ভোট- দুই শব্দের ছোট্ট এই বন্ধনীতে কী যে অপার আকর্ষণ, কী যে মোহনীয় তার ডাক, তা বাঙালি বলতেই জানা। তা সে জাতীয় নির্বাচনই হোক কিংবা পাড়ার কোনো সংগঠন- নিস্তরঙ্গ জীবনে 'নির্বাচন' আর 'ভোট' এলেই যেন সব আন্দোলিত হয়ে ওঠে। সারা বছরের নীরবতা ভেঙে যায় ভোটের ডাকে। যার আওয়াজ উপেক্ষা করার সাধ্যি নেই মিডিয়ার; বরং ভোটের আবহকে আরও নাটকীয় করতে, মেধা খাটাতে হয় মিডিয়াগুলোকে। কোনো একটি বা দুটি চরিত্রকে সামনে রেখে স্ট্ক্রিপ্ট সাজাতে হয়, পার্শ্বচরিত্রগুলোও অর্থবহ করতে হয়। সে এক বিরাট কর্মযজ্ঞের ব্যাপার। সম্প্রতি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) ভোটের ঢাকে কাঠি পড়েছে (৩ অক্টোবর নির্বাচন), সেই তালে মিডিয়ায় দেশীয় ফুটবলে নাড়া লেগেছে। যে ফুটবল সারা বছর সিঙ্গেল কি ডাবল কলামে জায়গা পায়, সে ফুটবলই এখন লিড। পাঁচ মিনিটের বুলেটিনের মিনিট দেড়েক এখন ফুটবলের অতীত আর ভবিষ্যৎ নিয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা চলছে (কিছু মিডিয়া অবশ্যই এর ব্যতিক্রম)। অথচ মিডিয়ায় ক্রিকেটের সুউচ্চ অট্টালিকার পাশে সারা বছরই টিনশেডের পড়শি হয়েই থাকে দেশীয় ফুটবল।
তাহলে কি ভোটের আগমনীতেই দেশীয় ফুটবল এখন আদুরে সন্তান? অনেকটা তাই। তাছাড়া নির্বাচনও তো একটা খেলারই মতো। সেখানে হারজিত রয়েছে, স্ট্রাইকার আছে, ডিফেন্ডার আছে, প্রতিপক্ষকে ফাউল করার ব্যাপার আছে, অফসাইড আছে আবার ফেয়ার প্লেও আছে। করোনাকালে যখন মাঠের খেলা বন্ধ তখন ভোটের খেলায় বাড়তি ক্যামেরা যে থাকবে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সব মিলিয়ে এবারও বাফুফে নির্বাচন বেশ হৈ-হুল্লোড়েই হচ্ছে। এবারও ভোটের রিংয়ে সালাউদ্দিন বনাম সালাউদ্দিনবিরোধীরা। প্রায় তিন বছর ধরে মাঠ তৈরি করার পরও ভোটে দাঁড়াননি বাংলাদেশ জেলা ও বিভাগীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব তরফদার রুহুল আমিন। ফুটবল মহলে একটা ধারণা ছিল, কাজী সালাউদ্দিনের চতুর্থ দফা বাফুফে সভাপতি হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবেন তিনি। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে তিনি ঘোষণা দেন, নির্বাচন করবেন না। সরে দাঁড়ান ফুটবল থেকেও। তার অনুসারী সাবেক ফুটবলার বাদল রায় সভাপতির পদে নমিনেশন নিয়েও পরে অসুস্থতার কথা বলে নিজেকে সরিয়ে নেন। যদিও ব্যালটে তার নামটি থাকছে। এর বাইরে কাজী সালাউদ্দিনের প্রধান প্রতিপক্ষ এখন শফিকুল ইসলাম মানিক।
তৃণমূলে ফুটবল নিয়ে কাজে অনীহা (শুধু ভোট এলেই তৃণমূল সংগঠকদের কদর), এক যুগে তৈরি হয়নি একাডেমি, তিন বছর আন্তর্জাতিক ফুটবলে নির্বাসন, সাফে দিন দিন নিচে নেমে যাওয়া- সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে এসব তুলে ধরেছে বিরোধী পক্ষ। এটা ঠিক যে, খেলোয়াড়ি জীবনে যে সাফল্য তিনি এনেছিলেন, সে তুলনায় বাফুফে সভাপতি হয়ে সেভাবে কিছুই করতে পারেননি। কিন্তু দেশীয় ফুটবলের যে মান আর ক্লাবগুলোর যে অবকাঠামো দুর্বলতা, তা কি সালাউদ্দিনের পরিবর্তে অন্য কেউ এসে বদলে দিতে পারবেন?
