স্বপ্নের সোনার বাংলার সফল স্থপতি

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০     আপডেট: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

মোস্তাফা জব্বার

শেখ হাসিনার মত দক্ষ, দূরদর্শী, বিচক্ষণ, ন্যায়ের প্রতি অবিচল প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন বাংলার শোষিত জনগণের জননী, সচল-সজীব, সপ্রাণ কিংবদন্তির একজন মানুষকে নিয়ে দুই লাইন লিখতে আর কার কী হয় জানি না, আমার মাথায় জট লেগে যায়। এর শুরুটা কোথা থেকে করব আর শেষটা কোথায় করব তা স্থির করতে পারছি না। একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় কাজের মূল্যায়ন হয়তো অধ্যায়ভিত্তিক আলোচিত হতে পারে কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কেবল একজন সরকারপ্রধান নন, তিনি কেবল একের পর এক মাইলফলক তৈরি করা মানুষ নন, কেবল মানবতার মূর্ত প্রতীক বা একটি জাতির অগ্রযাত্রার রূপকার নন, তিনি অসাধারণ এক মানুষ- যার অনন্য দক্ষতা, অসাধারণ দূরদর্শিতা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রকাশ করা কঠিন। এমন একজন মানুষকে নিয়ে কতভাবে কত সুদীর্ঘভাবে লেখা যায়, তার হিসাব করা কঠিন। আমার জন্য আরও কঠিন এজন্য যে, আমি তার ছাত্র জীবনের সহপাঠী।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চিনি আমি অর্ধশতক ধরে। আমার নিজের সাথে- আমাদের ছাত্রলীগের কর্মীদের সাথে তার অসাধারণ সকল স্মৃতি আছে। এখন মাঝে মাঝে ভাবি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের দোতলায় প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়ানো সেই মেয়েটির হাতে একদিন বঙ্গবন্ধুর সৃষ্টি করা বাঙালির রাষ্ট্রটিকে সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে  তোলার সুমহান দায়িত্ব পড়বে, তা কি তখন একবারও ভেবেছি? ঘর-সংসার করে, লেখাপড়া চালিয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার যে অসাধারণ মানুষটি আমাদের সহপাঠিনী ছিলেন এবং আমরা যার আচার-আচরণে ভাবতেই পারতাম না যে তিনি বঙ্গবন্ধুকন্যা, সেই মানুষটি এখনও সেদিনের মতোই আত্মবিশ্বাস নিয়ে চলেন, মুখের সেই হাসিটা এখনও অমলিন এবং আত্মপ্রত্যয়ে সুদৃঢ় এই মানুষটি এই জাতিকে খাদের নিচ থেকে তুলে আনার যে সুকঠিন দায়িত্ব পালন করছেন, তার বিবরণ দু-চারটি অনুচ্ছেদ বা পাতায় তুলে ধরা যাবে না।

শুধু আমি একটু বলতে চাই যে, পঁচাত্তরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে বাংলাদেশটাকে হত্যা করে পাকিস্তান বানানোর যে জঘন্য ষড়যন্ত্র নগ্নভাবে করা হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে এই জাতির ঘুরে দাঁড়ানো বা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলা কেবল দুঃসাধ্য ছিল না বা অসম্ভব ছিল না, যদি আমাদের একজন শেখ হাসিনা না থাকত। জাতি হিসেবে আমরা ভাগ্যবান যে, পঁচাত্তরের ঘাতকরা ১৫ আগস্ট বা তার পরপরও শেখ হাসিনাকে হত্যা করার সুযোগ পায়নি। তবে শেখ হাসিনা যে তাদের পাকিস্তানিকরণ চক্রান্তের প্রধান শত্রু তা এরই মাঝে অন্তত একুশবার প্রমাণিত হয়েছে। পঁচাত্তরে তাদের উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করে বাংলাদেশকে হত্যা করা আর এখন তাদের গর্হিত লক্ষ্য শেখ হাসিনাকে হত্যা করে বাংলাদেশকে হত্যা করা। ওরা বুঝেছে যে, বঙ্গবন্ধু বাঙালি শোষিত জনগোষ্ঠীর জন্য যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে গেছেন, তাকে পিতার স্বপ্নের রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলছেন শেখ হাসিনা। তাদের এই গাত্রদাহ এমন যে, এখনও যে তাদের ষড়যন্ত্র বিশ্বজুড়ে।

