সমকালীন প্রসঙ্গ

অপরাধ দেখি, অপরাধীর গ্রেপ্তারও যেন দেখি

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

এস. এম. আব্রাহাম লিংকন

সম্প্রতি ভারতের উত্তর প্রদেশ থেকে বাংলাদেশের নোয়াখালী- উপমহাদেশের একটি বড় অংশ জুড়ে ধর্ষণের ঘটনায় ফুঁসে উঠেছে। বাংলাদেশে বিগত মাসখানেক থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর সুবাদে আমরা অনেক ঘটনা সম্পর্কেই অবগত হতে পেরেছি। মন্দিরের পুরোহিত, মসজিদের ইমাম, গির্জার ফাদার, স্কুল- কলেজের ছাত্র, বেকার বখাটে যুবকসহ নানা শ্রেণির কিছু দুর্বৃত্তের নাম ও ছবি নারীর সল্ফ্ভ্রম লুটের খাতায় দেখতে পাচ্ছি। এমনকি রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরেও নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির ঘটনাও নজরে এসেছে। সেখানে ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরের আন্দোলনের সহযোগী একজন 'ছাত্র অধিকার পরিষদ'-এর নারী কর্মী শুধু অভিযোগ করেই ক্ষান্ত হননি, আইন-আদালতও করেছেন। আনীত ধর্ষণ মামলায় তিনি নুরের বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চেয়েছেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে রাজু ভাস্কর্যের সামনে অনশনে বসেছেন।
কিছুদিন আগে প্লাবন নামে একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে পারুল নামের একজন সাংবাদিক একাই প্রেসক্লাবের সামনে বিচার চেয়ে প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। দিন কয়েক আগে জলি তালুকদার নামে একজন নারী সংগ্রামী নিজ রাজনৈতিক দলের একজন সহকর্মীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্য রাজপথে যৌন হয়রানির অভিযোগে এনেছেন। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে প্রতিকার চেয়েছেন। সাড়া না পেয়ে দলের কার্যালয়ে প্রতিবাদী একক অবস্থান নিয়েছেন।
এসব অঘটন নিশ্চয়ই আমাদের বিব্রত করে; কিন্তু এসবের পেছনে 'ক্ষমতা' একমাত্র কারণ নয়। পারিবারিক শৈথিল্য, সামাজিক, রাজনৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং নানা ধরনের বিকৃতি কাজ করে। সমস্যা হচ্ছে- ঘটনাগুলো ব্যক্তিগত পর্যায়ে সংঘটিত হলেও তা রাষ্ট্রের কাঁধে বর্তানোর জোর প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়। আইনগতভাবে ফৌজদারি অপরাধগুলোকে মূলতই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভাবা হয়, এ কারণে রাষ্ট্র সেখানে মাথা দেয়। দেলোয়ার বাহিনীর নারী নির্যাতনের দৃশ্য ও তার প্রচার আমাদের তরুণ সমাজের করুণ অবস্থানকে পরিস্কার করেছে।
মন্দের ভালো, সাম্প্রতিক চাঞ্চল্যকর অপরাধে যারা যুক্ত, তাদের প্রায় সবাইকেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। এখন দাবি উঠেছে প্রকাশ্য ফাঁসি ও পাথর ছুড়ে হত্যা, ক্রসফায়ার, যৌনাঙ্গ কর্তন প্রভৃতির। সবচেয়ে অবাক করা বিষয়- যারা হরহামেশা ক্রসফায়ারে সাংবিধানিক অবৈধতা দেখেন, মৃত্যুদণ্ডের বিধান তুলে দিতে আওয়াজ দেন,  তাদেরও ক্রসফায়ারের পক্ষে মত দিতে দেখা যাচ্ছে। ন্যাপের একাংশের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদককেও দেখলাম ফেসবুক পেজে ক্রসফায়ারের দাবি  করেছেন। 
প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা যা বলছি তা আবেগে না গবেষণা করে বলছি? পরিস্কার হওয়া দরকার। আমাদের দেশে একদল মানুষ প্রচলিত আইনের বিরুদ্ধে। তারা সামন্তযুগের আইনের পুনঃপ্রবর্তন চান। একদল এই সুযোগে পোশাক বদলের আওয়াজ দিচ্ছেন। তারা দেখেও দেখছেন না, শতভাগ বোরকার দেশেও আমাদের দেশ থেকে যাওয়া মা-বোনেরা নিরাপদ নন। তাই পেট্রোডলারের হাতছানি থাকলেও কেউই সেখানে যেতে চান না। এগুলো প্রমাণিত সত্য; শুধু পোশাক বদলালেই হবে না, বদলাতে হবে মানুষের মগজ। 
