্ষণ পরপরই তা দেখতাম। ফটো অ্যালবাম তৈরি করলাম। মানুষ অনেক 'লাইক' দিল এবং প্রশংসাসুলভ কমেন্ট লিখল। আমার মন অনেক খুশি। যা-ই লেখি, মানুষ 'লাইক' দেয় ও কমেন্ট করে। খুশি হই।
আমি খুব সন্তুষ্ট। আরও বেশি বেশি ফেসবুকে সময় কাটাতে শুরু করলাম এবং একদিন আবিস্কার করলাম যে, অনেক বেশি সময় চলে যাচ্ছে ফেসবুকে- কোনো কিছু না করেই। কোনো ফলপ্রদ বা উর্বর কাজে সময়টি ব্যয় হচ্ছে না। অন্যদের ফটো ও লেখায় 'লাইক' দেওয়া এবং অন্যরা আমার ছবি ও লেখায় 'লাইক' দিচ্ছে কিনা তা দেখা। ব্যাস। মনে করেছিলাম, আমি ও আমরা ফেসবুকের মাধ্যমে আগের চেয়ে অনেক বেশি সামাজিক হয়েছি। তাই কি হয়েছি?
এক লেখক বন্ধুর সঙ্গে দেখা। সে জানতে চাইল, 'আজ সকালে একটা পোস্ট দিয়েছি, দেখেছিস?'
আমি বললাম, 'হ্যাঁ দেখেছি।' সে বলল, 'ওহ, লাইক দিসনি তো; তাই ভাবলাম, তুই দেখিসনি।' বুঝলাম, আমাদের মনস্তত্ত্ব কতটা বদলেছে এই কয়েক বছর ফেসবুকে বিচরণ করে। আমরা সবাই এখন 'লাইক' চাই। 'লাইক' পাওয়া ব্যপারটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আমাদের জীবনে। এই সামাজিক মাধ্যমের রীতিনীতি, সংস্কৃতি, মানুষের প্রবণতা আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করলাম। বুঝলাম, আমাদের জীবনের শুধুই কাল্পনিক ও অবাস্তব দিকগুলোই আমরা ফেসবুকে তুলে ধরতে চাই এবং 'লাইক' ও প্রশংসার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকি। সেটি সমস্যা নয়। তবে সেটি যখন এক ধরনের প্রতিযোগিতা হয়ে যায়, তখনই সমস্যা তৈরি হয়। আমরা মনে মনে প্রতিযোগিতায় মেতে থাকি। অন্য কারও পোস্ট বা ছবিতে বেশি 'লাইক' পড়লে আমাদের মন খারাপ হয়। আমার ছবি বা পোস্টে 'লাইক' অন্যের চেয়ে বেশি হলে আমার মন ভালো হয়।
অনেক মানুষকে দেখে মনে হয়, সারাক্ষণই দেশ-বিদেশে ঘুরে চিরস্থায়ী ছুটি কাটাচ্ছে, তাদের জীবনে অবারিত সুখ; কোনো দুঃখ নেই। এসব দেখে অন্যদের মন খারাপ হতেই পারে। হীনম্মন্যতায় ভুগতেই পারে। কোটি কোটি মানুষ নিজেদের বাস্তবতার সঙ্গে অন্যের কল্পনার তুলনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সেখান থেকেই যে মন খারাপের শুরু হয়, তা হয়তো আমরা বুঝতেও পারি না।
ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে বিচরণ করা এখন এক নেশায় দাঁড়িয়ে গেছে। ঘুম থেকে উঠেই সবার আগে ফোনে ফেসবুকের অ্যাপ খোলা, ঘুমাতে যাওয়ার আগে শেষ পোস্টটি লেখা। আমরা আমাদের সবচেয়ে সুন্দর ছবিটি পোস্ট করতে চাই, যেখানে অনেক 'লাইক' পড়বে, সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত পোস্টটি আমারই হওয়া চাই- যেন সবাই আমায় বাহবা দেয়। দেখাতে চাই, আমার জীবন সব সময়ই অনন্য, যা আদতে তেমন অভূতপূর্ব নয়।
এমন অনেক পরিবার ও দম্পতিকে দেখেছি যারা রেস্তোরাঁয় খাওয়া-দাওয়া করতে গিয়ে কেউ কারও সঙ্গে কথা না বলে সবাই ফোনের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন, সামাজিক মাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তারা সেখানে গেছেন নিজেরা খেতে খেতে গল্প করবেন, আনন্দ করবেন। তা না করে সবাই ফোনের মাঝে আনন্দ খুঁজছেন।
