সাক্ষাৎকার: তোয়াব খান

যখন ছায়াটা সরে যায় তখনই অভাবটা বোঝা যায়

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২০     আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়

বর্তমানে জনকণ্ঠের উপদেষ্টা সম্পাদক তোয়াব খান ১৯৫৫ সালে সংবাদে যোগ দিয়ে ১৯৬১ সালে পত্রিকাটির বার্তা সম্পাদক হন। ১৯৬৪ সালে যোগ দেন দৈনিক পাকিস্তানে। ১৯৭২ সালে দৈনিক বাংলার দায়িত্বপ্রাপ্ত সম্পাদক হন। সত্যবাক নামে দৈনিক বাংলায় শুরু করেন 'সত্যমিথ্যা, মিথ্যাসত্য' শিরোনামে বিশেষ কলাম। ১৯৮০-৮৭ সালে তিনি ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা। পালন করেছেন বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালকের দায়িত্বও। খুব কাছে থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দেখেছেন। ১৯৭৩-৭৫-এ তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও পরে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেস সচিব হিসেবে কাজ করেছেন।


পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়: আপনি তো ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুকে দেখেছেন। নেতা শেখ মুজিবকে দেখেছেন। প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে দেখেছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখেছেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখেছেন। আপনি কখন বঙ্গবন্ধুকে প্রথম দেখেছেন?

তোয়াব খান: বঙ্গবন্ধুকে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে অনেক আগে থেকেই দেখেছি। তবে প্রথম দেখা হয় স্বাধীন বাংলা বেতারের কর্মীরা যখন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান। বঙ্গবন্ধু জানতে চান- কে কী করেছে। তুমি কোথায় ছিলে। অনেকেই ছিলেন সেখানে। যারা শিল্পী গান গাইতেন। তারাও ছিলেন।

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়: সেটা কি বঙ্গবন্ধু ফিরে আসার পর?

তোয়াব খান: এটা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর। গণভবনে। এখন যেটা প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট। রমনা পার্কের উল্টো দিকে। ওইখানে পুবদিকের বারান্দায় সবাই বসে ছিলেন। আমি তখন দৈনিক বাংলার সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি। আমি মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে এসে দৈনিক বাংলাতেই গেলাম। আমাদের লক্ষ্যই ছিল যেখানেই ছিলাম, সেখানেই যাব। আমি নিজের বা আমার সহকর্মীরা, যারা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন আমার সঙ্গে, তাদের কাউকে এমন বলতে শুনিনি যে, আমি ফিরে গিয়ে আমি অমুক পদে যাব বা আমার একটা অতবড় পদ চাই। যে ছাত্র সে বলেছে, আমি ছাত্র, আমি ছাত্রই থাকতে চাই। খুব স্বাভাবিকভাবে লক্ষ্য ছিল, আমার যেখানে কাজ ছিল আমি সেখানেই যাব। সাংবাদিকতা করব। মানে দৈনিক বাংলায় কাজ করতে চাই। তখন বললেন, ঠিক আছে কোনো সমস্যা নেই।

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়: এটা তো গেল মুক্তিযুদ্ধের পরের কথা। মুক্তিযুদ্ধের অনেক আগেই আপনি দৈনিক সংবাদ দিয়ে সাংবাদিকতা শুরু করেছিলেন। তারপর দৈনিক পাকিস্তানে ছিলেন। তখন কি কোনো সম্পর্ক ছিল?

তোয়াব খান: দৈনিক সংবাদে যখন বার্তা সম্পাদক হিসেবে কাজ করি, তখন রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তেমন সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। একবার মোনায়েম খান, সবুর খান- এরা সারাদেশে পরিকল্পিতভাবে দাঙ্গা বাধিয়ে দেয়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দাঙ্গা প্রতিরোধও হয়েছিল। ওই সময় একটা লিফলেট ছাপা হয়। যেটা চারটি সংবাদপত্রে একই হেডলাইনে ছাপা হয়। পূর্ব পাকিস্তান রুখে দাঁড়াও। ওই সময় রাজনৈতিক নেতাদের নামে এবং বঙ্গবন্ধুর নামে মামলা হয়। ওই সময় দেখা হয়েছিল আমার। আমাকে সাক্ষী করেছিল। বললাম, আমি তো সাক্ষ্য দেব না। মোনায়েম খান বললেন, তাহলে আপনাকে সমন জারি করে নিয়ে আসা হবে। আমি বললাম ধরে নিলে আসব। আমি সত্যি কথা বলব। ওই সময় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা হলো। তারপর একটা অকেশনে তার সঙ্গে দেখা হলো। সেটা হলো পহেলা মার্চের পর থেকে অসহযোগ আন্দোলনে পুরো দেশ যখন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে, তখন দৈনিক পাকিস্তান দৈনিক বাংলা হয়ে যায়। তখন সব খবর বিশেষভাবে ছাপা হয়েছিল। এটার একটা কারণ ছিল। তখন ঢাকার বাইরে পত্রিকা পাঠানো যেত না। কারণ, বাস বন্ধ, ট্রেন বন্ধ, বিমানও বন্ধ। পত্রিকা পাঠানোর কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তখন আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম ঢাকা এবং আশপাশে এই পত্রিকাকে আন্দোলনের অংশ হিসেবে নেওয়া।

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়: আপনারা যখন যুদ্ধ থেকে ফিরে এলেন। বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করলেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী হলেন। আপনি ওখানে স্বাধীন বাংলা বেতারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সেখানে আপনি কথিকা লিখতেন। পিন্ডির প্রলাপ সম্পর্কে কি বঙ্গবন্ধু জিজ্ঞাসা করেছিলেন? তিনি কি কিছু জানতেন?

তোয়াব খান: আমার কথিকাটির নাম ছিল পিন্ডির প্রলাপ। হয়তো তাকে বলা হয়েছিল। এটা তো শোনার কোনো সুযোগ ছিল না। তিনি পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি ছিলেন। সেখানে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র কেন, কোনো কিছুই শোনার কথা ছিল না।

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়: রাওয়ালপিন্ডির খবর কীভাবে পেতেন?

