সাক্ষাৎকার: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন

ইসির কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছাড়া এনআইডি জালিয়াতি সম্ভব নয়

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সাক্ষাৎকার গ্রহণ:মাহফুজুর রহমান মানিক

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো এম সাখাওয়াত হোসেন ২০০৭ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের অন্যতম নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিসেবে অবসর গ্রহণের পর তিনি লেখালেখি ও গবেষণায় মনোনিবেশ করেন। এম সাখাওয়াত হোসেন ২০১৮ সালে নির্বাচনী ব্যবস্থায় সুশাসনের ওপর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার জন্ম ১৯৪৮ সালে বরিশালে
সমকাল: জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ পুরোনো। আমরা দেখেছি, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের এনআইডির মাধ্যমে পাসপোর্ট করে বিদেশেও গেছে। রোহিঙ্গারা কীভাবে এনআইডি পেল?
এম সাখাওয়াত হোসেন: জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি একটি দেশের নাগরিক পরিচয়পত্র। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের এনআইডি পাওয়ার কথা নয়। তারপরও তারা এনআইডি পেয়েছে; তা দিয়ে পাসপোর্ট করে বিদেশেও গেছে। কারও জাতীয়তা প্রমাণের জন্য কিংবা ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে স্থানীয় তথ্যের ওপরেই নিবন্ধন করতে হয়। এ ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রদত্ত সার্টিফিকেট কিংবা জন্মনিবন্ধনই প্রাথমিক ভরসা। এগুলো ইউনিয়ন পরিষদে গেলেই সহজে পাওয়া যায়; এখানে তেমন যাচাই-বাছাই করা হয় না বিধায় ভুয়া সনদ পাওয়া যায়। ২০০৯ সালে যখন জাতীয় পরিচয়পত্র করা হয়, তখন আমরা খবর পেলাম রোহিঙ্গারা এনআইডি নিচ্ছে বা ভোটার হচ্ছে।
সমকাল: রোহিঙ্গারা যাতে এনআইডি না পায়, তখন আপনারা কী পদক্ষেপ নেন?
এম সাখাওয়াত হোসেন: আমরা যখন খবর পাই রোহিঙ্গারা ভোটার হচ্ছে, তখন ইসি তদন্ত করে ২০-২৫ হাজার রোহিঙ্গার নিবন্ধন বাতিল করে। ২০০৯ সালে তখন আমরা নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে সিদ্ধান্ত নিই, রোহিঙ্গা বসবাসকারী এলাকাগুলো বিশেষভাবে চিহ্নিত করতে হবে। এর পর বিশেষ ফরম ও কমিটির মাধ্যমে সেখানে ভোটার করে ইসি। সাধারণত বিশেষ কমিটি অনুমোদন না করলে ওইসব এলাকায় কাউকে ভোটার করা হয় না। তারপরও প্রতিবার রোহিঙ্গাদের ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ পাওয়া যায়। তাদের ভোটার করতে মূলত স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাই সহযোগিতা করে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন যতটা না দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী স্থানীয়রা। অনেকে টাকার জন্য, অনেকে রাজনৈতিক ফায়দা লাভের জন্য রোহিঙ্গাদের ভোটার বানাতে সহায়তা করে।
সমকাল: এনআইডি জালিয়াতির কথা কী বলবেন? ডা. সাবরিনার একাধিক এনআইডির বিষয় আমরা জানি। সবশেষ জাল এনআইডি তৈরি করে ব্যাংক থেকে অবৈধভাবে ঋণ গ্রহণের ঘটনাও ঘটেছে...
এম সাখাওয়াত হোসেন: জালিয়াতি করে কারও একাধিক এনআইডি পাওয়ার উপায় নেই। এমনকি একজনের আইডি আরেকজনের নামে করাও অসম্ভব। কারণ আঙুলের ছাপ, চোখের মণির (আইরিশ) প্রতিচ্ছবি নেওয়াসহ সাতটি ধাপ পার হওয়ার পরই একজন ভোটার এনআইডি হাতে পান। সুতরাং কেউ দ্বিতীয়বার ভোটার হতে চাইলে তা সঙ্গে সঙ্গে ধরা পড়ার কথা।
সমকাল: তাহলে এনআইডি জালিয়াতি হচ্ছে কীভাবে?
