শ্রদ্ধাঞ্জলি

রশীদ হায়দার: মুক্তিযুদ্ধের অর্জুন

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২০     আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

দাউদ হায়দার

বাংলাদেশে অনেকেই রটনাকারী 'পঞ্চপাণ্ডব'। অর্থাৎ হায়দার ফ্যামিলি। 'কিন্তু অর্জুন একজনই। রশীদ হায়দার।' রটনার হেতু, পাঁচ ভাই-ই সাহিত্যিক। লোকে অল্পবিস্তর চেনে। পাঁচ ভাইয়ের চার ভাই মূলত কবি। রশীদ হায়দার গাল্পিক, ঔপন্যাসিক। প্রাবন্ধিক। গবেষক। এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা নিয়ে যত লেখা লিখেছেন, আমরা কেউ লিখিনি। বাংলাদেশের অন্য কোনো লেখকও নন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একাই যেন তার যুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ নয় মাসের। শুরুর কিছুদিন পরেই লিখতে শুরু করেন 'খাঁচায়'। তিনি বন্দি। তার স্ত্রী ঝরা'র (আনিসা আখতার। বিয়ের পরে উপাধি হায়দার) বড় আপার বাড়িতে। বাড়িটি ঐতিহাসিক। ৩২ ধানমন্ডির পয়লা বাড়ি। ওই বাড়ির চার/পাঁচ বাড়ি ছাড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি।

'খাঁচায়' উপন্যাসে তৎকালীন মানুষের দুরবস্থা, বন্দিজীবন, রাষ্ট্র ও সমাজের চালচিত্র, মুক্তিযুদ্ধের চিত্রমালা নানা অভিধায়, নানা কথামালায় বিধৃত। চিত্রিত। স্বাধীনতার পরে প্রকাশিত। বাংলাদেশে দ্বিতীয় উপন্যাস, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিষয়ক। পাঠকমহলে বিপুল আলোচিত। প্রশংসনীয়। পঠিত।

রটনাকারীদের রটনায় আরও 'মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতাই রশীদের পয়লা পছন্দ, বিষয়। যোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামী। সফলও। অর্জুনই।' এইসব অভিধার যুক্তি বাহুল্য নয়। রশীদ হায়দার 'স্মৃতি :৭১' তেরো খণ্ডে সম্পাদনা করেছেন। প্রকাশিত বাংলা একাডেমি থেকে। '১৯৭১ :ভয়াবহ অভিজ্ঞতা।' কিংবা 'অসহযোগ আন্দোলন :একাত্তর' আকর দলিল। গবেষণা। লেখা। সম্পাদনা। 'শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষ' তার মহত্তম কাজের একটি। আরও আছে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে নিয়ে লেখা বই। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তই প্রথম পাকিস্তানের জন্মের পরে, পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত সাংসদ, পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে (তখন করাচিতে) পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা নয় কেন- জোরালো যুক্তিতর্ক করে পাকিস্তানের চক্ষুশূল হন। কিন্তু অদমনীয় তিনি। 'হিন্দু' অপবাদ সহ্য করেও।

পাকিস্তানের জল্লাদ বাহিনী ১৯৭১-এ তাকে খুঁজবেই, স্বাভাবিক। হত্যা করে। কুমিল্লায়।

ধীরেন্দ্রনাথের একমাত্র পুত্র সঞ্জীব দত্ত। বাংলার বিখ্যাত ঘটক পরিবারের জামাতা। তার স্ত্রী প্রতীতি দেবী। যমজ ভাইবোন প্রতীতি ও ঋত্বিক ঘটক। প্রতীতি দেবী বাংলাদেশেই থাকতেন, মারা গেছেন বছর দেড়েক আগে। প্রতীতি-সঞ্জীবের কন্যা আরমা দত্ত এখনও বাংলাদেশে। ঢাকায়।

লক্ষণীয়, রশীদের গ্রন্থের তালিকায় (সত্তরটির বেশি বই প্রকাশিত) কেবল মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতাবিষয়ক গবেষণামূলক, সম্পাদিত বই-ই নয়, উপন্যাস তো আছেই, 'মুক্তিযুদ্ধের নির্বাচিত গল্পও'। প্রত্যক্ষ মুক্তিযোদ্ধা না হয়েও কতটা যোদ্ধা ও অংশীদার, পড়লেই পরিস্কার, লেখক কেন অর্জুন। পরতে পরতে ছেঁকে এনেছেন ঘটনা, ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে। গল্পের মুনশিয়ানায় ভাষার সহজ-কারুকাজও। কারুকাজে পাঠক একাত্ম।

রশীদের কিশোর উপন্যাস 'শোভনের স্বাধীনতা', 'যুদ্ধ জীবন', যে প্রত্যেক কিশোর, কিশোরউত্তীর্ণের কথা, যারা স্বাধীনতা চায়, স্বাধীনতার অতন্দ্রপ্রহরী। কাহিনির বিন্যাসে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার সংমিশ্রিত ঘটনা। প্রেমের গল্প, উপন্যাসও লিখেছেন। সমাজরাষ্ট্রের সমস্যা, রাজনীতি ও গল্প-উপন্যাসে। নাটক লিখেছেন (মঞ্চে অভিনীত), তবে রাষ্ট্রীয় সমাজের চিত্র-হালহকিকত নিয়ে। কোনো সরকারের পছন্দ ছিল না। তোয়াক্কা করেননি। একগুঁয়ে স্বাধীন। লেখায় এবং বক্তৃতায় লক্ষ্য ছিল, বিশেষত এই প্রজন্মের উদ্দেশে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, উজ্জীবিত করা, ধর্মাধর্ম ব্যতিরকে মানবতার পক্ষে। বলতেন 'আমার স্বপ্ন, ব্রত।'