তোয়াব খান: এরপর আমি যেটা বলছিলাম, ওই অসহযোগ আন্দোলনের সময় আমরা রাওয়ালপিন্ডি থেকে আমাদের যে সংবাদকর্মী, তাদের কাছ থেকে আমরা নোট পেতাম। নোটটা হচ্ছে- রাওয়ালপিন্ডিতে কী হচ্ছে। আমার বন্ধুরা জানিয়েছিলেন, আপনি যে খবরগুলো পাবেন, সেটা ওরে জানিয়ে দেবেন। ওরে দিতে মানে আন্দোলনের নেতৃত্বে যারা আছেন, তাদের জানাতে হবে। আমি সেটা জানিয়ে দিতাম। টেলিফোন করতাম আমি। মাঝেমধ্যে আমাদের সঙ্গের কেউ টেলিফোন করতেন। এটা ধরুন রাত ১০টার পর। আমাকে বঙ্গবন্ধু না চেনার কোনো কারণ নেই।

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়: এরপর আপনি প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেস সচিব হলেন, সেটা কোন সালে?

তোয়াব খান: প্রধামন্ত্রীর ওখানে আমি যোগ দিয়েছি ১৯৭৩ সালের মে মাসে। এর আগে কিছু ঘটনা আছে। যেমন ১৯৭৩ সালের পহেলা জানুয়ারিতে ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে মার্কিনবিরোধী বিক্ষোভ হয়। তখন মার্কিন দূতাবাস ছিল প্রেস ক্লাবের উল্টো দিকে। ওখানে বিক্ষোভ করে ছাত্ররা। গুলি চলে। একজন ছাত্র নিহত হয়। এটা পত্রিকায় ছাপা হয়। পরের দিন হরতাল হয়। দৈনিক বাংলা তখন একটা টেলিগ্রাম বের করে। তখন বঙ্গবন্ধু নির্বাচনের কাজে ব্যস্ত। তিনি ছিলেন ঢাকার বাইরে। সরকার ওটা ভালো চোখে দেখেনি। টেলিগ্রাম বের করার একটাই উদ্দেশ্য, জনরোষের ভয়। যদি পত্রিকাটা পুড়িয়ে দেওয়া হয়! দৈনিক পাকিস্তান একবার পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই পত্রিকায় এতগুলো লোক কাজ করে। তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে? রাতের বেলা ডাকা হলো আমাকে। তখন কেবিনেট মিটিং হচ্ছে। সেখানেই ডাকা হলো আমাকে। তারপর দৈনিক বাংলা থেকে চাকরি গেল আমার। হাসান হাফিজুর রহমান, তারও চাকরি গেল। আমাকে ওই সময় করা হলো ইনফরমেশন মিনিস্ট্রির ওএসডি। আমার চাকরি চলে যেতে পারে। সেটাতে সরকারের হাত আছে। আমাকে ওএসডি করা হলে সেখানে আমি জয়েন করব কিনা সেটা আমার বিষয়। সেটাতে সরকার কিছু করতে পারবে বলে আমি মনে করি না। আমি পদত্যাগ করলাম। লিখিতভাবে দুই সপ্তাহ পর আমি পদত্যাগ করলাম। তখন তথ্যমন্ত্রী ছিলেন মিজানুর রহমান চৌধুরী। তিনি আমাকে ডেকে বললেন, 'দেখুন আমি তো আপনার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করতে পারব না। কারণ, আমি আপনাকে পদত্যাগ করতে বলিনি। আপনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করুন।' আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি আমাকে বললেন, 'দেখো, এখন নির্বাচন প্রচারে ব্যস্ত আছি। যদি নির্বাচনে জিততে পারি তাহলে আমি প্রধানমন্ত্রী হবো। যদি মেজরিটি না পাই তাহলে আমি জাতির পিতা হিসেবে থাকব। তখন তুমি তোমার মতো কাজ করো। আমি প্রধানমন্ত্রী হলে তোমাকে আমার কাছে আসতে হবে। আমার কিছু কাজ আছে, সেগুলো তোমাকে করে দিতে হবে। আমি কী করব? তারপর নির্বাচন হয়ে গেল। ৭টা আসন বাদে বঙ্গবন্ধুর দল ২৯৩টা আসনে জিতল। আমাকে তখন নানা লোক নানান প্রস্তাব দিচ্ছে। এমনকি বিদেশে দূতাবাসে কাজ করার জন্য প্রস্তাব দিচ্ছে। আমি ভাবলাম একটা শীর্ষস্থানীয় পত্রিকায় কাজ করে দূতাবাসে কাজ করার প্রস্তাব মেনে নিলে একটা স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে জাতির সম্মান লুটিয়ে দেওয়া হবে। যাওয়া উচিত না। আমি যাইনি। একদিন দুপুরে আমার মেয়েদের স্কুল থেকে নিয়ে বাসায় ফিরেছি। আমার ওয়াইফ বললেন, গণভবন থেকে দুইবার টেলিফোন করেছিল। তোমাকে এক্ষুনি যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। আমি যোগাযোগ করলাম। আমাকে যেতে বলা হলো। তখন দুপুর ২টা কিংবা আড়াইটা বাজে। গণভবনে গেলাম। থাকতাম খিলগাঁও চৌধুরীপাড়ায়। ওখানে যখন গেলাম, দেখলাম তোফায়েল সাহেব আছেন। রাজ্জাক সাহেবও আছেন। রফিকউল্লাহ চৌধুরী তখন সচিব। তিনিও ছিলেন। তারা আমাকে ধরে নিয়ে গেলেন। বঙ্গবন্ধু তখন সবেমাত্র লাঞ্চ করেছেন।

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়: বঙ্গবন্ধুর খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে একটু আপনার কাছে শুনি।