এম সাখাওয়াত হোসেন: এনআইডি জালিয়াতির ক্ষেত্রে কারিগরি ত্রুটি আছে বলে আমি মনে করি না। বরং যারা এসব প্রক্রিয়া যাচাই করেন, সমস্যা সেখানেই। আমাদের পদে পদে যেখানে দুর্নীতি; এই প্রক্রিয়াও তার বাইরে নয়। যারা জাতীয় পরিচয়পত্রের দায়িত্বে রয়েছে, তাদের কারও না কারও যোগসাজশেই এ জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে। এখন পর্যন্ত এনআইডি জালিয়াতির ক্ষেত্রে ডাটা এন্ট্রি অপারেটরদের নামই বেশি এসেছে। ডাটা এন্ট্রি অপারেটর ছাড়াও অন্য যাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, তারা সবাই এনআইডি নিবন্ধন ও বিতরণ প্রকল্পের কর্মী। তবে ইসির কর্মকর্তাদের সহযোগিতা না থাকলে কিংবা তারা দায়িত্ব পালনে অবহেলা না করলে শুধু ডাটা এন্ট্রি অপারেটরদের পক্ষে এত বড় জালিয়াতি করা সম্ভব নয়।
সমকাল: জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন ও বিতরণ কাজ এখন প্রকল্পনির্ভর কেন?
এম সাখাওয়াত হোসেন: এনআইডি নিবন্ধন ও বিতরণ কাজ যখন শুরু হয়, তখন নির্বাচন কমিশনের জনবল তেমন ছিল না। আর এত বড় কর্মযজ্ঞে অনেক জনশক্তি প্রয়োজন হয়। সাধারণত প্রকল্পের মাধ্যমেই এসব সম্পন্ন হয়ে থাকে। এনআইডির এখন স্মার্টকার্ডের কাজ চলমান। কথা ছিল, ২০১৬ সালের মধ্যে দেশের সব নাগরিককে স্মার্টকার্ড দেওয়া হবে। কিন্তু এখনও স্মার্টকার্ড সবাই পাননি। এসব কাজ সম্পন্ন হলে হয়তো নির্বাচন কমিশনের স্থায়ী জনবল দিয়ে পরবর্তী কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
সমকাল: এনআইডি জালিয়াতি দেশের নিরাপত্তার জন্য কতটা হুমকি?
এম সাখাওয়াত হোসেন: এনআইডি জালিয়াতি দেশের নিরাপত্তার জন্য অবশ্যই হুমকিস্বরূপ। নিরাপত্তা মানে কেবল সীমান্তের বিষয় নয়। আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক নিরাপত্তাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা ছাড়া আমরা দেখছি, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশ গেছে; সেখানে তারা অপরাধ করছে। এতে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। আবার এরকম একটা মহামারি পরিস্থিতি যখন বিশ্বব্যাপী, তখন সাবরিনারা কীভাবে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করেছে? করোনা 'পজিটিভ' পরীক্ষা করা ছাড়াই কীভাবে 'নেগেটিভ' ফল দিয়েছে। বহির্বিশ্বে এর প্রতিক্রিয়াও হয়েছে ব্যাপক। বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যমে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস পরীক্ষা নিয়ে দুর্নীতির খবর যে রকম ফলাও প্রচার পেয়েছে, তাতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
সমকাল: এনআইডি জালিয়াতি রোধে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া দরকার বলে আপনি মনে করেন?
