বঙ্গবন্ধুর রক্তের ও আদর্শের যোগ্য উত্তরাধিকার

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০     আপডেট: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

যতীন সরকার

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তার পুরো পরিবারকে হত্যা করে বাংলাদেশকে অভিভাবকশূন্য করে ঘাতকরা। বাংলাদেশের অগ্রগতি রুখে দেওয়া এবং পাকিস্তানের আদলে বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার উদ্দেশ্যেই তারা নিষ্ঠুরভাবে এ হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের সেই বর্বরোচিত হত্যকাণ্ডের সময় বিদেশে অবস্থান করছিলেন আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই সময় জাতির পিতাসহ পুরো পরিবারকে হারিয়ে দীর্ঘদিন নির্বাসিত জীবনযাপন করতে হয়েছে তাকে।
১৯৮১ সালে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর জাতীয় রাজনীতির হাল ধরেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। কাঁধে তুলে নেন দলের দায়িত্ব। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ১৯৯৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করেন এবং প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ওই সময় উত্তপ্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ফিরিয়ে আনতে তিনি চুক্তি করেন। ১৯৮১ সালের পর থেকে দীর্ঘ চার দশক ধরে দেশের রাজনীতির অগ্রভাগে থেকে নিরলস নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন তিনি। এই সময়ে ঘাতকদের উত্তরসূরিরা বারবার তাকে হত্যার চেষ্টা করেছে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ছিল পরিকল্পিত; বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। সেই হামলার মূল লক্ষ্য ছিল শেখ হাসিনাকে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিস্তার ঘটানো। এর আগেও তারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িকতার আঁতুড়ঘর বানাতে চেয়েছিল। পরবর্তীকালে ঘাতকদের আনুকূল্যে যারাই ক্ষমতাসীন হয়েছে, তারাই বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গিরাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছে। তারা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ও বিস্তার ঘটিয়েছে। আমরা জানি, উন্নত, সমৃদ্ধ, আধুনিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণে সংবিধানের মূলমন্ত্র পুরোপুরি কার্যকর করার বিকল্প নেই। শেখ হাসিনা এক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে অবগত ও সচেষ্ট।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০১৪ ও ২০১৮ সালে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০০৯ সাল থেকে ১১ বছর ধারাবাহিকভাবে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় আছে। শেখ হাসিনা এমন এক সময় ক্ষমতাসীন হয়েছেন, যখন বঙ্গবন্ধুর হত্যকারীরা সংবিধানের সব মূলনীতি বিধ্বস্ত করেছিল। তারা সংবিধানকে এমনভাবে ক্ষতবিক্ষত করেছিল যে, তাতে স্বাধীনতার মূলমন্ত্র অবশিষ্ট ছিল না। জঙ্গিবাদের উত্থান, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, দরিদ্রতাসহ নানাবিধ কারণে দেশ যখন একটি ক্রান্তিকাল পার করছিল, এমন পরিস্থিতিতে তিনি ক্ষমতাসীন হন। জঙ্গিবাদ নির্মূল, দুর্নীতি দমন, দারিদ্র্য বিমোচন ও জীবনমানের উন্নতি ঘটানো জরুরি হয়ে পড়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর অনেক বেশি দায়িত্ব আবর্তিত হয়েছে। তিনি সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। আমরা বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই ত্যাগ, শ্রম ও সাহসিকতা বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় পরিণত করবে বলে।

টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থেকে বাংলাদেশকে উন্নয়নে বিশ্বের রোলমডেলে পরিণত হয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার। এখন সবাই বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে আছে। ক্ষমতায় এসে একদিকে জঙ্গিবাদ দমন করেছেন, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে সংঘবদ্ধ করেছেন শেখ হাসিনা। তিনি দেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছেন। তার সরকারের অধীনে দারিদ্র্য বিমোচন হয়েছে, মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে, মাথাপিছু আয় ও প্রবৃদ্ধির হার বেড়েছে, যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবনীয় উন্নয়ন হয়েছে। শেখ হাসিনার সরকার গত এক দশকে দেশে ১২টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছে। নতুন বছরের প্রথম দিন শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যে ৩৫-৩৬ কোটি বই তুলে দিচ্ছে। একশ'টি অর্থনৈতিক জোন গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশ ৫৭তম দেশ হিসেবে মহাকাশে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মর্যাদা লাভ করেছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। ভারতের সঙ্গে ছিটমহল নিয়ে দীর্ঘদিনের যে সংকট ছিল, শান্তিপূর্ণভাবে তার সমাধান করেছেন তিনি। মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে যে সমস্যা ছিল, তারও সমাধান হয়েছে এই সরকারের উদ্যোগে। বিশ্বব্যাংক মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পর নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্প গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার সাহসী নেতৃত্বের কারণে একই সময়ে চলছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, পায়রায় গভীর সমুদ্রবন্দরসহ বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পের নির্মাণ কাজ।

শেখ হাসিনা দেশ ও দেশের মানুষের জন্য প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন, হামলার শিকার হয়েছেন, অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেছেন, কারাবরণ করেছেন- এত সত্ত্বেও তিনি বাংলাদেশকে পৌঁছে দিয়েছেন অনন্য উচ্চতায়। তিনি ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার রূপকল্প হাতে নিয়েছেন। ২১০০ সালে বাংলাদেশের অবস্থা কী হবে, তিনি এ বিষয়েও ডেল্টা প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। তিনি দেশীয়-আন্তর্জাতিক শত বাধা-ষড়যন্ত্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যুদ্ধাপরাধী ও বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচারকাজ সম্পন্ন করে জাতির দীর্ঘদিনের কলঙ্ক মোচন করেছেন।

শেখ হাসিনা শুধু আওয়ামী লীগপ্রধান বা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নন; বঙ্গবন্ধুর রক্ত ও আদর্শের যোগ্য উত্তরাধিকারী। শেখ হাসিনা টানা তিন মেয়াদে দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি শোককে শক্তিতে পরিণত করে জাতির পিতার উত্তরাধিকার যথাযথভাবে বহন করে চলেছেন। এ জন্য তাকে আন্তরিক অভিনন্দন। প্রত্যাশা করি, তিনি আরও দীর্ঘকাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার সম্মুখে থেকে নেতৃত্ব দেবেন। আজ ২৮ সেপ্টেম্বর; বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন। জন্মদিনে তাকে জানাই শুভেচ্ছা ও অভিবাদন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কর্মজীবন আরও সাফল্যমণ্ডিত হোক এবং তার মাধ্যমে জাতির পিতার উত্তরাধিকার বাহিত হোক সর্বান্তঃকরণে, এই কামনা করি।

শিক্ষাবিদ; প্রাবন্ধিক