তোয়াব খান: সাদা ভাত। আমি যা যা দেখেছি, একেবারে সাদা ভাত খেতেন। এর সঙ্গে হয়তো ভাজি থাকত। মাছের ঝোল থাকত। মাগুর মাছের ঝোল। ডাল থাকত। খুব বেশি হলে হয়তো মুরগির এক-দুই টুকরো মাংস থাকত। পুডিং খাওয়ার একটা অভ্যাস ছিল তার। আমি বঙ্গবন্ধুর বাড়িতেও গেছি। যেতে হয়েছে। সকাল বেলা বঙ্গবন্ধু বলতেন তুমি আমার ওখানে এসো। তো গেছি। বেগম মুজিব তো মাতৃরূপী ছিলেন। গেলেই বলতেন, 'আপনারা আসেন খান।' অনেক সময় মাফ চাইতে হতো। মধ্যবিত্ত খাবার। বাড়ির পরিবেশ একেবারেই ঘরোয়া। আমার-আপনার বাড়িতে যা খাই সেখানেও তাই খাওয়া হতো।

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়: বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে কি এসি ছিল?

তোয়াব খান: এয়ারকন্ডিশনার আমি দেখিনি। তো যা হোক, আগের কথায় ফেরা যাক। গণভবনে গেলাম। তিনি বললেন, কোথায় ছিলে তুমি? ইলেকশন হয়ে গেছে। এখন তো তোমাকে যোগ দিতে হবে। আমার কাজ করতে হবে। এই কাজগুলো তোমাকে করতে হবে। কাজগুলো কী সেটা আমি পরে জেনেছি। বললেন, এখনই রফিকউল্লার কাছে গিয়ে যে কাগজপত্রগুলো সাইন করা দরকার, সাইন করো, তারপরে আসো। আমি খুব সাধারণভাবে কাজে যোগ দিলাম, মে মাসে। তারপর থেকে আমাকে বঙ্গবন্ধু বললেন, তিনি একটা আত্মজীবনী তৈরি করবেন। দুনিয়ার সব রাজনৈতিক নেতা এই আত্মজীবনী তৈরি করেন, তখন এটা তারা ডিকটেশন দিয়ে যান। এগুলো চেক করা। ট্রান্সক্রাইব করা। এডিট করা। এ হলো দুনিয়ার সর্বত্রই রীতি। আমাকে বঙ্গবন্ধু প্রথমত ডেকেছিলেন এ জন্য। আমি তো সেখানে যোগ দিলাম। এ সময় বঙ্গবন্ধু জুলিও কুরি শান্তিপদক পেয়েছেন। তিনি একটি বক্তৃতা দেবেন। আমাকে বললেন বক্তৃতা লিখে ফেলো। আমার কাজটা তো অন্য। অথচ তিনি বললেন, বক্তৃতাটা তুমিই লিখে দেবে। বক্তৃতা লিখে দিলাম। বঙ্গবন্ধু আমাকে বললেন, তুমি যদি আগে আসতে, তাহলে আমার অনেক কাজ বেঁচে যেত। ঝামেলা থেকে বেঁচে যেতাম। তোমাকে এখানে নিয়ে আসার জন্য যে ঘটনাগুলো ঘটল সেটাও ঘটত না।

বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা লিখেছি। একটু সংকোচের মধ্যে ছিলাম। সবেমাত্র যোগ দিয়েছি। আমিনুল হক বাদশাকে বললাম, তুমি এটা নিয়ে যাও। বাদশা নিয়ে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে ফেরত এসে বলল, আপনি নিয়ে যান। আমি নিয়ে গেলাম। আমাকে বললেন, এর পর থেকে তুমিই নিয়ে আসবে। অন্য কাউকে দেবে না। ওই যে বললেন, তুমি এখন থেকে নিয়ে আসবে। কোনো অনুষ্ঠান হলে ডাক পড়ত।

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়: আপনি যে বক্তৃতাটা লিখলেন। ওটা দেখে তিনি কী বললেন?

তোয়াব খান: বললেন, আমাকে পড়ে শোনাও। ওখানে তখন নিজে কিছু যোগ করলেন। বঙ্গবন্ধু বললেন, শুরু থেকেই বিশ্বশান্তির প্রতি আমাদের নিষ্ঠা এবং আস্থা। শান্তি ছাড়া আমাদের দেশ মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না।

এই বক্তৃতাটা শেষ হওয়ার পর আমার ঘাড়ে এসে পড়ল প্রেসের কাজ। হাসেম সাহেব সত্যিকার অর্থে বিদেশে চলে যাওয়ার চিন্তা করেছেন। একদিন বঙ্গবন্ধু সিঁড়ি বেয়ে নামছিলেন। তখন তিনি বঙ্গবন্ধুকে বললেন, 'বঙ্গবন্ধু আমার পদের কী হলো?' বঙ্গবন্ধু বললেন, রিপ্লেসমেন্ট দাও। আমাকে বললেন, তোমাকে এখানে যোগ দিতে হবে। তার দুই-তিন দিন পর হাসেম সাহেব চলে গেলেন। একদিন দুপুরে বসলাম বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আত্মজীবনী নিয়ে। তখন দেখলাম, আত্মজীবনীর কাজের প্রতি সুবিচার করা হচ্ছে না। একদিকে প্রেসের দায়িত্ব; এটা প্রায় সার্বক্ষণিক কাজ। আবার দুপুরবেলা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে, এটা কোনোভাবেই জাস্টিফাই করা যাচ্ছে না। আমি তখন বললাম, বাইরে থেকে বিশ্বস্ত কোনো সাংবাদিক এনে কাজটা করা যেতে পারে। আমি গাফ্‌ফার সাহেবের নাম প্রস্তাব করলাম। তখন তিনি বললেন, তুমি নিয়ে আসো তাহলে। তো গাফ্‌ফার চৌধুরীকে নিয়ে এলাম সেদিন। তখন তার দ্বারা কাজ শুরু করলাম। বঙ্গবন্ধু যখন দুপুরের কাজ শেষ করে লাঞ্চ করে বিশ্রামে যান তখন কাজ করা হতো। রেস্ট তো হতো না। কোনো না কোনো লোক আসত। তখন এটা বন্ধ করে দিয়ে কাজটা করা হতো। তিনি বলে যেতেন। টেপরেকর্ডার দিয়ে রেকর্ড করা হতো।

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়: এই টেপ কি আর পরে পাওয়া গেছে?

