সমাজ

আইন স্বাগত, প্রয়োগের পরিস্থিতি যাতে না হয়

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২০     আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ড. মাহবুবা নাসরীন

চলতি বছরের মার্চ মাসে দেশে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা। করোনার সংক্রমণ রোধে কিছুদিনের জন্য থেমে যায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। এতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বন্ধ হয়ে যায় শিক্ষাসহ অনেক কার্যক্রম। ফলে অনেক মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়ে আয়বঞ্চিত হয়। করোনাভীতি নিয়ে এবং কর্মসংস্থান হারিয়ে অসংখ্য মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যায়। করোনা সংক্রমণ কমাতে মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও সচেতন করে তোলার জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়। সংগত কারণেই প্রত্যাশা ছিল, করোনাকালে অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষরা মৌলিক চাহিদা পূরণেই ব্যস্ত থাকবে। আমরা মনে করেছিলাম, স্বাভাবিক সময়ে যে অপরাধ কর্মগুলো সংঘটিত হয়, করোনাকালে সেগুলো কমে আসবে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে নারী নির্যাতন ও সহিংসতার কিছু ঘটনা জনমনে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। করোনাকালে ধর্ষণ, নারী নির্যাতন ও সহিংসতা আগের তুলনায় বেড়েছে।

এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে সচেতন সমাজ। জাতীয় সংসদেও এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার কারণ, বাংলাদেশে ধর্ষণের শাস্তি, প্রচলিত আইন, বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রতা এবং বিভিন্ন দেশে ধর্ষণের শাস্তি কেমন এ ধরনের বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় উঠে আসে। একই সঙ্গে অ্যাসিড নিক্ষেপের অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি ও এর সুফলের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। আমরা দেখেছি, কঠোর আইনের কারণে অ্যাসিড নিক্ষেপের হার কমে এসেছে। অনেক দেশেই ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়ে থাকে। সমসাময়িককালের ঘটনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন দেশে ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের বিষয়টি ও অ্যাসিড নিক্ষেপের অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তির বিষয়টি সামনে এনে বাংলাদেশেও ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার দাবি জানায় অনেকেই। অবশ্য মানবাধিকার সংস্থাগুলো মৃত্যুদণ্ডের ব্যাপারে বরাবরই আপত্তি তুলে থাকে।

এরই মধ্যে সরকার ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইন সংশোধন করেছে। এখন আবার অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, এ আইনের ফলে নারীরা আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে কিনা? আগে অপরাধীদের চিন্তা ছিল ধর্ষণ করে আইনের মুখোমুখি হলে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি হবে না। একটা সময় তারা ছাড়া পাবে। তারা আরও চিন্তা করত, ভুক্তভোগী দুর্বল, তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে আইনের আশ্রয় নেওয়া থেকে বিরত রাখা যাবে। ধর্ষণের এমন অনেক ঘটনা অতীতে ঘটেছে, যেসব ঘটনায় কারও বিচার হয়নি। ধর্ষকরা জানে, কাউকে হত্যা করলে তাদের মৃত্যুদণ্ড হবে। প্রাণের মায়া থেকে তারা ধর্ষণের পর ভুক্তভোগীকে হত্যা করত না। যদি প্রাণের মায়ার কারণে তারা হত্যাকাণ্ড থেকে বিরত থেকে থাকে, তাহলে এখন যেহেতু ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হয়েছে, তাই একই কারণে তারা ধর্ষণ থেকেও বিরত থাকবে। সুতরাং এটা বলা যায়, ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড রাখার বিধান কোনোভাবেই নারীদের ক্ষতিগ্রস্ত করবে না; বরং কিছু দৃষ্টান্ত স্থাপন করা গেলে অ্যাসিড-সন্ত্রাসের মতো ধর্ষণের অপরাধও কমে আসবে।

