জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও একবিংশ শতাব্দীর শিক্ষা

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২০     আপডেট: ২০ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

জাকারিয়া খান

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫তম বিশ্ববিদ্যালয় দিবস আজ। ২০০৫ সালে জগন্নাথ কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হয়। তুমুল প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্যতার প্রমাণ রেখেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্পণ করেন দেশসেরা মেধাবীরা। অথচ আবাসন সমস্যার কারণে অনেকে লেখাপড়ায় 'দাড়ি' টানতে বাধ্য হন। দেশের অন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো এখানে নেই কোনো আবাসিক হল বা হোস্টেল! ক্যাম্পাসের স্থান স্বল্পতার দরুন রয়েছে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার অপ্রতুলতা। অথচ ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যাপীঠের রয়েছে দেড়শ বছরের এক সমৃদ্ধ ইতিহাস। জমিদার কিশোরীলাল চৌধুরী এবং শিক্ষানুরাগী দীননাথ সেন, প্রভাতীচরণ রায়, অনাথবন্ধু মল্লিক প্রমুখের আনুকূল্যে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত জগন্নাথ কলেজ একসময় বাংলাদেশের সেরা বিদ্যাপীঠের মর্যাদা লাভ করেছিল। ১৮৫৮ সালে বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা ব্রাহ্ম স্কুল থেকে যাত্রার পর প্রথমে জগন্নাথ স্কুল এবং পরে 'সেকেন্ড গ্রেড' কলেজ; আরও পরে 'ফার্স্ট গ্রেড' কলেজে রূপান্তরিত হয় প্রতিষ্ঠানটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর জগন্নাথ কলেজের ইন্টারমিডিয়েট কলেজে অবনমন এবং ২৮ বছর পর আবার ডিগ্রি কোর্স চালু- সবই হয়েছে সময়ের চাহিদার নিরিখে। ১৯৬৮ সালে কলেজটি সরকারিকরণের পর ১৯৭৫ সালে চালু হয়েছিল অনার্স-মাস্টার্স পর্যায়ের অধ্যয়ন। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন এ প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অবদান রয়েছে।

স্বাধীনতার পর শিক্ষায় মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত বাংলাদেশ এগিয়ে যাওয়ার ফলে গত শতকের শেষের দিকে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তুমুল প্রতিযোগিতা পরিলক্ষিত হয়ে আসছিল। বিপুলসংখ্যক ছাত্র-ছাত্রীর উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য তখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজগুলোই শেষ ভরসা। এমন সময়ে প্রায় ত্রিশ হাজার শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার কেন্দ্র জগন্নাথ কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণার মধ্য দিয়ে নামটাই শুধু পাল্টে দেওয়া হয়েছিল। অবকাঠামোগত কিংবা একাডেমিক কোনো প্রস্তুতিই ছিল না কলেজটির। তবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেমে থাকেনি; থেমে নেই প্রতিষ্ঠানটির মেধাবী শিক্ষক-শিক্ষার্থী। সীমিত সাধ্যের মধ্যেই এগিয়ে চলেছে একাডেমিক ও সহশিক্ষা কার্যক্রম। বর্তমানে ছয়টি অনুষদের অধীনে ৩৬টি বিভাগ, দুটি ইনস্টিটিউট; প্রায় সাতশ শিক্ষক এবং বিশ হাজারের মতো শিক্ষার্থীর প্রাণের স্পন্দন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। ১৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে উদ্বোধন হবে বিশ্ববিদ্যালয়টির একমাত্র আবাসিক হল 'বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল'।

২০০৯, ২০১১, ২০১৪ ও ২০১৬ সালে একাধিকবার আবাসিক হলের দাবিতে আন্দোলন করেছেন শিক্ষার্থীরা। এসব আন্দোলন-সংগ্রাম এবং সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সদিচ্ছায় ষোলোতলা হলটির নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয়েছে। পুরান ঢাকার এই ঘিঞ্জি পরিবেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আবাসিক হল নির্মাণে কত ধরনের সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়েছে, তা বলাবাহুল্য। বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে প্রায় এক হাজার ছাত্রীর আবাসনের ব্যবস্থা হবে বলে আশা করছে প্রশাসন। তারপরও সিংহভাগ শিক্ষার্থীর আবাসন সংকট রয়েই যাবে। তাই বলে স্বপ্ন দেখা তো থেমে থাকবে না। ইতোমধ্যে বুড়িগঙ্গার ওপারে কেরানীগঞ্জ উপজেলায় নতুন ক্যাম্পাসের জন্য জমি অধিগ্রহণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি বিশ্বমানের ক্যাম্পাস তৈরির লক্ষ্যে এগিয়ে চলছে 'মাস্টার প্ল্যান'। টেকসই উন্নয়নের বিষয়টি মাথায় রেখে নতুন ক্যাম্পাসের নকশায় পরিবেশ ও প্রতিবেশের ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।

অবকাঠামোগত উন্নয়নের বাইরে একাডেমিক উৎকর্ষেও এগিয়ে চলছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। এক ঝাঁক তরুণ মেধাবী শিক্ষক বিশ্ববিদ্যায়লটির অন্যতম মূল সম্পদ। প্রতিবছর শতাধিক শিক্ষক দেশের বাইরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা ও গবেষণায় উচ্চতর জ্ঞান ও দক্ষতা নিয়ে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক অঙ্গনকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন; পিছিয়ে নেই শিক্ষার্থীরাও। দেশ ও দেশের বাইরের প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চতর শিক্ষা অর্জন শেষে নিজ নিজ কর্মস্থলে প্রতিষ্ঠানের সুনাম বৃদ্ধি করে চলেছেন। একবিংশ শতাব্দীর জ্ঞানমার্গে জাতীয় স্বার্থ ও চেতনা সমুন্নত রাখতে দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে চলবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করছি।

শিক্ষক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়