তোয়াব খান: এটাও একটা ঘটনা। ১৫ আগস্টের পরে আমাদের তো ঢুকতে দিত না সেখানে। আমরা নিষিদ্ধ ছিলাম। আবুল খায়ের সাহেবকে একদিন জিজ্ঞাসা করলাম, টেপ রেকর্ডারের খবর কী। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনিও খুব উদগ্রীব ছিলেন টেপটা খুঁজে বের করার জন্য। তিনিও খুঁজে পাননি। আমার রুমেই ছিল। মাহবুব তালুকদারকে দিয়েছিলাম। তখন তিনি আমার ডেপুটি ছিলেন। তিনিও সেটা পাননি। সম্ভবত ঘাতকরাই সেটা সরিয়েছে। ট্রান্সক্রাইব করা ছিল। টাইপ করা ছিল। কিছুই পাওয়া যাইনি।

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়: এই ব্যক্তিগত সম্পর্কের কিছু স্মৃতি যদি আমাদের বলেন?

তোয়াব খান: ব্যক্তিগত সম্পর্কের অনেক বিষয় আছে। আমরা তো সরকারি চাকরিতে বহিরাগত। বহিরাগত সাংবাদিক। আর ওখানে ছিলেন ব্যুরোক্রেসির লোকজন। স্বাভাবিকভাবে আমলাতন্ত্রের একটা অনীহা থাকে বাইরের লোকের ক্ষেত্রে। এটা অস্বীকার করার কিছু নেই। তবে আমার ক্ষেত্রে হয়েছে ভিন্ন। রফিকউল্লাহ চৌধুরী ছিলেন সেক্রেটারি। তার সঙ্গে আমার আগে থেকেই পরিচয় ছিল। তিনি একসময় ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। আমাদের বন্ধু আব্দুর রহীম। সবার সঙ্গে পরিচয় ছিল। রফিকউল্লাহ চৌধুরীর কন্যাই তো এখন আমাদের জাতীয় সংসদের স্পিকার। তো রফিকউল্লাহ চৌধুরীর সঙ্গে সম্পর্ক করতে আমার কোনো বাধা হয়নি। আরেকজন ছিলেন যুগ্ম সচিব মনোয়ারুল ইসলাম। পরবর্তীকালে তিনি অ্যাডিশনাল সেক্রেটারি। তারপর আমেরিকায় গিয়েছিলেন ডক্টরেক্ট করতে। তারপর জাতিসংঘে চাকরি করেছেন। পরে আর বাংলাদেশ সরকারে যোগ দেননি। বঙ্গবন্ধুর ওপরে তার লেখা আছে। শেখ হাসিনার ওপরে তার একটা লেখা আছে। এ লোকগুলোর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ব্যক্তি পর্যায়ে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাদের প্রোটেকশন বা আশ্রয় না পেলে খুব কষ্টকর হয়ে যেত। একটা জিনিস হচ্ছে, তিনি অনুভব করতেন, আমরা যারা বাইরে থেকে আসছি, যে ইনফরমেশনগুলো পাই, জনগণের যে প্রতিফলন সেটা আমরা যেন সংগ্রহ করতে পারি। যে কারণে তার সঙ্গে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সম্পর্কটা ভালো হয়ে ওঠে। আমরা যখন জয়েন করি তখন আমাদের বেতন ছিল কম। বঙ্গবন্ধু বললেন, এত কম বেতনে চলে কীভাবে। তিনি বললেন, আমি ব্যবস্থা করছি। আমি এটা অ্যাভয়েড করেছি। এ জন্য করেছি, বঙ্গবন্ধু তো বিশাল হৃদয়ের লোক। এটা অহংকারের ব্যাপার না। এতে বঙ্গবন্ধুকে ছোট করা হবে। এভাবেই গড়ে উঠেছে সম্পর্কটা। যখন সচিবালয় পুরোনো গণভবন থেকে নতুন গণভবনে গেল, তখন গণভবনের পাশেই লালবাড়ি ছিল। সেখানেই আমার জন্য একটা বাড়ি বরাদ্দ করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু বললেন, এ তো হলো। ও তো উঠে যাবে ওখানে। আমি বাইরে থেকে যে খবরগুলো পেতাম সেটা আর পাব না। শেখ মুজিবুর রহমান শুধু প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি যেহেতু জাতির পিতা এবং ওইভাবে সরাসরি ব্যবহারটা করতেন। কিছুক্ষণ কাজের ক্ষেত্রে দেরি হয়েছে। তিনি খোঁজ করেছেন, পাননি। আমাকে বললেন, কী খবর, বলো। ব্যক্তিগত কী দরকার। কারও যদি চিকিৎসার দরকার হয় ইমিডিয়েটলি ডাক্তারকে ফোন করো। মানে ব্যক্তি পর্যায়ে তিনি খোঁজখবর নিতেন।

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়: আমি বিশেষ কোনো স্মৃতির কথা শুনতে চাচ্ছি। যেগুলো খুব ইন্টারেস্টিং।