আমার ভয়টা আরও একটু বাড়ছে এজন্য যে, প্রধানমন্ত্রী এখন প্রায়ই বাঙালি জাতির অগ্রগতির ইশতেহার হিসেবে জাতির পিতার দ্বিতীয় বিপ্লবের কথা বলছেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার দ্বিতীয় কারণ ছিল এটি। তিনি বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার দায়ে তাদের হত্যা তালিকায় ছিলেন এবং দ্বিতীয় বিপল্গব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তাদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদীদেরও চক্ষুশূল হয়ে ওঠেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলছেন, বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব বাস্তবায়িত করতে পারলে আজকের বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকত। এর ফলে বাংলাদেশবিরোধী পাকিস্তানপন্থিদের সাথে দেশীয় সাম্রাজ্যবাদের সহযোগীরাও আরও যুক্ত হয়েছে।

এখন থেকে পঞ্চাশ বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে তার শিক্ষক প্রফেসর রফিকুল ইসলাম এখনও বলেন- 'শেখ হাসিনার মধ্যে কোনো অহমিকা নেই, এখনও সে আমার ছাত্রী।' প্রয়াত আনিস স্যারও এ কথা বলতেন। মনে হচ্ছে, আমাদের এই দুই স্যারই তাদের ছাত্রী শেখ হাসিনার বাংলা বিভাগের জীবনটাকে একদমই ভুলতে পারেননি। একটি বহুল প্রচারিত ভিডিও সবারই নজরে পড়ার কথা, যেখানে প্রফেসর আনিসুজ্জামান স্যার লাল কার্পেটের ওপর দিয়ে হাঁটছেন আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দূর্বা ঘাস দিয়ে হাঁটছেন এবং তিনিই তার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের চাদরটা ঠিক করে দিচ্ছেন। এসব ছোট ছোট ঘটনার মধ্য দিয়ে আপনারা হয়তো লক্ষ্য করে থাকবেন যে, শেখ হাসিনা তার শিক্ষকদেরকে কী গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন। আমরা সতীর্থরা '৭০ সালেই সেটি দেখেছি। এটাও দেখেছি যে, তিনি অতি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সাধারণ ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে শিক্ষা জীবনটা অতিক্রম করেছেন।

ছাত্র জীবনের সময়টার পর '৮১ সালে তিনি যখন দেশে ফিরে আসেন, তারপর ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে তার সাথে আমার আবার দেখা হয়। আমি মহাখালীতে তাদের বাসায় একজন সাংবাদিক হিসেবে একটি সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলাম। সেদিন তিনি নিজের হাতে চা বানিয়ে কেবল সাক্ষাৎকার দেননি, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অসাধারণ স্মৃতিগুলো রোমন্থন করেন। দেখেছি অতি মধ্যবিত্ত পরিবারের বধূ হিসেবে মহাখালীর সরকারি বাসভবনে একজন পরমাণু বিজ্ঞানীর স্ত্রী ও সন্তানের মা হিসেবে কতটা সাধারণ জীবনযাপন করেছেন ও কত সরলভাবে নিজের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের কথাও বলেছিলেন। 

স্মরণে রাখুন, পঁচাত্তারে জাতির পিতাকে সপরিবারে ও জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করার পর আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনসমূহ একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ার ছয় বছর পর শেখ হাসিনা পোড়ামাটিতে চারাগাছ রোপণের কাজ দিয়ে তার বর্তমান রাজনৈতিক জীবনের শুরু করেন। '৮১ থেকে সুদীর্ঘ পনেরো বছর লড়াই করে '৯৬ সালে তিনি যখন জাতির পিতার দেশটি পরিচালনার দায়িত্ব পান, তখন সেটিকে পাকিস্তান বানানোর সকল আয়োজন সম্পন্ন করে রাখা হয়েছে। একদিকে উল্টা করা পাটিকে সোজা করা, নোংরা আবর্জনা পরিস্কার করা ও অন্যদিকে ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশটিকে উদ্ধার করার কঠিন লড়াইতে তিনি জাতির পিতার স্বপ্নপূরণে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করেন।  আমি শ্রদ্ধার সাথে তার একটি সুমহান কাজের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাই যে, তিনি পিতা, মাতা, ভাই, ভাবী ও আত্মীয়স্বজনসহ  পঁচাত্তরের ঘাতকদের বিচারসহ একাত্তরের ঘাতক যুদ্ধাপরাধীদেরও বিচার করেন। ইতিহাসে এটি এক অনন্য নজির।

