সমকালীন প্রসঙ্গ

রিফাত হত্যা, মিন্নির সাজা ও আইনি তর্ক

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২০     আপডেট: ১৩ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন

বরগুনার দায়রা আদালত গত ৩০ সেপ্টেম্বর বহুল আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলার রায় প্রদান করেন। আদালত হত্যাকাণ্ডের গুরুত্ব বুঝে ১৫ মাসের মাথায় রায় দিয়েছেন এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে ভবিষ্যতের দুর্বৃত্তদের নিবৃত্ত করতে চেয়েছেন, যেটিকে 'ডেটারেন্ট ইমপ্যাক্ট অব পানিশমেন্ট' বলে; সে জন্য সংশ্নিষ্ট দায়রা আদালত ও বিচারককে ধন্যবাদ ও সাধুবাদ জানাই। কিন্তু রায়ের কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে শক্তিশালী আইনি তর্ক ও দ্বিমতের অবকাশ আছে। দ্বিমতের আলোচনার আগে বলে নিই, আইনের অধ্যাপক ও গবেষকরা সারাবিশ্বেই আদালতের রায় পর্যালোচনা করেন। অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই আদালতের রায় পাঠ করে তার ব্যবচ্ছেদ করা হয়। পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে রায়ের ভালো দিকগুলো যেমন উঠে আসে, তেমনি উন্মোচিত হয় রায়ের দুর্বল দিক, আইনের আইনি ও ব্যবহারিক দিকের নানা আলোচনা এবং ওই রায়ের ভবিষ্যৎ অভিঘাত।

বরগুনার জেলা ও দায়রা বিচারক মো. আছাদুজ্জামান প্রদত্ত রায়টি শোনার পর খুশি হয়েছি এই ভেবে যে, রিফাতকে যারা প্রকাশ্য দিবালোকে রামদা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে, দণ্ডআইন অনুযায়ী তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত। বিচারক ওই হন্তারকদের মৃত্যুদণ্ড প্রদান করায় ন্যায়বিচার যেমন নিশ্চিত হয়েছে, তেমনি রিফাতের বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যদের সংক্ষুব্ধ মন শান্ত হয়েছে। কিন্তু রায়ের যে অংশে আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, সেই অংশটি দুর্বল।

রায়ে বিচারক বলেছেন, 'আসামি রিফাত ফরাজী, রাব্বি আকন, সিফাত, টিকটক হৃদয়, মোহাম্মদ হাসান ও মিন্নি পূর্বপরিকল্পিতভাবে ভিকটিম রিফাত শরীফকে হত্যার অভিন্ন উদ্দেশ্য পূরণকল্পে এই মামলার ঘটনা ঘটাইয়া তাহাকে খুন করিয়া পেনাল কোডের ৩০২ ও ৩৪ ধারার অধীনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করিয়াছে বলে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হইয়াছে।' ধারার ব্যাখ্যা দিয়ে বিচারক বলেন, 'কতিপয় ব্যক্তি মিলিয়া তাহাদের অভিন্ন উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য কোনো অপরাধজনক কাজ করিলে যেভাবে দায় ঠিক হইত, ঠিক সেইভাবেই দায়ী হইবে। তদানুসারে এই মামলার ভিকটিম রিফাত শরীফকে খুন করিবার দায়ে উক্ত আসামিগণ সমভাবে দায়ী।' [বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ১ অক্টোবর, ২০২০] যারা সরাসরি ধারালো অস্ত্র দিয়ে রিফাতকে কোপাচ্ছিল তাদের 'ক্রিমিনাল রেসপনসিবিলিটি' বা ফৌজদারি দায় এবং মিন্নির 'ক্রিমিনাল রেসপনসিবিলিটি' এক হতে পারে না; তিনি তার স্বামীর হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকলেও আমরা যারা অপরাধ আইন, তার প্রসিডিউর, সেনটেনসিং এবং দণ্ড নিয়ে পড়াশোনা করি বা চর্চা করি; তারা জানি, 'ক্রিমিনাল রেসপনসিবিলিটি' বা ফৌজদারি দায়ের তারতম্যের কারণে শাস্তিরও তারতম্য হয়। দায় যার বেশি, তার শাস্তি বেশি; দায় যার কম, তার শাস্তি কম। রায়ে যেহেতু প্রমাণিত হয়েছে, মিন্নি তার স্বামী হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন, সেহেতু তার শাস্তি অবশ্যই প্রাপ্য। আমার দ্বিমত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া নিয়ে।

পুরো ঘটনার প্রামাণিক বিষয়; যেমন- ভিডিও ফুটেজ, চার্জশিট, বিচার প্রক্রিয়ার প্রকাশিত খবর, প্রকাশিত রায় ও পর্যবেক্ষণ বিশ্নেষণ করার পর আমার মনে হয়েছে, মিন্নিকে প্রদত্ত মৃত্যুদণ্ড তার ফৌজদারি দায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দ্বিতীয়ত, নিহত রিফাতের বাবা প্রথম যে মামলা করেন, সেই মামলায় মিন্নি ছিলেন এক নম্বর সাক্ষী। পরবর্তী সময়ে প্রভাবশালী মহলের চাপে রিফাতের বাবা তার অবস্থান পরিবর্তন করে তার পুত্রবধূকে রিফাত হত্যার দায়ে অভিযুক্ত করেন। প্রভাবশালী মহলের চাপে মিন্নিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে এবং পরে তাকে হাইকোর্ট জামিন প্রদান করেন।

রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হক আদালতে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, 'আমরা ন্যায়বিচার পাইনি। মিন্নিকে অন্যায়ভাবে ফাঁসানো হয়েছে।' মিন্নির আইনজীবী মাহবুবুল বারীও আপিল করার সিদ্ধান্ত জানান। (সমকাল, ১ অক্টোবর, ২০২০)। এ মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়, ঘটনার পর আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি রিফাত শরীফকে হাসপাতালে না নিয়ে নিজের ভ্যানিটি ব্যাগ ও জুতা খোঁজায় ব্যস্ত ছিলেন। যদিও বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের সামনের সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, রক্তাক্ত রিফাতকে মিন্নি একাই হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন। (প্রথম আলো, ১ অক্টোবর, ২০২০ এবং বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯)।


রায়ে বলা হয় যে, মিন্নির জবানবন্দির ভিত্তিতেই তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। যদিও বিচারক বলেছেন যে, মিন্নির জবানবন্দি অন্যদের সাক্ষ্য-প্রমাণ দ্বারা 'করোবরোটেড' বা সমর্থিত হয়েছে; কিন্তু মিন্নির আইনজীবী ও তার বাবা এ ব্যাপারে বরাবরই আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন। মামলার অভিযোগপত্রে ভুল তথ্য থাকা, মিন্নির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি অকাট্য না হওয়া এবং ইতোমধ্যে উল্লিখিত নানা অসংগতির ফলে মিন্নির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি বলে মনে করার শক্তিশালী যৌক্তিক ভিত্তি আছে। আর সারাবিশ্বে অপরাধ আইনের মূলনীতি হচ্ছে- 'দ্য চার্জেস মাস্ট বি প্রুভড বিয়ন্ড অ্যানি রিজোনেবল স্যাডো অব ডাউট।'

আমার দ্বিমতের পক্ষে প্রাসঙ্গিকভাবে আমি দুটো মামলার রেফারেন্স দেব। প্রথম মামলাটি হচ্ছে বিশ্বজিৎ হত্যা মামলা। এই মামলায় ঢাকার দ্রুত বিচার টাইব্যুনালে ২১ জনের মধ্যে আটজনের মৃত্যুদণ্ড এবং ১৩ জনকে যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু হাইকোর্ট বিভাগে এসে ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই দেওয়া হয়। খালাস দেওয়া হয় চারজনকে এবং দু'জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে।  [State V Md. Rafiqul Islam and Ors [(2018) 70 DLR 26]  হাইকোর্ট কর্তৃক বিচারিক পর্যায়ে মামলার নিল্ফেম্নাক্ত ত্রুটির উল্লেখ করা হয়- তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তার গাফিলতি, ময়নাতদন্তে আঘাতের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য না আসা এবং ময়নাতদন্তে গাফিলতি। হাইকোর্টের এই রায়ের আলোকে চার্জশিটের ভুল, মিন্নির জবানবন্দির অকাট্যতার অভাবসহ নানা কারণে কি মিন্নিকে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের ব্যাপারে আইনি তর্ক উঠতে পারে না?

আলোচ্য রায়ে আরও বলা হয়েছে, আসামি মিন্নি এ মামলার ঘটনার পরিকল্পনার 'মাস্টারমাইন্ড'। তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে তার পদাঙ্ক অনুসরণে তার বয়সী মেয়েদের বিপথগামী হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। তাই এ মামলায় তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া বাঞ্ছনীয়। দুটি যুক্তিতে মিন্নিকে প্রদত্ত মৃত্যুদণ্ডটি দৃষ্টান্তমূলক হবে না বলে মনে হয়েছে। প্রথম যুক্তিটি আমি নিয়েছি ঐশী কর্তৃৃক তার মা-বাবাকে হত্যা মামলায় হাইকোর্ট প্রদত্ত রায় থেকে  (The State V Oyshee Rahman [(2019) 12 SCOB 238]। উল্লেখ্য, ১৮ বছরের বালিকা ঐশী কফিতে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে অজ্ঞান করে ধারালো ছুরি দিয়ে আঘাত করে তার মা-বাবাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। এ মামলার রায়ে বিচারিক আদালত ঐশীকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। কিন্তু পাঁচটি কারণে হাইকোর্ট তার মৃত্যুদণ্ড রদ করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন। হাইকোর্টের বিচারপতিদ্বয় নানা যুক্তিতর্ক ও নানা মামলার রেফারেন্স দিয়ে রায়ে বলেন, মৃত্যুদণ্ড একদিকে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন; অন্যদিকে সেটি অপরাধীর সংশোধিত হবার সুযোগকে চিরতরে বন্ধ করে দেয়।

দ্বিতীয়ত, গবেষকরা অনেক মামলা পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন, উচ্চ আদালতের অনেক বিচারক নানা কারণে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন না। এ ছাড়া অনেক মামলায় বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী কনডেম সেলে ৫-৭ বছর থাকলে, ওই যন্ত্রণাদায়ক কারাবাসের উল্লেখ করে তার আইনজীবী দাবি জানালে উচ্চ আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই দেন। পরিসংখ্যান বলে, নারীদের খুব কম মামলাতেই মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। আর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও সেটি কার্যকর হয় না।

সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে, স্বাধীনতার পর থেকে শতাধিক নারীর ফাঁসির আদেশ হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো নারীর ফাঁসি কার্যকর হয়নি।

ইতোমধ্যে করা আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমার শেষ পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, উচ্চ আদালতে মিন্নির মৃত্যুদণ্ড টিকবে কিনা সেই আশঙ্কা; এবং মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলেও সেটি কার্যকর হওয়ার ক্ষীণ সম্ভাবনার কারণে মিন্নির মৃত্যুদণ্ড দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবার সম্ভাবনা খুবই কম।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ; অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়