সমকালীন প্রসঙ্গ

রোহিঙ্গা শিবিরে সংঘাতের নেপথ্যে

প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২০     আপডেট: ১২ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সিরাজুল ইসলাম আবেদ

আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরগুলো। এর অংশ হিসেবেই উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে গত কয়েক দিনে আটজন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে। আহত শতাধিক। ভাঙচুর করা হয়েছে দেড় শতাধিক ঘর ও দোকানপাট। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিছু রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীকে আগ্নেয়াস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করলেও এখনও সেখানে উত্তেজনা বিরাজমান।

প্রশ্ন আসতে পারে, তিন বছর আগে প্রাণভয়ে ভীত যে রোহিঙ্গারা এক প্রকার খালি হাত-পা নিয়ে উখিয়া-টেকনাফের আশ্রয় শিবিরগুলোতে মাথা গুঁজেছিল বাংলাদেশ সরকারের বদান্যতায়, সেই রোহিঙ্গাদের মধ্যে কীসের আধিপত্য নিয়ে সংঘর্ষ? কোথা থেকে এলো এ সম্পদ? আস্ত্রের জোগানই বা তারা পাচ্ছে কোথায়? 

সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে শিবিরে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা, স্থানীয় অধিবাসী, জনপ্রতিনিধি, পুলিশ প্রশাসন এবং সরেজমিন উখিয়া ও টেকনাফের আশ্রয় শিবিরে পাওয়া তথ্য-উপাত্তে যা পাওয়া গেল, তা তিন বছর আগের দেখা রোহিঙ্গা শিবির থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। শিবিরে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের একটা বড় অংশ এখন যুক্ত হয়েছে মাদক কারবারে। অনেকে আবার আশ্রয় শিবির ছেড়ে অবস্থান নিয়েছে স্থানীয় জনগোষ্ঠীতে। এদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মাদক কারবারিরা। দেশি চোরাকারবারি ও রোহিঙ্গাদের নিয়ে তৈরি হয়েছে শক্তিশালী মাদক চক্র। এসেছে অস্ত্র, তৈরি হয়েছে সন্ত্রাসী গ্রুপ। এই গ্রুপগুলোই সক্রিয় হয়েছে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে।

বায়োমেট্রিক নিবন্ধনে ১৯৯১ সালে আসা ৩৪ হাজার রোহিঙ্গাসহ বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী মোট রোহিঙ্গা ছিল ১১ লাখ ১৮ হাজার ৫৭৬ জন। কক্সবাজারে  রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সমন্বয় গ্রুপ আইএসসিজি। সংস্থার সর্বশেষ হিসাবমতে, ৩৪টি ক্যাম্পে বর্তমান রোহিঙ্গা সংখ্যা ৯ লাখ ৫ হাজার ৮২২। আগের নিবন্ধন এবং পরের নিবন্ধনে ব্যবধান ২ লাখের বেশি। এই রোহিঙ্গারা কোথায় গেছে- এই হিসাব কারও কাছে নেই। উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা নেতাদের দেওয়া তথ্যমতে, আশ্রয়কেন্দ্রে নিবন্ধন করেনি এমন রোহিঙ্গার সংখ্যাও লাখের ওপরে। মিয়ানমার থেকে অবস্থাপন্ন যেসব রোহিঙ্গা পরিবার পালিয়ে এসেছে, তারা আশ্রয় শিবিরে না উঠে পূর্বপরিচিতির সূত্র ধরে বিভিন্ন এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে অবস্থান করছে। 

সাগরে মাছ ধরার নৌকায় মাঝিমাল্লার বেশিরভাগই রোহিঙ্গা। কম বেতনের কারণে রোহিঙ্গাদের শ্রমে লাগাচ্ছে বোট মালিকরা। এই শ্রমিকরাই সময়-সুযোগ বুঝে হয়ে ওঠে মাদকের বাহক।

কক্সবাজারের সদ্যবিদায়ী পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন আমাকে বলেছিলেন, ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক কারবারে বছরে ৯ হাজার কোটি টাকা মিয়ানমারে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকার ব্যবসাই কক্সবাজার জেলাকেন্দ্রিক। জনপ্রতিনিধিসহ স্থানীয় মাদকচক্রের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে রোহিঙ্গারাও। সাম্প্রতিক সময়ে কক্সবাজারে মাদকের জন্য যারা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে আটক হচ্ছে, তাদের ৯০ শতাংশই রোহিঙ্গা। জানা যায়, মাদক ব্যবসায় তাদের টাকা লাগে না। মাদক কারবারি সিন্ডিকেট বিনা টাকায় তাদের হাতে মাদক তুলে দিচ্ছে। নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দিতে পারলেই পেয়ে যাচ্ছে বিপুল অর্থ।