করোনা সংক্রমণ রোধে আমরা যখন সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার কথা বলছি, মাস্ক ব্যবহারসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানাচ্ছি; যে সময়ে অসংখ্য মানুষ মানবেতর জীবন পার করছে, তখন একশ্রেণির বিকৃতমনা মেতে উঠেছে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধে। এমন প্রেক্ষাপটে ধর্ষণের অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা অনেকাংশেই অনিবার্য হয়ে পড়েছিল।


যারা নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে, তারা কিন্তু আমাদের সমাজেরই অংশ। কোনো না কোনো পরিবারে তাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। মূলত যথাযথ শিক্ষা, মূল্যবোধ, দিকনির্দেশনা ও শাসনের অভাবে তারা অপরাধী হয়ে ওঠে। সামাজিক নিয়ন্ত্রণের বাহকগুলো, অর্থাৎ পরিবার, সমাজের কাছে হয়তো তাদের জবাবদিহিও থাকে না। অপরাধ করলে শাস্তি পেতে হবে বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেপ্তার করবে- এ ধরনের মানসিকতাও তাদের নেই। এমন মানসিকতা তৈরি হওয়ার পরই তারা নারীর প্রতি সহিংস আচরণ করে। এ ছাড়া আমাদের সমাজে নারী-পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান অসমতাও অনেক ক্ষেত্রে নারীর প্রতি সহিংসতা হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এই অসমতা দূর করার জন্য এক দশক ধরে কাজ করে চলেছে বর্তমান সরকার। আমরা দেখছি, নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা শুধু বাংলাদেশেই ঘটছে না; বিশ্বব্যাপী এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। করোনাকালে তা আরও বেড়েছে। ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোতেও লকডাউন অবস্থায় নারীর প্রতি 'ডমিস্টিক ভায়োলেন্স' বেড়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বব্যাপী প্রতি তিনজন নারীর একজন কোনো না কোনোভাবে যৌন হয়রানির শিকার হয়। এই নারীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে গৃহের মধ্যে অথবা গৃহের কাছাকাছি কাছের মানুষের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়। নারীর গৃহে নির্যাতনের খবরগুলো তেমন জানা যায় না, আমরা কেবল বাইরের ঘটনাগুলো জানতে পারি।

বাংলাদেশ আর্থসামাজিক অগ্রগতির দিক থেকে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেকটা এগিয়ে। আগামী দিনে আরও এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আমরা দেখছি। কিন্তু কিছু বিষয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে মারাত্মকভাবে। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো নারীর প্রতি সহিংসতা। ঘরে-বাইরে উভয় ক্ষেত্রেই নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ করতে হবে। বিশেষ করে বাইরের ঘটনাগুলো বন্ধে আমাদের সামাজিক সুরক্ষা আরও জোরদার করতে হবে। নারী-পুরুষ সমতা, নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিশ্চিতে আমাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

আমি মনে করি, বাংলাদেশে সংবেদনশীল পুরুষের সংখ্যাও কম নয়। এই হার আরও বাড়াতে অনেক কাজ করার আছে। এ ক্ষেত্রে কিশোর বয়স থেকে তাদের দিকে নজর দিতে হবে। তাদের মেধা ও মননে যেন নারীর প্রতি সম্মানের বিষয়টি গেঁথে যায়, সেই মূল্যবোধ শিক্ষা দিতে হবে কিশোর বয়সেই। তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ ব্যবহারের মাধ্যমে তরুণ-কিশোররা সহিংস হয়ে উঠতে পারে- সেদিকেও আমাদের নজর রাখতে হবে।

এও স্বীকার করতে হবে, দেশে তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশের ফলে অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়েছে। আমরা দেখছি, ধর্ষণের মামলা হলে অভিযুক্তরা দ্রুত গ্রেপ্তার হচ্ছে এবং কিছু কিছু মামলার রায়ও হচ্ছে। সরকার কঠোর আইন করেছে। এখন এ আইনের ব্যাপারে সকলকে সচেতন করতে হবে। আমরা চাইব, যাতে এ আইনের প্রয়োগ করতে না হয়। সবাই যেন সহিংস ঘটনা থেকে বিরত হয়ে নারীকে সম্মান ও সমতার চোখে দেখে।

পরিচালক ও অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়