তোয়াব খান: কাজ নিয়েই সম্পর্ক। আমার ব্যক্তিগতভাবে পলিটিশিয়ানদের সঙ্গে কাজ করার কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না, প্রধানমন্ত্রী তো দূরের কথা। খুব স্বাভাবিকভাবে আমার খুব সংকোচ ছিল, দ্বিধা ছিল। বঙ্গবন্ধু নিজে ডেকে এগুলো দূর করে দিয়েছেন। যে মুহূর্তে যেটা প্রয়োজন হবে, সরাসরি তাকে বলা। কোনো সংকোচ করার দরকার নেই। ১৯৭৪ সালে এক দিন, ওই সময় লবণের দাম বাড়ছে। তখন খিলগাঁও থাকি। বাসা থেকে জানানো হলো, কিছুক্ষণ আগে লবণ কেজিতে কিনেছি ১০ টাকা। এখন এসে বলছে ১৫ টাকা। তার ১০ মিনিট পর বলছে ২০ টাকা। আমি তখন বঙ্গবন্ধুকে গিয়ে জানালাম, 'এই হচ্ছে অবস্থা।' বঙ্গবন্ধু তখন নির্দেশ দিলেন, কে করছে, কোথায় করছে, কী অবস্থা খোঁজ নিতে। পুলিশকে পাঠালেন। ওই জায়গায় যাও। এই করো। দেখো। ব্যবস্থা নাও।

এভাবে ব্যক্তিগতভাবে যখনই বলেছি, তখনই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আর ব্যক্তি বঙ্গবন্ধু? তিনি অনেক ঠাট্টা করে, পরিহাস করে কথা বলতেন। একদিন তিনি বললেন, আমার বাড়ির গরুর শিংটা প্যাঁচানো। এমন প্যাঁচানো শিং কার আছে জানো? মহাদেবের গরুটা আছে না। তার শিংও এমন। আমি বললাম, 'মহাদেব তো মহাদেব। নীলকণ্ঠ।' গণভবনে লেকের পানিতে মাছ ছাড়া আছে। বঙ্গবন্ধুর একটা অভ্যাস ছিল, কাজ শেষ করে বিকেলে কিছুক্ষণ পায়চারি করতেন। ওই সময় তার সঙ্গে থাকতে হতো। আমরাও আগ্রহ নিয়ে থাকতাম। যদি কিছু পাওয়া যায়। আমাদের জীবনী তৈরি করতে হচ্ছে। ওখানেও কাজে লাগতে পারে। বঙ্গবন্ধু ওখানে গিয়ে মাছগুলোকে খাবার দিতেন। বঙ্গবন্ধু গেলে মাছগুলো সব ওখানে হাজির হতো। আমরা অবাক হতাম, ছবি তুলতাম। তিনি লাঠিতে করে দেখাতেন, এই দেখো।

১৯৭৫ সালের মার্চ মাসের ঘটনা। বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন। গণভবনের আশপাশে যারা থাকে, তারা হঠাৎ গেছে গণভবনে, ১৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুকে ফুল দিতে। আমি জানিও না। আমি কাজ করছি। বঙ্গবন্ধু কাউকে বললেন আমাকে ডেকে নিয়ে যেতে। আমি গেলাম। একটা ছোট মেয়েকে দেখিয়ে বললেন, 'দেখো ও বলছে আমাকে চেনে।' দেখি আমার মেয়ে এষা। বললাম, ও চিনলে আমি কী করব। বঙ্গবন্ধু বললেন, জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান দেওয়াতে পছন্দ হয়েছে। বঙ্গবন্ধু বললেন, তুমি কে? ও বলছে, আপনি আমার বাবাকে চেনেন। আমাকেও চেনেন। বঙ্গবন্ধু বললেন, কে তোমার বাবা। বলতে চায়নি। দুই তিনবার বলার পর বলেছে।

তুমি এখানে আসোনি কেন। আমি বললাম, ওরা এসেছে ওদের মতো করে। আমি এসেছি আমার মতো। যে কেউ যখন গেছে সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধু আর প্রধানমন্ত্রী থাকেননি। তখন ব্যক্তি মুজিব সবার ওপরে।

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়: বাকশাল হওয়ার পরও আপনি তো কাছ থেকে দেখেছেন বঙ্গবন্ধুকে।

তোয়াব খান: বাকশাল হওয়ার পরও সবাই একই পদে ছিলেন। বঙ্গবন্ধু যখন প্রধানমন্ত্রী তখন আমার পদটি ছিল জয়েন্ট সেক্রেটারি পদ। বঙ্গবন্ধু যখন রাষ্ট্রপতি হলেন তখন এই পদটার নাম হলো প্রেস সেক্রেটারি। আমার থেকেই শুরু এ পদ। বঙ্গবন্ধুই এ পদ তৈরি করে গেছেন। গার্ড রেজিমেন্টের পোশাক কী হবে সেটা বঙ্গবন্ধু নিজেই ঠিক করেছেন। রাষ্ট্রপতির পতাকা হবে মেরুন কালারের, বঙ্গবন্ধু ঠিক করে গেছেন।

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়: বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধীর সম্পর্কের বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখেন?

তোয়াব খান: ইন্দিরা গান্ধী মনে করতেন বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলাদেশের নয়, এ অঞ্চলের বিশিষ্ট নেতা হিসেবে। কিছু কিছু লেখা আছে। কবীর চৌধুরীর লেখা আছে। আবার সালাহউদ্দিন সাহেবের লেখা আছে। আমরা নিজেরা বাইরে থেকে সম্পাদক হিসেবে দেখেছি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তার সম্পর্ক। বঙ্গবন্ধু একটা কথা বললে ইন্দিরা গান্ধী সেটা মেনে নিতেন। এ নিয়ে এম আর আখতার মুকুলের লেখা আছে।

বঙ্গবন্ধু কলকাতায় গেলেন প্রথম ভিজিটে। ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২। ডিজি ইনফরমেশন ওখানে গেছেন। তিনি বললেন, কী হবে। কোনো এজেন্ডা নেই আলোচনার। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, দেখো বাংলাদেশে যদি বিদেশি সৈন্য থাকে তাহলে বিদেশি রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশ স্বাধীন কিনা এটা নিয়ে সংকোচ প্রকাশ করবে। তাই আমার প্রথম কাজ হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করে নেওয়া। তখন মুকুল সাহেব বঙ্গবন্ধুকে বললেন, তাহলে কী আলোচনা হবে?