রাতে নাকি রোহিঙ্গা শিবিরের চেহারা পাল্টে যায়। একেকটি আশ্রয় শিবির একেকটি সন্ত্রাসী বা মাদক দলের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। সেখানে তখন বাইরের কেউ ঢুকতে পারে না। তারা মাদক ব্যবসা ও আশ্রয় শিবির নিয়ন্ত্রণে আগ্নেয়াস্ত্রও রাখে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, শুধু কুতুপালং ক্যাম্পেই অন্তত ৬টি গ্রুপ রয়েছে। প্রতিটি গ্রুপে ১০০ থেকে ২০০ জন বেতনভুক্ত সশস্ত্র সদস্য রয়েছে; আছে অনুসারীও। আশ্রয় শিবির থেকে পাহাড়ি পথ ধরে এরা অবাধে বিভিন্ন স্থানে চলাচল করে। বনের পাহাড়ি পথ ধরে নিয়মিত এদের মিয়ানমার-বাংলাদেশ যাতায়াত। সঙ্গে করে নিয়ে আসে প্রধানত মাদক। নৌপথেও একইভাবে অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে মাদক চলে আসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়িয়ে অথবা 'ম্যানেজ' করে। এদের কাছ থেকে আবার বিভিন্ন রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপের নামে চাঁদাও ওঠে নিয়মিত। কেউ আরসা, কেউ বা আল-ইয়াখিন ইত্যাদি। সেখানেই বিরোধ। সেই আধিপত্য ধরে রাখার প্রশ্ন।

হাজার কোটি টাকার এই চোরাই বাণিজ্য ধরে রাখতেই রোহিঙ্গা মাদকচক্র ও সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো প্রত্যাবাসন বা ভাসানচরে পুনর্বাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। মানবেতর হলেও তারা দুর্গম পাহাড়ে গাদাগাদি করে ঝুপড়িতে থাকার পক্ষে।  উখিয়া-টেকনাফ থেকে যত সহজে মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে তারা বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারছে, ভাসানচরে গেলে সেটা সম্ভব হবে না। অন্যদিকে প্রত্যাবাসন হলে তো পুরো ব্যবসাই চলে যাবে ভিন্ন কোনো হাতে। তাই  চক্রটি সাধারণ রোহিঙ্গাদের মধ্যে নানা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। সাধারণ রোহিঙ্গারা যেন প্রত্যাবাসন বা ভাসানচরে যাওয়ার পক্ষে মুখ না খোলে, তার জন্য ভয়-ভীতি দেখাচ্ছে- এমন প্রমাণও বিরল নয়। 

মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসীরা যখন তাদের বাণিজ্য ধরে রাখতে ভাসানচর যেতে বাধা সৃষ্টি করছে, তখন একই ধারায় নানা রকম প্রচারণা চালাচ্ছে কয়েকটি বিদেশি এনজিও। তারা 'কাজের ক্ষেত্র' ঠিক রাখতে রোহিঙ্গাদের এই আশ্রয় শিবিরেই রাখতে চায়। বিদেশি এনজিওগুলোর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতার অর্থেই কি তাহলে রোহিঙ্গাদের হাতে অস্ত্র উঠছে?

আশ্রয় শিবিরে প্রকাশ্যে তৈরি ও বিক্রি হচ্ছে রামদা, কিরিচসহ দেশীয় ধারালো অস্ত্র। আশ্রয় শিবির ও নিকটের দুর্গম পাহাড়েই গড়ে উঠছে আগ্নেয়াস্ত্র তৈরির কারখানা- এ কথাও বাতাসে কান পাতলে শোনা যায়। এসব অস্ত্র দিয়ে রোহিঙ্গারা এখন নিজেদের মধ্যে মারামারি করলেও যে কোনো সময় এই অস্ত্র আশ্রয় শিবিরের বাইরেও প্রয়োগ হতে পারে। 
উখিয়া-টেকনাফে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের পর স্থানীয়রা সেখানে 'সংখ্যলঘু'। তারা এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে এবং সেটাই স্বাভাবিক। রোহিঙ্গাদের হাতের এই অস্ত্র একদিকে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে যেমন অনিশ্চয়তায় ফেলবে, তেমনি দেশের আইনশৃঙ্খলারও অবনতি ঘটাবে। লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে দুর্গম এই পাহাড়ে রেখে নিরস্ত্র করা বা মাদকচক্র থেকে বের করে আনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষেও কঠিন। তাই অবস্থার আরও অবনতি হওয়ার আগেই দ্রুত প্রত্যাবাসন করা না গেলে ভাসনচরে গড়ে তোলা আশ্রয়কেন্দ্রে রোহিঙ্গা পুনর্বাসন হবে আপাত উপযুক্ত সিদ্ধান্ত।

সাংবাদিক