একজন ফুটবল ফেডারেশনের সাফল্যের মার্কশিট শিরোপা বা ট্রফি দিয়ে হতে পারে না, তা ছাড়া আন্তর্জাতিক বিশ্বে কোনো দেশের ফুটবল ফেডারেশনও ফুটবলার তৈরির কাজ করে না। এই কাজটি করে মূলত ক্লাবগুলো। তাদেরই বয়সভিত্তিক দল থাকে, নিজস্ব মাঠ থাকে, জিম থাকে- একটা অঙ্কুরকে প্রস্ম্ফুুটিত করে দেশের ক্লাবগুলোই। সেখানে আমাদের এখানে ১৩টি পেশাদার ক্লাবের মধ্যে হাতেগোনা আবাহনী, শেখ রাসেল, শেখ জামাল ও বসুন্ধরা কিংসের নিজস্ব মাঠ রয়েছে। এমনকি বাফুফের তত্ত্বাবধানে থাকা বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের অবস্থাও নাজুক। ক্রিকেটে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে যেখানে চার বছর পর পর মাটি খুঁড়ে নতুন ঘাস লাগিয়ে আউটফিল্ড তৈরি করা হয়, সেখানে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে আগাছায় বেড়ে ওঠা ঘাসের শুধু আগাটুকুই ছাঁটা হয়। খেলতে গেলে কাদামাটিতে পা আটকে যায়। ক্লাবগুলোকে বয়সভিত্তিক ও নারী দল গঠন করার তাগিদ দিয়েও কাজ হয়নি। তবে সবকিছু ক্লাবের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে কাজী সালাউদ্দিনও এড়িয়ে যেতে পারেন না। ফুটবল সংস্কৃতি ও অবকাঠামো বদলে ফেলার জন্য ১২ বছর সময় পেয়েছিলেন তিনি। এর মধ্যে ফুটবলারদের জন্য একটি জিম নির্মাণ করতে পারেননি। নারী বয়সভিত্তিক দলগুলো কোনো সাফল্য পেলে তিনি তার কৃতিত্ব দাবি করেন। তাহলে জাতীয় দলের ব্যর্থতার দায় কেন তিনি নেবেন না?
ফুটবলের সাফল্য-ব্যর্থতার খতিয়ানে এখনও তুলনা করা হয় আশি-নব্বই দশকের সোনালি যুগের। তখন ঘোড়াশালে ঘোড়া ছিল, হাতিশালে হাতি- সাবেক ফুটবলারদের মুখে সেই সময়ের স্মৃতিচারণ এই প্রজন্মের মুখে রূপকথার মতোই শোনাবে। তখন সাফ ফুটবলে মালদ্বীপ, নেপালকে গুনে গুনে গোল দিয়ে হারাত বাংলাদেশ। আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচ ঘিরে দুই ভাগ হয়ে যেত দেশ। সেই দিনের স্বপ্ন দেখিয়েই কাজী সালাউদ্দিন বাফুফের মসনদে এক যুগ কাটিয়ে দিলেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্যালারির ওই দর্শকের রুচি ও চাহিদা পাল্টেছে। এখন রাত জেগে স্পেনের লা লিগা কিংবা ইংল্যান্ডের প্রিমিয়ার লিগের খেলা দেখার পর বাংলাদেশ প্রিমিয়ার খেলা টানে না এই প্রজন্মকে। তবে এই প্রজন্ম যে ফুটবলবিমুখ, সেই অপবাদ মোটেই দেওয়া যাবে না। এক টুকরো মাঠ পেলেও ক্রিকেট নয়, তারা ফুটবলই খেলে, ফুটবলের মধ্যে বাঙালির যে নিজস্ব একটা আত্মার টান আছে, তা ক্রিকেটে নেই।
কাজী সালাউদ্দিন বা অন্য যে কেউই আসুন না কেন বাফুফের মসনদে, তাকে বাঙালির মধ্যে লালিত এই ফুটবল ভালোবাসাকে কাজে লাগিয়ে খেলাটির জনপ্রিয়তা বাড়াতে হবে। ক্লাবকেন্দ্রিক সমর্থকগোষ্ঠীর সংখ্যা এখন আর আগের মতো নেই। তাই ক্লাব টুর্নামেন্ট দিয়ে নয়, দেশীয় ফুটবলের জনপ্রিয়তা বাড়াতে হবে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক টুর্নামেন্টে। ক্রিকেটে যেমন বিপিএল, তেমনি ফুটবলেও অঞ্চলভিত্তিক ফ্র্যাঞ্চাইজি দল গড়ে উচ্চমানের বিদেশি ফুটবলারদের নিয়ে এসে একটা জোরেশোরে নাড়া দিতে হবে। তাহলে আবাহনী-মোহামেডানের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে বরিশাল আর চট্টগ্রাম ফ্র্যাঞ্চাইজির ম্যাচগুলো। ফিফা বা এফসিসির গাইডলাইন মেনে পেশাদার লিগের পাশাপাশি এই ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট ফুটবলের হারানো যৌবন ফিরিয়ে দিতে পারে। যেটা ভারতে হয়েছে। সেখানে ক্রিকেটে কোণঠাসা না হয়ে ফুটবল সেখানে নিজস্ব একটা সমর্থকগোষ্ঠী তৈরি করতে পেরেছে। আর তৃণমূলে ফুটবলের জনপ্রিয়তা জাতীয় মঞ্চে ফিরে এলে হয়তো পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সাকিবের মতো জনপ্রিয় হয়ে উঠবেন জামাল ভূঁইয়ারাও।
সাংবাদিক

বিষয় : ক্রীড়াঙ্গন

মন্তব্য করুন