বলছিলুম রশীদের নাটকের কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন, (১৯৬৪), 'ভ্রান্তিবিলাস' নাটকে কিংকরের চরিত্রে অভিনয় (পরিচালক মুনীর চৌধুরী)। বোধ করি, নাটকে তখনই মশগুল। বাংলাদেশে বিখ্যাত নাট্যনটের 'নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়'-এর প্রতিষ্ঠার একজন। প্রতিষ্ঠাতা জিয়া হায়দার। অগ্রজ। নাটক বিষয়ে পড়তে গিয়েছেন দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় (এনসিডি)। এনসিডির বহুমানিত অধ্যাপক ইব্রাহি আলকাজি এবং ওঁর স্ত্রী উমা কাজীর ঘরোয়া, পারিবারিক। আলকাজির মুখেই শুনেছিলুম (২০০৬ সালে) 'নাটকে লেগে থাকলে রশীদ এই উপমহাদেশে বড়ো নাট্যজন, নাট্যকার হতেন। অবশ্য, ওর বাতিক গল্প, উপন্যাস লেখা, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা। এটাও খুব ভালো। বাংলাদেশের জন্যে প্রয়োজনও।' কলকাতার বিভাস চক্রবর্তী, অশোক মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে রশীদের সখ্যসম্পর্ক, দহরম মহরম বহুল কথিত। ওঁরা রশীদের ঢাকার বাড়িতে গিয়ে ইয়ার আড্ডায় একাত্ম, খানাপিনা।

গুন্টার গ্রাস এবং ওঁর স্ত্রী ওঠে ঢাকায় গিয়ে রশীদের আস্তানায় বিকেল-সন্ধ্যা কাটিয়ে মহাখুশি। বলেন, 'তোমার ভাই গায়ে পাঞ্জাবি, পরনে লুঙ্গি, বাংলার সংস্কৃতির ধারক। এ রকমই দেখতে চেয়েছিলাম। ভালো লেগেছিল ওঁকে।'

গুন্টার গ্রাসের সঙ্গে রশীদের সাক্ষাৎ, পারিবারিক মিলন, এই নিয়ে লিখেছেন। বিখ্যাত 'ভাইকিং' প্রকাশনীর সংকলনে (গ্রাসকে নিয়ে) প্রকাশিত। সম্পাদক মার্টিন ক্যাম্পশেন। ভূমিকায় বলেছেন, 'চমৎকার লেখা।'

রশীদের উপন্যাস 'অন্ধ কথামালা' (প্রথম প্রকাশ ঢাকায়। কলকাতায় সংস্করণ ডিএম লাইব্রেরি) পড়ে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের উচ্ছ্বসিত চিঠি রশীদকে। বছর দুয়েক পরে দু'জনের দেখা (শ্যামলের বাড়িতেই)। শ্যামল বলেন, 'আমার হাত ছুঁয়ে আমাকে ধন্য করুন।' কথায় কথায় শ্যামলের অভিযোগ, 'এত কম লেখেন কেন? বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের, স্বাধীনতার আগাপাশতলা আরও জানতে চাই। আপনি নিশ্চয় মুক্তিযোদ্ধা। হাসান (হাসান আজিজুল হক) আপনার সম্পর্কে আমাকে বলেছেন।' কী কথা, কী বলা, কানে সেঁধে নেই। লিখছি না।

রশীদের কোন লেখা পড়ে অন্তরা দেবসেন আপ্লুত, বলতে অপারগ। অন্তরা দেবসেন সম্পাদিত বৈশ্বিক পত্রিকা 'দ্য লিটল ম্যাগাজিন' কার্যকারণে বন্ধ আপাতত। রশীদের কয়েকটি গল্প প্রকাশিত (অনূদিত)।

রশীদ হায়দার, শেখ মোহাম্মদ হাকিমউদ্দীন, রহিমা খাতুনের দ্বিতীয় পুত্র, আমাদেরও দ্বিতীয় অগ্রজ। তাকে ২০০৬ সালের পর দেখিনি। ২০০৬ সালে এসেছিলেন কলকাতায়। আত্মীয়-স্বজন নিয়ে। শেষ দেখা। বিভূঁইয়ে একা, একাকিত্বের যন্ত্রণা কী, দেখা না-দেখা, কী ভয়ংকর, রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন চার লাইনের গানে, শুনছিলুম মালতি ঘোষালের কণ্ঠে :''এ পরবাসে রবে কে হায়!/ কে রবে এ সংশয়ে সন্তাপে শোকে/ হেথা কে রাখিবে দুখভয়সঙ্কটে-/ তেমন আপন কেহ নাহি এ প্রান্তরে হায় রে।''

একই কথা লিখেছেন বন্ধু কোয়েলি ঘোষ। আত্রেয়ী বসু। রশীদের মৃত্যুসংবাদ জেনে। আত্রেয়ী লিখেছেন : 'এরে ভিখারি সাজায়ে কি রঙ্গে তুমি।' রঙ্গের প্রকাশ বহুবিধ। নুপূর বিশ্বাস লিখেছেন :'ওহে পবিত্র, ওহে অনিদ্র, রুদ্র আলোক।' গানে আছে, 'আলোকে এসো।' দরকার নেই 'আলোকের'। অগ্রজ রশীদের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বহু মন্ত্রীর শোক প্রকাশ; বেঁচে থাকবেন তার কাজে। কাজই পাথেয় প্রজন্মে, প্রজন্মান্তরে।

কবি