বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি

ভাবিয়া করিও কাজ

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২০     আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয়

করোনা সতর্কতায় দেশের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমে যে স্থবিরতা স্পষ্ট, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত সেখানে নতুন গতি ফেরাবে বলেই আমরা মনে করি। শনিবার উপাচার্যদের সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদের ভার্চুয়াল বৈঠকে অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়ার পক্ষে উপাচার্যদের মত আমরা সতর্কতার সঙ্গে স্বাগত জানাই। এর মাধ্যমে ভাইরাস থেকে সুরক্ষা কিংবা অনলাইন কার্যক্রমে প্রশাসনের দক্ষতা প্রমাণ হবে বটে। তবে শিক্ষার্থীদের সক্ষমতাও বিবেচনা করা জরুরি। এটা সত্য, করোনা দুর্যোগের এ সময়ে অনলাইন শিক্ষা কিংবা পরীক্ষা কার্যক্রম অনেকের ক্ষেত্রে অনেকটাই স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। তারপরও অস্বীকার করার উপায় নেই, নানা সীমাবদ্ধতার কারণে শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য অংশ এখনও ভার্চুয়াল জগতের বাইরে। অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষা নিলে তারা কী করবে? কয়েক বছর ধরে আমরা দেখছি, উচ্চশিক্ষায় ভর্তি কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের অনলাইনেই আবেদন করতে হয়। পরীক্ষার আসন বিন্যাস, ফল ও নানা বিষয় অনলাইনেই শিক্ষার্থীরা জানতে পারছে। সেদিক থেকে শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় উভয়ের প্রাথমিক অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে কাজে দেবে। তবে শিক্ষার্থীরা আগে হয়তো অন্যের সহায়তায় ভর্তি ফরম পূরণ করতে পারত। এখন শিক্ষার্থীকেই সরাসরি ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে বলে তাকে ল্যাপটপ বা ডেস্কটপে বসতে হবে। অথচ অনেক শিক্ষার্থীরই প্রযুক্তির এসব সুবিধা নেই। এমনিতেই বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত অসচ্ছলদের তথ্য চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা দেখেছি, দেশের সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত ৩৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৪২ হাজার শিক্ষার্থীর অনলাইনে ক্লাস করার মতো প্রয়োজনীয় ডিভাইস নেই কিংবা ইন্টারনেট খরচ চালানোর মতো সুযোগ নেই। যার গড় হার প্রায় ১৪ শতাংশ। এটি অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত অনলাইন কার্যক্রমের জন্য। সেদিক থেকে এক দিনের অনলাইন পরীক্ষার জন্য শিক্ষার্থীরা হয়তো পরিচিত আত্মীয়স্বজন বা অন্য কারও ডিভাইস ব্যবহার করতে পারে। তারপরও প্রশাসনকে বিকল্প হিসেবে স্মার্টফোনেও ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে বহুনির্বাচনী প্রশ্নেই পরীক্ষা নিতে হবে। তাতে লিখিত প্রশ্নে পরীক্ষা নিতে না পারলে মেধা যাচাইয়ের দিক থেকে একটা অসম্পূর্ণতা থেকেই যাচ্ছে।

একদিকে এবার যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেবে তাদের উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষার বদলে মূল্যায়ন হচ্ছে মাধ্যমিক ও অষ্টম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষার ফলের ওপর। তার ওপর যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা অনলাইনে নেওয়ার কারণে যথার্থ প্রশ্ন করা না যায়, তাতে মেধার যথাযথ মূল্যায়ন নাও হতে পারে। দুই 'মন্দের ভালো' নিয়ে উচ্চশিক্ষায় যাত্রা কতটা কাঙ্ক্ষিত হবে? তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির সময় ইন্টারনেটের গতি, পরীক্ষাকালীন বিদ্যুতের নিশ্চয়তাসহ অপরাপর বিষয়েরই-বা নিশ্চয়তা কোথায়। সেদিক থেকে অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও ভাবার প্রয়োজন। আমরা জানি, ইউজিসিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। তবে আমরা মনে করি, এবার যেহেতু গুচ্ছভিত্তিক ও সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা হচ্ছে, সেহেতু সরাসরি পরীক্ষা হওয়াই উত্তম হতে পারে। সে ক্ষেত্রে চারটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় তথা ঢাকা, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ও সবার সঙ্গে এ পদ্ধতিতে পরীক্ষায় আসুক। তা না হলে দেখা যাবে, কেউ অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষা নিচ্ছে, কেউ আবার সরাসরি নিচ্ছে- তাতে শিক্ষার্থীর দুর্ভোগ যেমন বাড়বে, তেমনি করোনার ঝুঁকিও কমবে না।

সবাই একই পদ্ধতিতে এসে যথাসম্ভব স্বাস্থ্যবিধি, শারীরিক দূরত্ব ও সতর্কতা বজায় রেখে সরাসরি পরীক্ষা নিলে পরীক্ষার্থীর জন্য সাশ্রয়ী ও সুবিধাজনক হবে। এ ক্ষেত্রে এবারের জন্য উচ্চ মাধ্যমিক বা তার আগের ফল বিবেচনায় না নিয়ে কেবল ভর্তি পরীক্ষার মূল্যায়নের ওপর উচ্চশিক্ষায় ভর্তির মেধা তালিকা প্রণয়ন করা যেতে পারে। এবারের বিকল্প পদ্ধতিতে উচ্চ মাধ্যমিকের ফল জানতে ডিসেম্বর পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। আমরা চাই ইউজিসিসহ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভেবেচিন্তেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুক। সবক্ষেত্রে যখন আমরা 'নতুন স্বাভাবিকে'র চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছি, শিক্ষার স্বার্থেও প্রয়োজনে তা গ্রহণ করতেই হবে।