ভারতের লক্ষেষ্টৗ শহরের সিবিআইর এক বিশেষ আদালতে; ঘটনার দীর্ঘ ২৮ বছর পরে, ভারতের বাবরি মসজিদ ভাঙার মামলায় জীবিত আসামির মধ্যে সবাইকে খালাস দেওয়া হয়েছে। রায়টির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে ভারত-বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক, বিবেকবান কোটি কোটি মানুষ ক্ষুব্ধ হবেন নিঃসন্দেহে। আমি নিজেও ক্ষুব্ধ। আবার দুই দেশের উগ্র সাম্প্রদায়িক মহলগুলোও ক্ষুব্ধ হবে- সন্দেহ নেই। এ দুই দেশের উগ্র সাম্প্রদায়িক মহলগুলো সামান্য মদদ পেলেই দাঙ্গা বাধিয়ে ফেলতে পারে।

বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনাকে আমরা যারা দেশ-বিদেশে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর কল্যাণে সেদিনই এবং সংবাদপত্রে পরদিন বিস্তারিত দেখেছি, পড়েছি এবং তার প্রতিক্রিয়ায় হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, মন্দির-মসজিদ ভাঙার ঘটনা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে ঘটতে দেখছি।

না, নিজের চোখকে অবিশ্বাস করতে পারি না। বিজেপি, বজরং, শিবসেনা দলের নেতারা ভারতের সব প্রান্ত থেকে এসে অযোধ্যা নগরীতে বেআইনি জনতায় মিলিত হয়ে অজস্র ঢিল ছুড়েছিল। হাতুড়ি, বাটাল, খোন্তা-কোদালের কী উন্মত্ত ব্যবহার! কয়েকটি ঘণ্টা লেগে গেল মসজিদটি ভাঙতে। পৈশাচিক উল্লাসে মেতে উঠতেও দেখা গেল ওই হিন্দুত্ববাদী উগ্রপন্থি দলগুলোর হাজার হাজার নেতাকর্মীকে। অযোধ্যাকে হিন্দুরা একটি পবিত্র নগরী বলে বিবেচনা করে থাকেন। সেই পবিত্র নগরীতে উগ্রপন্থি হিন্দুরা বহু বছরের ওই মসজিদটিকে ভাঙল; ভেঙে চুরমার করল। ঘোষণা দিল- সেখানে রাম মন্দির নির্মাণ করা হবে। কারণ, তাদের দাবি- ওই স্থানেই দেবতা রামচন্দ্র জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এ কথা সেখানকার মুসলিম সমাজ অস্বীকার করে সুস্পষ্টভাবে দাবি করেছিলেন- ঠিক ওই স্থানে রামের জন্ম হয়নি; অযোধ্যার অন্য কোথাও হয়ে থাকতে পারে।

বিষয়টি বিতর্কিত হয়ে গেল। বহু বছর ধরে এ বিতর্ক চলতেই থাকল। তার এক পর্যায়ে আদালতের আশ্রয় নিল বিজেপি। তাদের রাম জন্মভূমিতে শ্রী রামচন্দ্রের মন্দির নির্মাণের অনুমতি পাবে। দীর্ঘ শুনানির পর আদালত এ বিতর্কে বিব্রত বোধ করে বিরোধীয় দুই পক্ষকে শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে ফয়সালা করতে বললেন। ও পথেও সম্ভব হলো না। যতদূর মনে পড়ে, এই আদেশের বিরুদ্ধে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা হলো। অতঃপর সুদীর্ঘ প্রক্রিয়া। সুদূর ইতিহাস ঘাঁটা, ঘটনাস্থলে দীর্ঘদিন ধরে খনন করে দেখা যে, অতীতে ওই স্থানে রাম মন্দিরের কোনো অস্তিত্ব ছিল কিনা; কোনো ভূমিকম্প বা বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে সেই মন্দির কোনো ভূমিধসের শিকার হয়ে মাটির নিচে চলে গিয়েছিল কিনা; গিয়ে থাকলে তার কোনো ধ্বংসাবশেষের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় কিনা ইত্যাদি সন্ধান করতে। একদিকে এভাবে খনন, অপরদিকে বিরোধের তীব্রতা। শেষ পর্যন্ত পুনরায় ভারতের সর্বোচ্চ বিচারালয় সে দেশের সুপ্রিম কোর্টেরই শরণান্ন হলেন দুই বিরোধীয় পক্ষ। শুনানি চলল বছরের পর বছর ধরে।

এ বছরের জানুয়ারি মাসের কথা। বহু বছর পর সপরিবারে কলকাতা গেলাম মাসখানেকের জন্য। সেখানে থাকাকালে হঠাৎ ওই মামলার রায় বেরোল সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট অব ইন্ডিয়ার। ভারতের প্রধান বিচারপতি তখন যিনি ছিলেন তিনি দীর্ঘকালের চাকরি থেকে অবসরে যাবেন। তাই যাওয়ার আগে তার দেওয়া আদালতের শেষ রায়টি দিলেন অযোধ্যার বাবরি মসজিদ সংক্রান্ত বিজেপির দায়েরকৃত মামলাটির বছরের পর বছর ধরে শুনানির পর।