আমি একটু স্মরণ করতে চাই যে, ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণাটি কোন পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ঘোষণা করেন। তার প্রথম পাঁচ বছরের শাসনকালের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্মরণ করুন। '৯৬ সালে তিনি ভি-স্যাট ব্যবহারকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করে অনলাইন ইন্টারনেট যুগকে সামনে চলার মহাসড়ক নির্মাণ করে দেন। একই সাথে তিনি একটি মোবাইল অপারেটরের বদলে আরও চারটি মোবাইল অপারেটরকে লাইসেন্স দিয়ে বাংলাদেশে মোবাইলের স্বর্ণযুগের সূচনা করেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি তিনি '৯৮-৯৯ সালের বাজেটে ঘোষণা করেন। তিনি কম্পিউটারের ওপর থেকে সকল শুল্ক্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহার করেন। সেই সময়েই তিনি কম্পিউটার শিক্ষার সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, ২০০১-এর পর বাংলাদেশের অগ্রগতির যাত্রা আবার থামিয়ে দেশের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে আবারও পাকিস্তান বানানোর প্রচেষ্টা চলতে থাকে। ওই সময়ে সাত বছরে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে পাঁচ বছরে শেখ হাসিনা যতটা ইতিবাচক রূপান্তর করেছিলেন, তাকে পেছনে নিয়ে যাওয়ার সকল আয়োজন সম্পন্ন করা হয়।

শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর সেই কন্যা ও বাংলা মায়ের সেই মহীয়সী নারী, যিনি বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শিতাকে অবলম্বন করে বাংলাদেশকে ডিজিটাল যুগের উপযোগী করে গড়ে তোলার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেন। সেই কারণে তিনটি শিল্প বিপল্গবে যোগ দিতে না পারা দেশটিতে অন্তত তৃতীয় শিল্প বিপ্লবে শরিক করার জন্য তথ্যপ্রযুক্তি বিকাশের যুগান্তকারী পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করেন। সম্ভবত এটিও উল্লেখ করা দরকার যে, তিনিই বাংলাদেশের প্রথম রাজনীতিক যিনি নিজে কম্পিউটার ব্যবহার করেন। তার সুযোগ্য পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের সহায়তায় তিনি সেই আশির দশকে নিজে কম্পিউটার ব্যবহার করে এমনকি দল পরিচালনা করেন। তিনি নিজেই বলেন, আমি তাকে বাংলা টাইপ করা শিখিয়েছিলাম। স্মরণে রাখা দরকার, তিনিই দেশের প্রথম রাজনৈতিক দলের নেত্রী যিনি দলের জন্যও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করেন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাস-এর মাধ্যমে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে তিনি নির্বাচনী প্রচার চালান।

হাজার হাজার বছর উপনিবেশ থাকা ও বিদেশিদের দ্বারা লুণ্ঠিত হওয়া একটি ভূখণ্ড অগ্রগতির সোপানে পা রাখার যে স্বপ্ন বাঙালি বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে  দেখেছিল- বিজয়ী হয়েছিল, সেই দেশটির ৫০ বছরের ইতিহাসের ২৯ বছরই একাত্তরের পরাজিত শত্রুদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় আমাদের সামনে চলা স্তিমিত হয়ে পড়ে। তবে বাংলাদেশের আজকের অবস্থান বস্তুত বঙ্গবন্ধুর শাসনকালের সাড়ে তিন বছর ও শেখ হাসিনার শাসনকালের ১৬ বছরের শাসনকালের। বিশেষ করে তিনি ২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচি ঘোষণা করার পর ২০০৯ সাল থেকে দেশটির যে রূপান্তর ঘটাতে থাকেন, তার ফলে বাংলাদেশ এখন ডিজিটাল দুনিয়ার একটি বিস্ময়ের নাম। একদিকে তিনি কৃষি-শিল্প উৎপাদন, বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন, মানবসম্পদের দেশে-বিদেশে কার্যকরভাবে ব্যবহারের পাশাপাশি ব্যক্তি, সমাজ, সরকার ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক ডিজিটাল রূপান্তর করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে তার রূপকল্প একুশ, এসডিজি গোল ২০৩০, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনা ৪১ অথবা ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ পর্যালোচনা করলে এটি স্পষ্ট হবে যে, তিনি বঙ্গবন্ধুর কেবল জেনেটিক উত্তরাধিকারী নন, বরং তিনিই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলার স্থপতি।

মুজিববর্ষে অবস্থান করে আমরা যখন আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনার হীরক জন্মবার্ষিকীর দিকে যাচ্ছি, তখন সমগ্র জাতি ও বিশ্বের সকল বাঙলা ভাষাভাষী মানুষসহ শোষিত মানুষদের পক্ষ থেকে আন্তরিক শুভেচ্ছা, কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা শেখ হাসিনার হাতেই বাস্তব হচ্ছে।

তথ্যপ্রযুক্তিবিদ,  কলামিস্ট, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাস-এর চেয়ারম্যান- সাংবাদিক, বিজয় কিবোর্ড ও সফটওয়্যার-এর জনক
mustafajabbar@gmail.com