স্মরণ

নিভৃতচারী জহুরুল ইসলাম

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২০     আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

মনোজ রায়

দেশের সফল ব্যবসায়ী, সমাজসেবী ও সৃজনশীল শিল্পোদ্যোক্তা দানবীর জহুরুল ইসলামের ২৫তম প্রয়াণ দিবস আজ। সাধারণ থেকে কীভাবে অসাধারণ হয়ে ওঠা যায় সেই দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায় তার জীবন থেকে। দীর্ঘ জীবন পাননি তিনি। মাত্র ৬৭ বছর বয়সে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। এই স্বল্প সময়ের জীবনে কত অসাধ্য সাধন তিনি করেছেন তার ফিরিস্তি দিতে গেলে প্রবন্ধটি হবে নাতিদীর্ঘ। তার এই চলে যাওয়ার ক্ষতি শুধু কি তার পরিবারের? না, এই ক্ষতি গোটা সমাজের ও দেশের।

মাত্র ৬৭ বছর বয়সের জীবনে জহুরুল ইসলাম গড়ে তুলেছিলেন নানা ধরনের শিল্পকারখানা। পাটজাত পণ্য উৎপাদন করে বিদেশে রপ্তানি করেছেন। চিকিৎসা সেবার স্বার্থে গড়ে তুলেছেন ওষুধ শিল্প। দেশের প্রথম আবাস তৈরির নিখুঁত কারিগর ছিলেন তিনি। হাউজিং ব্যবসার পথিকৃৎ বলা হয় তাকে। হাজার হাজার মানুষ এসব প্রতিষ্ঠানে তাদের শ্রম ও মেধার ব্যবহার ঘটিয়ে সৃষ্টি করেছেন নতুন নতুন ইতিহাস।

নানাবিধ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পাশাপাশি তার জন্মভূমি কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর উপজেলার ভাগলপুর গ্রামে গড়ে তুলেছেন একটি অত্যাধুনিক হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ। দেশি-বিদেশি অসংখ্য শিক্ষার্থী এই প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষালাভ করে মানবসেবায় নিয়োজিত করেছেন নিজেদের। বেসরকারি পর্যায়ে স্থাপিত চিকিৎসা শিক্ষা ও সেবা প্রতিষ্ঠানের তালিকার প্রথম কাতারে স্থান দখল করে আছে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই। প্রায় তিন দশক অতিক্রম করছে এই প্রতিষ্ঠান। কিশোরগঞ্জের মানুষ মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন- মরহুম জহুরুল ইসলামের সব সৃষ্টির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছে এই মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। এই প্রতিষ্ঠানের আয় থেকে কখনও তার পরিবার অর্থ নেয় না, ঘাটতি হলে অন্য প্রতিষ্ঠানের আয় থেকে জোগান দেয়।

কভিড আক্রান্তদের সেবা দিতে গিয়ে আমাদের দেশে কত চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন তা সবাই জানি। করোনার ভয়াবহ থাবায় যখন দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা যখন সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে, রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোতে নানা অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত মানুষ যখন নূ্যনতম চিকিৎসা সেবা পেতে দিজ্ঞ্বিদিক ছুটে বেড়িয়েছেন, তখন প্রয়াত জহুরুল ইসলামের অন্যতম সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল শতভাগ নিষ্ঠা ও মমতা দিয়ে সব ধরনের রোগীকে চিকিৎসা সেবা অব্যাহত রেখেছে। কভিডের ভয়াবহ আগ্রাসনের এ সময়ে এ হাসপাতালে রোগীর চাপ বেড়েছে আগের তুলনায় দ্বিগুণ। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও কর্মচারীরা রোগীদের প্রতি তাদের দায়িত্ব পালনে সামান্যতম শৈথিল্য দেখিয়েছেন- এমনটি শোনা যায়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অতিশয় সচেতন থেকে রোগীদের সেবা প্রদানের বিষয়টি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রেখেছে। মানবতার সেবায় জহুরুল ইসলামের এই অসামান্য অবদান তাকে বাঁচিয়ে রাখবে অনির্দিষ্টকাল। দায়িত্ববোধ, স্বদেশের দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রাম এবং সর্বোপরি একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। কথা ও কাজের মাধ্যমে বারবার প্রমাণ করেছেন, তিনি এ মাটির একজন অপরাজেয় কারিগর।

পঁচিশতম প্রয়াণ দিবসে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে উপলব্ধি হচ্ছে, এমন মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন যত বেশি মানুষ জন্ম নেবেন, সমাজে অবহেলিত ও অসচ্ছল মানুষের বেঁচে থাকা ও জীবনমান উন্নয়নে তত বেশি সম্ভাবনা তৈরি হবে।

আমার শেষ জিজ্ঞাসা- দেশ, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি তার যে অবদান, রাষ্ট্র কি তার যথাযথ স্বীকৃতি দিয়েছে? একটি রাষ্ট্রীয় পদকও কি জুটতে পারত না তার ভাগ্যে। তার পরও সাহস করে দ্বিধাহীন চিত্তে বলা যায়, দেশের মানুষের হৃদয়ে তিনি চির জাগ্রত আছেন এবং থাকবেন তার মানব প্রেমের জন্য।

  সাংবাদিক