আমার কাছে মনে হয়, আমরা নিজের অজান্তেই 'প্রোগ্রামড' হয়ে গেছি। আমাদের 'প্রোগ্রামড' করে ফেলা হয়েছে। আমরা যেন ভার্চুয়াল সামাজিক মাধ্যম ছেড়ে সত্যিকার সমাজে আর ফিরে না যাই, তেমন করেই এই মাধ্যম তৈরি করা হয়েছে, যা আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যে অসম্ভব রকমের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আমরা চিন্তা কম করছি; শুধু 'লাইক' দিচ্ছি এবং 'লাইক' পাচ্ছি।
আরও ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ফেসবুক একটি ভুল খবর ও ভুল তথ্যের ভান্ডার। আমরা যাকে 'ফেক নিউজ' বলি। ভুল খবর সঠিক খবরের চেয়ে পাঁচ গুণ তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া এসব বাতায়নে ঘৃণা প্রচার হয় এবং সে কারণে বিশ্বের অনেক স্থানে রক্তাক্ত দাঙ্গাও হয়েছে। মানুষ এই ভুল তথ্যগুলো বিশ্বাস করছে এবং এভাবেই সবার মনে একটি মেকি ও অবাস্তব ভুবন তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে একজন বা কোনো জনগোষ্ঠী চাইলেই আরেকজনকে বা আরেক জনগোষ্ঠীকে হয়রানির মুখে ফেলতে পারছে।
হয়তো লক্ষ্য করেছেন, সরকারপ্রধানরা এখন কতটা সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার শুরু করেছেন। তারা মনে করছেন, একসঙ্গে অনেক বেশি মানুষকে অনেক বেশি তথ্য জানানো যায়। আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কথাই ধরুন না! তিনি প্রায় সারাদিনই টুইট করেন। তিনি যদি টুইটারের সামনেই সারাদিন বসে থাকেন, তাহলে তিনি কাজ করেন কখন? সারাক্ষণ তো মানুষকে জানানোর প্রয়োজন দেখি না। অতিমারির সময় হয়তো আছে। যেমন- নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীকে দেখেছি সামাজিক মাধ্যমে মানুষকে আশ্বস্ত করতে।
আপনার বাস্তব জীবনকে দূরে রেখে আপনি দিনের কতটা সময় অবাস্তব সামাজিক মাধ্যমে খরচ করছেন? এক ঘণ্টা, দু'ঘণ্টা, পাঁচ ঘণ্টা? ঠিকই ধরেছেন, আমরা হিসাব করছি না। কারণ আমরা সামাজিক মাধ্যমে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছি এবং নিজেদের বাস্তবতাকে বদলে ফেলেছি। নিজের বাস্তবতা থেকে কী আশা করব, তাও অবাস্তব চিন্তা দিয়ে ঢেকে দিয়েছি। আপনি যখন আমাকে ফেসবুকে অনলাইনে দেখেন বা আমার কোনো পোস্ট পড়েন, তখন আসলেই জানেন আমার মনের ভেতর কী কাজ করছে? জানেন না। কারণ আপনার সঙ্গে আমার সামনাসামনি আর দেখা হয় না।
ইদানীং আমরা বাইরে হাঁটতে যাই না, আড্ডায় সময় কাটাই না, বই পড়ি না। প্রেমিক-প্রেমিকা বা দম্পতিরা একে অন্যের দিকে আর তাকাচ্ছে না। তারা তাদের কল্পনার জগৎ খুঁজে বেড়াচ্ছে ফোনের মধ্যে- একে অন্যের থেকে মানসিকভাবে দূরে সরে গিয়ে।
কী ঘটছে আসলে? আমরা কোথায় যাচ্ছি? আমরা কি টের পাচ্ছি- সামাজিক মাধ্যম একটি মাদকের মতো আমাদের আচ্ছন্ন করে দিয়েছে, যেখান থেকে পরিত্রাণের উপায় আমরা জানি না? মাদকাসক্ত হয়ে গেলে মাদকদ্রব্য যেমন আরও বেশি বেশি সেবন করতে হয়, আমরা তেমন আচরণই করছি। আমরা কি বুঝতে পারছি যে, এই তথাকথিত সামাজিক মাধ্যম আসলে সামাজিক নয়? আমাদের অসামাজিক বানাচ্ছে?
কেউ কেউ হয়তো পারছেন, কিন্তু তারা এই মাধ্যমে না থাকলেও এই মাধ্যমগুলোর কিছু যায়-আসে না। তারা যা পাওয়ার পেয়ে চলেছে। অসামাজিকতার মাদক খাইয়ে দিয়েছে।
গল্পকার; যোগাযোগ পেশায় নিয়োজিত