রেলওয়ে

ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চাই কর্ডলাইন ও কনটেইনার ডিপো

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২০     আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

আহসান জাকির

শহরের কম জনবহুল এলাকা, ধর্মীয় উপাসনালয় ও কবরস্থান যেন না পড়ে ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া রেল পরিচালনায় সুবিধা, যাত্রীসাধারণের যথাযথ স্টেশন ব্যবহারের উপযুক্ততা, ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণে উপযুক্ত জায়গা নির্বাচন ও পরিবেশগত দিক বিবেচনা করা হয়।

আমার মতে, ঢাকা-চট্টগ্রাম কর্ডলাইনটি ডুয়েল গেজের হওয়া সমীচীন। সেক্ষেত্রে এর আগে বিবেচিত ২০০৯ সালের এসএমইসি কর্তৃক সমীক্ষাকৃত দ্বিতীয় অপশনটি বিবেচনা করা যেতে পারে। এই অ্যালাইনমেন্টটি কুমিল্লার ৬৭, মুন্সীগঞ্জের ১৩টি এবং নারায়ণগঞ্জের ২৫টি গ্রামের ওপর দিয়ে যাবে; যেগুলোর বেশির ভাগ কৃষিজমি এবং কম ঘন বসতিপূর্ণ এলাকা। অ্যালাইনমেন্টটি ৫৯টি খালবিল, নদীনালার ওপর দিয়ে যাবে। তিনটি সবচেয়ে বড় নদী মেঘনা, গোমতী ও শীতলক্ষ্যা অতিক্রম করতে হবে। অ্যালাইনমেন্টটিতে ১০৩টি রোড ক্রসিং রয়েছে বিভিন্ন ক্যাটাগরির, আটটি জায়গায় বিদ্যুতের লাইন এবং ঢাকা-লাকসামের মধ্যবর্তী একটি জায়গায় গ্যাসের পাইপলাইন পড়বে; যেগুলো স্থানান্তর করতে হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই কর্ডলাইনে নয়টি ব্লক স্টেশন প্রস্তাব করা হয়েছে।

অপশনটি মাটির ওপর দিয়ে রেললাইন নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়। বর্তমানে এলিভেটেড উড়াল রেলপথ নির্মাণের বিবেচনা করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে সমীক্ষায় উল্লিখিত জমি অপেক্ষা অনেক কম জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে। তাই সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের জন্য ফতুল্লা অপশনের প্রাক্কলনটি প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন করে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ডিজাইন ও বিল্ট পদ্ধতিতে নির্মাণের জন্য প্রকল্পটি অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। এ সময়ের মধ্যে যদি লাকসাম-চট্টগ্রাম মিটার গেজ লাইনকে ডুয়েল গেজে রূপান্তরের প্রকল্প গ্রহণ করা যায় এবং দুটি প্রকল্প সমান্তরালভাবে চলে, তাহলে কর্ডলাইনটি শুধু ব্রড গেজ করা যেতে পারে। এতে মিটার গেজ অংশের নির্মাণ ব্যয় হ্রাস পাবে।

ঢাকার ধীরাশ্রমে কনটেইনার ডিপো স্থাপন জরুরি। কারণ চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বর্তমানে দেশের নৌবাণিজ্যের ৯৮ শতাংশ কনটেইনার পণ্য হ্যান্ডলিং করা হয়। বর্তমানে ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন-সংলগ্ন আইসিডির ধারণক্ষমতা ৯০ হাজার টিইইউএস। স্থানাভাবে এর ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করা সম্ভব নয়। চট্টগ্রাম বন্দরের ৭০ শতাংশ কনটেইনার ঢাকা অভিমুখে পরিবহন করা হয়, যার মাত্র ১০ শতাংশ রেলওয়ে পরিবহন করে। রেলওয়ের মাধ্যমে কনটেইনার পরিবহনের এই হার বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করা হলে কমলাপুর আইসিডির কনটেইনার ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যাবে। তাই ক্রমবর্ধমান কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য গাজীপুরের ধীরাশ্রমে নতুন একটি আইসিডি নির্মাণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

ঢাকার কমলাপুরে আগত অধিকাংশ কনটেইনার রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের অ্যাক্সেসরিজ বা কাঁচামাল বহন করে। ঢাকায় দিনের বেলায় ট্রেইলার ও লং ভেহিকল চলাচল নিষিদ্ধ থাকায় এসব পণ্য ডেলিভারি নিতে প্রতিদিন ১০-১২ ঘণ্টা দেরি হয়। টঙ্গী, পূবাইল, আশুলিয়া, সাভার ইত্যাদি এলাকায় সিংহভাগ গার্মেন্ট কারখানা অবস্থিত হওয়ার কারণে কমলাপুর থেকে এসব স্থানে পণ্য পরিবহনে যানজট ও অন্যান্য কারণে প্রচুর সময় ক্ষেপণ হয়। একই কারণে কনটেইনার রপ্তানির ক্ষেত্রেও বিলম্ব হয়। ধীরাশ্রমে আইসিডি নির্মাণ করা হলে ওই এলাকার কারখানাগুলোর অর্থ ও সময় সাশ্রয়সহ কনটেইনার আমদানি-রপ্তানি অনেক সহজ হবে।

২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে রেলওয়ের আয় ছিল ১৫৯০ কোটি টাকা এর মধ্যে কনটেইনার পরিবাহন বাবদ আয় ১১২ কোটি টাকা অর্থাৎ মোট আয়ের ০৭.০৪% শতাংশ। ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যে ডুয়েল গেজ কর্ড লাইন এবং ধীরাশ্রমে আনুষঙ্গিক সুবিধাদিসহ কনটেইনার ডিপো নির্মাণ করা হলে রেলওয়ের মাধ্যমে কনটেইনার পরিবহনের পরিমাণ বর্তমানের ১০%-এর স্থলে ৯০%-এ উন্নীত করা সম্ভব হবে। সেক্ষেত্রে বর্তমান হিসাবে কনটেইনার পরিবহন বাবদ আয় হবে ১০৮০ কোটি টাকা। সে অনুযায়ী রেলওয়ের বার্ষিক আয় দাঁড়াবে ১৫৯০-১১২+১০৮০=২৫৫৮ টাকা। অর্থাৎ শুধু ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যে কনটেইনার পরিবহন বাবদ রেলওয়ের আয় ০৭.০৪% হতে বৃদ্ধি পেয়ে ৪২.২২% হবে।

অতিরিক্ত সচিব (অব.) ও সাবেক রেলওয়ে কর্মকর্তা

zakir.ahsan72@gmail.com