বঙ্গবন্ধু বলেন, দেখো, প্রথম কথা হচ্ছে আমার স্বাধীন দেশে যদি বিদেশি কোনো সৈন্য থাকে, তাহলে অন্য কোনো দেশ এটাকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে দ্বিধাবোধ করবে। আমি মিসেস গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকে এটাই তুলব, ভারতীয় সৈন্য কবে প্রত্যাহার করা হবে। ঘটনাক্রমে যখন ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে প্রথম বৈঠকে বসলেন, বঙ্গবন্ধু বললেন, 'এদেশ তো আপনাদের জন্য স্বাধীন হয়েছে। আপনারা অনেক উপকার করেছেন। এখন আপনাদের সৈন্য প্রত্যাহার করুন।'

ইন্দিরা গান্ধী প্রথমে বলেছিলেন, 'দেখুন, আমাদের তো কোনো সৈন্য রাখার ইচ্ছা নেই। তবে আমি যতদূর শুনেছি, বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন সরকারের অনুকূলে নয়। আরও কিছুদিন রাখলে কেমন হয়?'

বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, 'বাংলাদেশ স্বাধীন করার জন্য ত্রিশ লক্ষ লোক জীবন দিয়েছে। যদি আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য যদি আরও কয়েক লক্ষ লোককে জীবন দিতে হয়, সেটাতেও রাজি আছি আমরা।'

তখন ইন্দিরা গান্ধী বললেন, 'ঠিক আছে। আমাদের কোনো আপত্তি নেই। আমরা তাহলে ১৭ মার্চ সৈন্য প্রত্যাহার করে নেব।' এটা বললেন ১৯৭২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতায়। বঙ্গবন্ধু বললেন, '১৭ মার্চ কেন?' ইন্দিরা গান্ধী বললেন, 'কারণ ১৭ মার্চ আপনার জন্মদিন।'

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আপনি কোথায় ছিলেন? বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শেষ কখন দেখা হয়েছিল?

তোয়াব খান: ১৫ আগস্ট আমি ছিলাম গণভবনের পাশে আমার বাড়িতে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল ১৪ আগস্ট রাতের বেলা। ১৪ আগস্ট রাতের বেলা গণ্ডগোল হলো। আমি বসে আছি। হঠাৎ টেলিফোন এলো। একটা ভারতীয় হেলিকপ্টার বাংলাদেশের আকাশ দিয়ে যাচ্ছিল। সেটা ফেনীতে ক্রাশ করে। তখন রটে যায় উইদাউট পারমিশনে সেটা যাচ্ছিল। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী সেটিকে গুলি করে নামিয়েছে। এটা মিথ্যা কথা। হেলিকপ্টারটা দুর্ঘটনায় পড়েছে। তখন তো দেশে ইমার্জেন্সি চলছে। রেডিও-টেলিভিশন থেকে সবাই জানতে চাচ্ছে ঘটনাটা কী। আমি তখন চিন্তা করছি কাকে ধরা যায়। যেহেতু হেলিকপ্টার বিমানবাহিনীর। আমি প্রথমে আমার বন্ধু খাদেমুল বাশার, উপপ্রধান বিমানবাহিনী, তাকে ফোন করলাম, জিজ্ঞেস করলাম তুই কিছু জানিস কিনা। সে বলল, এই ঘটনা। তারপর খন্দকার সাহেবকে ফোন করলাম। তখন তিনি বিমানবাহিনীর প্রধান। তিনিও বললেন, 'ঘটনা এই। যেটা রটেছে সেটা ঘটনা না। '

তখন আমি বঙ্গবন্ধুকে বললাম। এ ঘটনা ঘটেছে। তিনি বললেন, 'আমি খবর পেয়েছি।' এরই মধ্যে খবরের কাগজ থেকে এগুলো জানতে চাচ্ছে। টিভি জানতে চাচ্ছে এ নিউজটা আমরা দেব কিনা।

বঙ্গবন্ধু বললেন, নিউজ চাপা দিলে গুজব বাড়ে। গুজবকে মারতে হলে সত্যি ঘটনাটা জানানো উচিত। তুমি সত্যি ঘটনাটা দাও। বিকেল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে এগুলো ঘটতে থাকে। ইন্ডিয়ান হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার যিনি ছিলেন, তিনি বললেন, খবরটা রেডিও-টেলিভিশনে দিচ্ছেন কিনা?'

বললাম, আমাদের সিদ্ধান্ত হচ্ছে এটা রেডিও-টেলিভিশনে যাবে। তিনি বললেন, কোন পর্যায়ের সিদ্ধান্ত?

তখন আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে। আমি প্রেস সেক্রেটারি। আমি বললাম সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত। তিনি বললেন, আচ্ছা, ঠিক আছে। তখন তিনি মেনে নিলেন। ভারতেও তখন ইমার্জেন্সি চলছে। ওখানে সেন্সরশিপ আছে। কিছুক্ষণের মধ্যে তাহের উদ্দিন ঠাকুর আমাকে ফোন করলেন, খবরটা কী হচ্ছে। দিচ্ছেন নাকি।

