সেদিন বাংলাদেশই ফিরে এসেছিল

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০     আপডেট: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

লেখক ভট্টাচার্য

১৯৭৫ সালে বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে ন্যক্কারজনক হত্যাকাণ্ডের পর যখন কালো আঁধার চারদিক থেকে ঘিরে ধরতে শুরু করেছিল আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশকে, যখন খুনি মোশতাক-জিয়া চক্রের ষড়যন্ত্র আর দেশি-বিদেশি কুচক্রীদের ভয়াল থাবায় বাংলাদেশ তার স্বরূপ হারাতে বসেছিল, ঠিক তখনই সব শঙ্কা, ভীতি, চাপ উপেক্ষা করে সাহসিকতার সঙ্গে যিনি আলোকবর্তিকার মতো বাংলাদেশের সারথি হয়ে এসেছিলেন, তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা, উন্নত-সমৃদ্ধ ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার দেশরত্ন শেখ হাসিনা।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর প্রায় সাড়ে ছয় বছর প্রবাসে কাটিয়ে ১৭ মে ১৯৮১, রোববার বিকেল সাড়ে ৪টায় দেশের মাটিতে পা রাখেন জাতির পিতার সুযোগ্য উত্তরাধিকারী দেশরত্ন শেখ হাসিনা। তখন বাতাসের তীব্র বেগ ও ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ আবহাওয়া উপেক্ষা করে কুর্মিটোলা থেকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ হয়ে শেরেবাংলা নগর পর্যন্ত প্রায় ১৫ লাখ মানুষের ঢল নেমেছিল। আক্ষরিক অর্থেই সেদিন শুরু হয় বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন অধ্যায়। পিতৃহত্যার বদলা নিতে 'লক্ষ ভাই বেঁচে আছে', 'শেখ হাসিনার ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই'- এমনি স্লোগানে সেদিন প্রকম্পিত হয়েছিল ঢাকা নগরী।

'সব হারিয়ে আমি আপনাদের মাঝে এসেছি। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তার আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জাতির পিতার হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে আমি জীবন উৎসর্গ করতে চাই.... আমি আওয়ামী লীগের নেত্রী হওয়ার জন্য আসিনি; আপনাদের বোন হিসেবে, মেয়ে হিসেবে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে আপনাদের পাশে থাকতে চাই।'- এমনি বক্তৃতা দিয়ে সেদিন কেঁদেছিলেন পিতা-মাতা, ভাই, আত্মীয়স্বজনহারা শেখ হাসিনা। তার সঙ্গে সেদিন কেঁদেছিল লাখ লাখ মানুষ; কেঁদেছিল বাংলাদেশ আর কেঁদেছিল প্রকৃতি। তাই তো অঝোরে বৃষ্টি হয়ে সেই কান্না ঝরেছিল সেদিন।

সেদিন ৩২ নম্বরের বাড়িতে প্রবেশ করতে সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের সরকার বাধা দিলে বাড়ির সামনে বসেই তিনি কোরআন তেলাওয়াত করেছিলেন ও দোয়া করেছিলেন। জেনারেল জিয়ার পতনের পর ১৯৮২ সালে জেনারেল এরশাদের ক্ষমতায় আরোহণকে তিনি অবৈধ হিসেবে ঘোষণা দেন এবং এরশাদের রাষ্ট্রপতিত্বের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৯৯০ সালে অভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদ সরকারকে ক্ষমতা থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন।

১৯৯১-৯৬ সালে শেখ হাসিনা সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আবার সরকার গঠন করে এবং তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন সুশাসন, শিক্ষা, দুর্নীতি দূরীকরণ, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে তিনি প্রভূত উন্নতি সাধন করেন। তার সুযোগ্য নেতৃত্বে ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, সম্পাদিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি। বাংলাদেশ অর্জন করে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা। এ যেন বঙ্গবন্ধুহীন বাংলাদেশে তারই স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার এক শুভ সূচনা।

এর পর ২০০১ সালের কারচুপির নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা পেয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় ঐক্যজোট সরকার ২০০১-০৬ সালে দেশে তৈরি করে এক চরম নৈরাজ্য। তখন জামায়াত-বিএনপি সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে হত্যার নীলনকশা করা হয়। যার বড় প্রমাণ ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা। এর পর ২০০৬ সালের অক্টোবরে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শাসনের অবসান হলে সংবিধান লঙ্ঘন করে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ দখল করেন। হাওয়া ভবনের নির্দেশে চলতে থাকে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং এবং নির্বাচনী প্রহসনের প্রস্তুতি। তখনই শেখ হাসিনার আহ্বানে গর্জে ওঠে সমগ্র বাংলাদেশ।

১/১১-এর পর শুরু হয় নতুন ষড়যন্ত্র। ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই শেখ হাসিনাকে তার বাসভবন সুধা সদন থেকে অবৈধভাবে গ্রেপ্তার করা হয়। অবশেষে প্রবল গণআন্দোলনের মুখে তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় ফখরুদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার। আর সব ষড়যন্ত্রের নাগপাশ ছিন্ন করে বাংলাদেশের আপামর জনতার ম্যান্ডেট নিয়ে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করে দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। দ্বিতীয়বারের মতো তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। শুরু হয় ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা। ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথচলা। উন্নয়নের জোয়ারে উদ্ভাসিত বাংলাদেশের আপামর জনতা আবারও আস্থা রাখে দেশরত্ন শেখ হাসিনার ওপর। যে কারণে সব মিলিয়ে চারবার এবং টানা তৃতীয় মেয়াদে তিনি সরকার পরিচালনা করছেন। তিনি আপসহীন, সংগ্রামী, সততার মূর্ত প্রতীক। তিনি কোটি কোটি বাঙালির আশার বাতিঘর, অনুপ্রেরণার উৎস; যার নেতৃত্বে অমিত সম্ভাবনার বাংলাদেশ সমৃদ্ধ অগ্রযাত্রায় এগিয়ে চলছে দুর্বার।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের লাখ লাখ নেতাকর্মীর পক্ষ থেকে দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে তার ৭৪তম জন্মদিনে জানাই রক্তিম শুভেচ্ছা। শেখ হাসিনা সুস্থ থাকলে বাংলাদেশ ভালো থাকবে। তিনি নিরাপদ থাকলে বাংলাদেশ নিরাপদ থাকবে; পৌঁছে যাবে তার কাঙ্ক্ষিত ঠিকানায়। তিনি সুস্থ, সুন্দর ও নিরাপদ থাকুন- এটাই বাংলাদেশের প্রত্যাশা।

সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