ধর্ষণের সাজা একমাত্র মৃত্যু- বিষয়টি জনদাবিতে রূপান্তরের প্রচেষ্টাও লক্ষণীয়। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও বিবেচনার দাবি রাখে। কারণ আবেগ দিয়ে আইন বেশিদিন টেকে না, সেটি দ্রুতই বদলের আবার দাবি ওঠে। আইনের অপপ্রয়োগের সুযোগ তৈরি হয়। আমাদের প্রচলিত আইনে ধর্ষণের সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, গণধর্ষণের সাজা মৃত্যুদণ্ড। বরং বলা যায়, প্রতিবেশী দেশের তুলনায় সাজার মাত্রা বেশি। তাই মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেই অপরাধ আর হবে না, এর ভিত্তি নেই।
আসলে সাজা বাড়ানোই শেষ কথা নয়, প্রয়োজন সামাজিক জাগরণ। প্রয়োজন মূল্যবোধ সৃজন। মূল্যবোধ আইনের চেয়েও পরাক্রমশালী। এক যুগে আমাদের একাধিক দাদি, নানি ছিল। এটি রাখার আইনি সুযোগ রয়েছে। তা সত্ত্বেও সমাজে আজ একাধিক স্ত্রী রাখার নজির খুব একটা নেই। এর পেছনের কারণ বহুবিবাহের বিরুদ্ধে সামাজিক জাগরণ। 
আমরা নিশ্চয়ই অবগত আছি- সনাতন ধর্মে বিবৃত আট প্রকার বিয়ের কথা। যার মধ্যে এমন কতকগুলো পদ্ধতির বিয়ে আছে সেটি কার্যকর করলে বরের যাবজ্জীবন কারাবাস হবে। সমাজ এসব বিধান গ্রহণ করেনি, বরং কালের বিবর্তনে পরিত্যক্ত হয়েছে।
আমাদের দেশে ১৮ বছরের নিচের শিশুদের ১০ বছরের বেশি সাজার বিধান নেই। এমনকি শিশুকে জেলে রাখার বিধানও নেই। অথচ আমাদের বিকৃতিগুলোর প্রকাশ কিন্তু এসব তরুণের মাধ্যমে। যৌন অপরাধের অধিকাংশই এই উঠতি বয়সীদের অপকর্ম। বরিশালের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম একটি ধর্ষণ মামলায় চার শিশুকে সংশোধন কেন্দ্রে প্রেরণের আদেশ দিয়েছিলেন। খবরটি সংবাদমাধ্যম সূত্রে অবগত হয়ে বৃহস্পতিবার রাতে বিচারপতি মজিবুর রহমান মিয়া এবং বিচারপতি মহিউদ্দিন শামীমের যৌথ ভার্চুয়াল বেঞ্চ  বসে। আত্মসমর্পণ করা চার শিশুকে অভিভাবকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আদেশ প্রদান করা হয়। শুক্রবার সমকাল অনলাইনে দেখেছি, সেই আদেশ প্রতিপালিতও হয়েছে।
স্বীকার করতেই হবে- শত সীমাবদ্ধতার পরও আমাদের দেশে অপরাধীরা আইনের আওতায় আসছে। সিলেট ও নোয়াখালীর অঘটনে জড়িত সবাই আটক হয়েছে। শাসক দলের পরিচয়ে লকলকিয়ে বেড়ে ওঠা অনেক শাহেদ-পাপিয়ারা আটক হচ্ছে। বিচারে সাজাও হচ্ছে। ছাত্রলীগ যুবলীগের পরিচয় দিয়ে পরিত্রাণ পেয়েছে এমনটি বলা দুস্কর। অপরাধীর কোনো দল নেই। তারা দলকে ব্যবহারের চেষ্টা করে। পুলিশ হলেও মাফ নেই, ওসি প্রদীপের মতন নিভে যেতে হয়।  
আমরা নেতিবাচকতার বন্যায় যেন ভেসে না যাই। আমরা ডান-বাম-মধ্যপন্থিরা সবাই মাঠে নেমেছি। সবাই সোচ্চার ধর্ষকদের বিরুদ্ধে এটি ইতিবাচক। কিন্তু একই সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে, একটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে মাঠে নেমে ভিন্ন ইস্যুর বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা- ধর্ষণের বিনিময়ে হলেও সরকারপ্রধানের পদত্যাগের দাবি। বিষয়টি ভাবিয়ে তোলে বৈকি!
এরা কারা? এরা হালের নানা প্ল্যাটফর্মে শামিল হয়েছে মাস্কের নামে মুখোশ পরে এদের মূল উদ্দেশ্য কি ধর্ষকদের সাজা, না অন্য কিছু? সেটিও খতিয়ে দেখার বিষয়। বিষয়টিকে পরিকল্পিতভাবে চাউর করার চেষ্টা হচ্ছে একটি ছাত্র সংগঠনকে টার্গেট করে একাত্তরে পাকিস্তানি গণধর্ষণকে তুলনা করা হয়। এর মধ্য দিয়ে একাত্তরে পাকিস্তানিদের ঘটনাকে হাল্ক্কা করার চেষ্টা হচ্ছে কিনা? কোটা-বিরোধী আন্দোলনে নিন্দিত রাজাকার শব্দটিকে গ্রহণযোগ্য মাত্রা দেওয়ার প্রচেষ্টার কথা আমরা জানি। একই গোষ্ঠী আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্ল্যাটফর্মগুলোকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা হাসিল করার প্রচেষ্টায় আছে সংশ্নিষ্টদের বিষয়টি ভাববার অনুরোধ করি। আমরা ধর্ষণের সাজা শুধু মৃত্যুদণ্ড চাইলে হয়তো তা বাস্তবায়নও হবে। কিন্তু আমাদের স্বপ্ন যেন লুট হয়ে না যায়। 
আইনজীবী; সাবেক রাকসু নেতা