আমি বললাম, আপনার মন্ত্রণালয়ে এটা প্রচার করা হয়েছে। আপনি শোনেননি।

এই হচ্ছে সন্ধ্যার ঘটনা। তারপর সন্ধ্যায় আবার আমাদের ওখানে তিনজন- মনোয়ার হোসেন, জয়েন্ট সেক্রেটারি; ফরাসউদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন; মসিউর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা- এই তিনজন বিদেশে উচ্চতর পড়াশোনার জন্য যাবেন। তাদের জন্য দশ টাকা করে চাঁদা দিয়ে একটা ডিনারের ব্যবস্থা করেছি সেদিন রাতের বেলা। আমার মনে আছে, আমি বসে কাজ করছিলাম। বঙ্গবন্ধু পরের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন। বিশেষ কনভেনশনে বক্তৃতা দেবেন। ওই বক্তৃতা বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন এক্সটেম্পোর দেবেন। কারণ, বঙ্গবন্ধুর কতকগুলো স্পর্শকাতর বিষয় ছিল। যেমন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একসময় বঙ্গবন্ধুকে বহিস্কার করেছিল। সেই বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নিয়ে তারা বঙ্গবন্ধুকে একটা ডক্টরেক্ট ডিগ্রি দেবে। সেখানে বঙ্গবন্ধু বক্তৃতা করবেন। আমাকে বললেন, তোমার যে ডাটা ইনফরমেশন যোগ করার দরকার হয়, এটা মোটা কার্ড পেপারে লিখে আমাকে দেবে। তখন শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন মোজাফফর হোসেন চৌধুরী, মোকাম্মেল সাহেব তখন ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা সচিব। তাদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে একটা কার্ডে বাসায় বসে লিখছি। রাত তখন প্রায় ১২টা হবে। হঠাৎ লাল টেলিফোনে বঙ্গবন্ধু ফোন করলেন, কাল সকালে তুমি তাড়াতাড়ি আমার বাসায় চলে আসবা। আর কার্ড নিয়ে আসবা। মোটা মোটা অক্ষরে। আমি এক্সটেম্পোর বক্তৃতা করব। প্রয়োজনে এই কথাগুলো বলব।

তখন রাত ১২টা। বললাম, আমি ওই কাজই করছি। তিনি বললেন, ঠিক আছে। কাল সকালে তাড়াতাড়ি আসো। এর মধ্যে ভোর হয়েছে। সবাই যেমন শুনেছে। আমিও গোলার আওয়াজ শুনেছি। মর্টারের আওয়াজ শুনেছি। তারপরে রেডিও অন করা হয়েছে। সব জায়গায় কান্নার রোল পড়েছে। সব জায়গায় পড়েছে। খোঁজখবর নিচ্ছি, কোথায় কী অবস্থা। আমাদের সেক্রেটারি কিছু জানেন কিনা। এনএসআই প্রধান জানেন কিনা। তাদের কাছ থেকে যেটা শুনেছি সেটা হচ্ছে, আমরাও তো শুনেছি।

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়: কর্নেল জামিল মারা গেছেন। ফরাসউদ্দিন আক্রান্ত হয়েছেন। আপনিও তো আক্রান্ত হয়েছিলেন। আরেকবার আক্রান্তের মুখে ছিলেন। এটা বাদ দিয়ে গেলেন কেন?

তোয়াব খান: ওটা বলিনি। ১৫ আগস্ট সকালে আমার ছোট ভাইকে নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলাম। কোনো কিছু হচ্ছে কিনা। কিছু হলে আমি সেটাতে যোগ দেব। দেখি, আর্মির ট্রাক যাচ্ছে। আমি সেটা অ্যাভয়েড করে মোহাম্মদপুরের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলাম। সেখানে বিহারিরা। তখন আমরা ওখান থেকে বেরিয়ে অন্যদিক দিয়ে বেরিয়ে যাই। ৩২ নাম্বার তো বেশ দূরে। যখন যাচ্ছিলাম আমাকে তো কেউ চিনতেও পারেনি। তারপর তারা চলে যায়। তারপর গণভবনে ১৯ কিংবা ২০ আগস্টের ঘটনা। তাহের উদ্দিন ঠাকুর বলেছিলেন, গণভবনে আসেন। তখন তো আমার বাড়িতে লাল টেলিফোন কাটা। অন্য টেলিফোনগুলো কোনোটা ধরতে পারি, পারি না। অনেকে আছে যারা আশপাশে ঘুরেছে, তারা অনেকে মন্ত্রী হয়ে গেছে। সত্যি কথা বলতে কি, এমন অনেকেই ছিলেন, প্রেস ক্লাবে গেলে কেমন করে কথা বলতেন। প্রেস ক্লাবে গেছি ১৯ তারিখের পরে। একদিন যেতে বললেন। বঙ্গভবন তো চেনা আমাদের। ওখানে পুলিশ যারা ছিল, তারা বলল সামনে দিয়ে না গিয়ে পেছন দিক দিয়ে যান। আমি ঢুকে যাচ্ছি। রাষ্ট্রপতির আসনে খন্দকার মোশতাক বসে আছেন। মিটিং শেষ হয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যে তাহের উদ্দিন ঠাকুর বের হয়ে এসে বললেন, 'উনি এখানে কেন।' কিছুক্ষণ পর দেখলাম যিনি সচিব ছিলেন, তিনি সচিবের রুমে বসে কাজ করছেন।

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়: বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সঙ্গে আপনার যোগাযোগ হতো বা দেখেছেন তাদের। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিলেন যখন। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে আপনি একুশে পদক পেয়েছেন।

তোয়াব খান: বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। তবে শেখ রেহানা, শেখ কামাল, জামাল। শেখ হাসিনার সঙ্গে আমার সেই সময় খুব একটা সাক্ষাৎ হয়নি। একটা সময় তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল ৩২ নাম্বারে। তারপরে তো চলে গেল। বঙ্গবন্ধু যখন জ্যামাইকাতে কমনওয়েলথে যান তখন শেখ হাসিনা এবং ওয়াজেদ সাহেব দুজনই জার্মানিতে ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর বিমান দিল্লি থেকে সরাসরি জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট। সেখানে ড. ওয়াজেদ দেখা করতে আসেন। আমি ওই ফ্লাইটে ছিলাম।

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়: বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে সাংবাদিকতা ব্যাহত হতো?