এম সাখাওয়াত হোসেন: এনআইডি জালিয়াতি বন্ধে এর সঙ্গে কারা জড়িত তাদের বের করতে হবে। আমরা দেখেছি, জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত কর্মচারীদেরই শাস্তি হয়েছে। বড় কর্মকর্তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছেন। জালিয়াতির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ভোটার করার ক্ষেত্রে ইসির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার নাম এসেছে। এখনও এ সংক্রান্ত তদন্ত শেষ হয়নি। তাই কারা জড়িত, সেটি এখন পর্যন্ত আড়ালে রয়ে গেছে। অপরাধী ধরতে না পারলে তো জালিয়াতি বন্ধ হবে না। তৃণমূল পর্যায়ে স্থানীয় লোকসহ জনপ্রতিধিদের সতর্ক হতে হবে।
সমকাল: এনআইডি এখন ১৮ বছর হলে দেওয়া হয়। জন্মের পরই এটি প্রদানের চিন্তা করছে সরকার। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
এম সাখাওয়াত হোসেন: ১৮ বছর ভোটাধিকারের বয়স। ১৮ হলেই কেবল একজন পূর্ণাঙ্গ নাগরিক বলা যায়। এর আগে সবাই কারও না কারও অধীনে থাকে। অনেক দেশে ১৮ বছরের নিচেও জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। সেটা এখানেও করা যায়। তবে আমি মনে করি, তাদের জন্য আলাদা আইডি কার্ড প্রদান করা যেতে পারে, যেটা অন্যান্য দেশের মতো ১৮ বছর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এনআইডিতে রূপান্তরিত হয়। শিশু বয়স থেকেই যদি তার তথ্য নির্বাচন কমিশনে থাকে, তাহলে বারবার তথ্য সংগ্রহ করতে হবে না। এতে সরকারের কর্মঘণ্টাসহ বেঁচে যাবে অনেক টাকাও। ২০১৬ সালে একবার ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের নিবন্ধন করেছিল নির্বাচন কমিশন। তথ্য হালনাগাদ করলেও তাদের এনআইডি দেওয়া হয়নি।
সমকাল: এনআইডির কাজ নির্বাচন কমিশন থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিতে চায়। এটি কি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হবে?
এম সাখাওয়াত হোসেন: জাতীয় পরিচয়পত্রের কাজ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দেওয়া উচিত হবে না। তাতে অনিয়ম ও জালিয়াতি আরও বাড়বে বলে আমি মনে করি। তাতে সরকারকে মন্ত্রণালয়ের জনবল বাড়াতে হবে, খরচও অনেক বাড়বে। সেখানে রাজনীতিও ঢুকে পড়তে পারে। প্রথম কথা হলো, এনআইডির সঙ্গে ভোটার তালিকার সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ভোটার তালিকার জন্য সাংবিধানিকভাবে দায়িত্ব হলো নির্বাচন কমিশনের (ইসি)। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ দায়িত্ব পেলে তখন ইসিকে ভোটার তালিকার জন্য মন্ত্রণালয়ের দ্বারস্থ হতে হবে। কিংবা দুই কর্তৃপক্ষের কাছেই তালিকা থাকতে হবে। তখন এ নিয়ে যেমন দ্বন্দ্ব তৈরি হবে, তেমনি দুই কর্তৃপক্ষের রক্ষণাবেক্ষণের খরচও আলাদাভাবে লাগবে। অনেক দেশে 'সিটিজেন রেজিস্ট্রেশন' আলাদা কর্তৃপক্ষের কাছে থাকায় যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা আমরা দেখেছি। আমাদের এখানে সমস্যা এর চেয়ে বেশি হবে। এটি অনেকের দুর্নীতির কারণ হবে। যে দেশে পুকুর তৈরির জন্য, খিচুড়ির রান্না দেখতে বিদেশে প্রশিক্ষণে যাওয়ার ঘটনা ঘটে, সেখানে এটা তো তাদের জন্য সোনার খনির মতো হবে।
সমকাল: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
এম সাখাওয়াত হোসেন: আপনাকেও ধন্যবাদ। সমকালের জন্য শুভকামনা।