'অভিনব' বলে ব্যাপকভাবে অভিহিত ওই রায়ে রাম মন্দির ও বাবরি মসজিদের অস্তিত্ব কদাপি আলোচ্য স্থানটিতে ছিল কিনা, সে সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট মন্তব্য না করে সেখানে রাম মন্দির নির্মাণের জন্য বিজেপি নেতৃত্বাধীন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে রাম মন্দির নির্মাণকল্পে একটি কমিশন গঠন করার নির্দেশ দেন। সেই কমিশন তিন মাসের মধ্যে গঠনের পর তারা রাম মন্দির নির্মাণের ব্যবস্থা করবে। আর সরকারকে বলা হলো নিকটবর্তী কোনো ভালো এলাকায় পাঁচ একর জমি মুসলিম বোর্ডকে দিতে।

এই রায় যথার্থ নয় বলে মুসলিম বোর্ড অভিমত জানিয়ে তারা তার বিরুদ্ধে কোনো রিভিউ আবেদন করবে না বলে জানিয়েছিল। সম্ভবত এমন অভিমত প্রকাশ না করে যদি এর বিরোধিতা করে ক্ষোভ প্রকাশ করে রিভিউ আবেদন নিয়ে আদালতে যাওয়ার ঘোষণা দিলে মুসলিম সম্প্রদায়ের উগ্র সাম্প্রদায়িক অংশ মাঠে নেমে পড়ে দাঙ্গা বাধিয়ে ফেলত। তার প্রতিক্রিয়ায় উগ্র হিন্দু সম্প্রদায় হিংস্র্র প্রতিশোধে নেমে পড়লে আবারও উপমহাদেশে হয়তো রক্তের হোলিখেলা প্রত্যক্ষ করতে হতো। সৌভাগ্যবশত তেমন কিছু ঘটেনি। কোনো না কোনোভাবে অযোধ্যা নগরীতে যে বাবরি মসজিদের অস্তিত্ব ছিল, তা কিন্তু স্বীকৃত হলো ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মধ্য দিয়ে। যদিও বিরোধীয় স্থানটিতে আদালত রাম মন্দির নির্মাণের আদেশ দিলেন। বললেন বাবরি মসজিদের জন্য জমি বরাদ্দ দিতে।

এটা ছিল এ বছরের জানুয়ারি মাসের ঘটনা। আর সেপ্টেম্বরে এসে লক্ষেষ্টৗর অন্য এক বিশেষ আদালত রায় দিলেন- জীবিত ৩৬ জন আসামি খালাস। কারণ এরা কেউ বাবরি মসজিদ ভাঙেননি। বরং যারা ভাঙছিল এরা তাদেরকে প্রতিরোধ করতে চেষ্টা করেছেন। তাহলে যা দাঁড়ায়, ওই আসামিরা সাক্ষ্যপ্রমাণ দিয়ে আদালতের কাছে প্রমাণ করতে পেরেছেন- তারা কেউই বাবরি মসজিদ ভাঙেননি। বরং তারা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছিলেন যারা ভাঙছিল তাদেরকে ঠেকাতে।

অতঃপর, আমার ক্ষুদ্র বিবেচনায় এবং দীর্ঘ ৩০ বছর আদালতে আইন পেশায় নিয়োজিত থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা থেকে জোর দিয়ে বলতে পারি- আদালতের ওই সিদ্ধান্ত বা রায়টি অসম্পূূর্ণ। আদালতের নিশ্চিতভাবে করণীয় ছিল আরও কিছু আদেশ দেওয়ার। সে আদেশগুলোয়- এক. তদন্ত কাজে পুলিশের চরম অবহেলার ফলেই যেহেতু নিরপরাধ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে তাদেরকে আসামি বানিয়ে হয়রানি করেছে, সেহেতু সংশ্নিষ্ট পুলিশ অফিসারদের আইনানুগ শাস্তি দেওয়ার জন্য সরকারকে নির্দেশ দেওয়া; দুই. আসামিরা যেহেতু বাবরি মসজিদ ভাঙা প্রতিরোধের চেষ্টা করছিলেন, সেহেতু তারা নিশ্চয়ই যারা বাবরি মসজিদটি ভেঙেছে তাদেরকে চেনেন। তাই ওই আসামিরা মুক্ত হওয়ার পর তাদেরকে প্রত্যক্ষ সাক্ষী বানিয়ে তাদের কাছ থেকে যারা ভেঙেছে তাদের নাম সংগ্রহ করে নতুন মোকদ্দমা দায়ের করার জন্য। এটা অন্য কিছু নয়; ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য নূ্যনতম করণীয়।

বাবরি মসজিদ ওই ঘটনার আগে মোটামুটি অপরিচিতই ছিল। কিন্তু মসজিদটি ভাঙার জন্য যে ভয়াবহ হামলা চালানো হয়, তার পরিণতিতে ভারত ও বাংলাদেশে হাজার হাজার নিরপরাধ হিন্দু-মুসলিম নাগরিককে অহেতুক প্রাণ দিতে হয়েছে। লাখ লাখ ঘরে যার জন্য আজও কান পাতলে কান্নার রোল শোনা যায়। এই মারাত্মক অপরাধে অপরীদের কোনোক্রমেই আইনের আওতার বাইরে রেখে দেওয়া নিতান্ত অনুচিত। আদালত কি এমন বিষয়ে নির্লিপ্ত থেকে রায় দিয়েছেন? রায়টি পূর্ণাঙ্গভাবে জানতে না পারলেও তেমনটাই কিন্তু মনে হয়।

সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, ঐক্য ন্যাপ
raneshmaitra@gmail.com

বিষয় : প্রতিবেশী রণেশ মৈত্র

মন্তব্য করুন