তোয়াব খান: বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে থাকা কাজের সূত্রে। আমার ব্যক্তিগত পেশা তো সাংবাদিকতা। সাংবাদিকতার সত্যিকারের যে দর্শন, সেটাই আমি মেইনটেইন করার চেষ্টা করেছি। আমার যেটা মনে হতো এবং এখনও মনে হয়, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাংবাদিকদের সম্পর্কটা ছিল ব্যক্তি পর্যায়ের। এ রকম সম্পর্ক যদি আমাদের সব রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে গড়ে উঠত, তাহলে আজ মিডিয়ার কোনো প্রবলেম হওয়ার কথা না।

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়: বঙ্গবন্ধু ব্যক্তিগতভাবে আপনাকে কোনো কিছু উপহার দিয়েছেন?

তোয়াব খান: ওই সময়ে আমি অটোগ্রাফ নিয়েছি অনেক। তার অটোগ্রাফ নিয়ে বিদেশে ছবি পাঠিয়েছি। দেখেছি বিদেশি অনেকেই বঙ্গবন্ধুর অটোগ্রাফ নিয়েছে।

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়: বঙ্গবন্ধুর কোন জিনিসটি আপনি মনে করেন যে, এখনকার সময়ে অবশ্যই প্রয়োজনীয় এবং একান্ত দরকার।

তোয়াব খান: আমি কতকগুলো জিনিস মনে করি। এক নাম্বার বঙ্গবন্ধুর যে নীতি-আদর্শ ছিল সেগুলো বাস্তবায়ন করা দরকার। কিছুু হচ্ছে। আরও দরকার। এক্ষেত্রে নিজে বোঝার চেষ্টা করেছি। সারা দুনিয়াতে যেভাবে ধর্মনিরপেক্ষতা বোঝায়। সেটা কিন্তু বঙ্গবন্ধুর কাছে না। বঙ্গবন্ধু মনে করতেন ধর্মের ক্ষেত্রে সব ধর্মের সমান অধিকার। এটাই হলো ধর্মনিরপেক্ষতা। আরেকটা মনে করতেন। সমাজতন্ত্র। এটা কী? আজকে ধরুন মার্ক্সবাদী সমাজতন্ত্র আছে। পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্র আছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর কাছে সমাজতন্ত্র কী ছিল? এদেশের মানুষ গরিব। তাদের মুখে হাসি ফোটানোটাই সমাজতন্ত্র। বঙ্গবন্ধু বলতেন, এদের সমাজতন্ত্র খুব কঠিন না। এখানে সমাজতন্ত্র হবে যারা গরিব তাদের একটা পর্যায়ে নিয়ে আসা। শোষিত মানুষের সমাজতন্ত্র।

বঙ্গবন্ধু যখন আলজেরিয়ায় যান। সারা দুনিয়ায় তখন একদিকে হচ্ছে ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ। সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড সমাজতান্ত্রিক দেশ। এই দুই ভাগে ভাগ। তখন দুই ভাগের বাইরে যারা, যেমন জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন, তারা আলাদা। একদল একটা স্লোগান তুললেন থার্ড ওয়ার্ল্ড। একসময় সেটা খুব দৃষ্টি আকর্ষণ করল। বঙ্গবন্ধু যখন গেলেন তখন প্রশ্ন জাগল, আমরা কি থার্ড ওয়ার্ল্ডের লোক, নাকি জোটনিরপেক্ষ। বঙ্গবন্ধু তখন ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড কী, সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড কী- এসব মৌলিক প্রশ্নে না গিয়ে বললেন, 'দুনিয়ার সবাই শোষিত। আমরা সব সময় শোষিতের দলে।' আমরা এখনও শোষিতের পক্ষে কাজ করছি।

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়: বঙ্গবন্ধু তো উদার চরিত্রের মানুষ ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সময় আমরা অনেক বড় মাপের রাজনীতিবিদ দেখেছি, যারা বিরোধী দলে ছিলেন। তাদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আচরণ কেমন ছিল। অন্য দলের নেতাদের সঙ্গে তার আচরণ কেমন ছিল?

তোয়াব খান: ছাত্রাবস্থা থেকে ব্রিটিশবিরোধী এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন করে আসছেন এবং বাংলাদেশের যে রাজনীতি, যার মূল উপাদান মূলত একটা শব্দ, গণতন্ত্র। এই গণতন্ত্রটা পার্লামেন্টের ভিত্তিতে। যারা এই গণতন্ত্রের সংশোধনীতে ছিলেন, যারা এই রাজনীতিতে ছিলেন, দেশ ভাগের অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের আগে থেকেই তাদের বিষয়ে জানতেন। ভালো পরিচয় ছিল। তাদের মধ্যে একজন রাজাকার বলে পরিচিত শাহ আজিজ। জাতিসংঘে গিয়েছিলেন পাকিস্তানের পক্ষে দালালি করতে। শাহ আজিজ রাজাকার হিসেবে জেলে ছিলেন। মওলানা ভাসানীকে তিনি শ্রদ্ধা করতেন। মওলানা ভাসানীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সম্পর্ক খুব ভালো ছিল। বাকশাল যখন হলো আমার জানা মতে, তখন বঙ্গবন্ধু তিন রাত ভাসানীর সঙ্গে দেখা করেছেন। নিশ্চয় আলোচনা হয়েছে।

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়: বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে শেষ কথা কী বলবেন?

তোয়াব খান: তিনি তো শুধু রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী নন। তিনি সবার জন্য। আরও ওপরে, তিনি জাতির পিতা। এ হিসেবে সবাই একটা ছত্রছায়া পেয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে গর্বের বিষয়, আমি তার ছায়ায় থেকেছি। মুশকিল হচ্ছে মহানায়ক বা মহামানবদের সঙ্গে কাজে থাকা অবস্থায় তাদের বিষয়টা বোঝা যায় না। যখন তার অভাব হয়, তখন বোঝা যায় তার গুরুত্ব। যারা মহামানব তারা নিজের কর্মে এতই ব্যস্ত থাকেন, তারা নিজেরাও বোঝেন না। তাদের সবসময় কাজ করতে হয়। যখনই ছায়াটা সরে যায় তখনই অভাবটা বোঝা যায়।