ধর্ষণ মামলার দ্রুত রায়

উৎসাহব্যঞ্জক উদাহরণ

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয়

বাগেরহাটের মোংলায় শিশু ধর্ষণের মামলায় অভিযোগ গঠনের সাত কর্মদিবসের মধ্যে রায়ের যে দৃষ্টান্ত আমরা দেখেছি, তা নিঃসন্দেহে উৎসাহব্যঞ্জক। আইনশৃঙ্খলা ও আদালত ব্যবস্থা সংশ্নিষ্টদের সদিচ্ছা ও সক্রিয়তা কীভাবে বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা দূর করতে পারে, এই মামলার রায় তার আরেকটি প্রমাণ। দ্রুততম সময়ে মামলাটির বিচার সম্পন্ন করার জন্য আমরা বিচারক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্নিষ্ট সবাইকে সাধুবাদ জানাই। বস্তুত ধর্ষণ মামলার রায়ের ক্ষেত্রে যে দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতা আমরা দেখে আসছি, তাতে কোনো কোনো মামলা বছরের পর বছর ধরে চলে। এমনকি থানা পুলিশের ত্বরিত পদক্ষেপের অভাব, শারীরিক পরীক্ষা জটিলতা ও সাক্ষী উধাও- এই তিন ধাপের গরমিলের কারণেই ধর্ষণের মামলায় এক হাজারে মাত্র চারজন আসামি সাজা পায় বলে এক পরিসংখ্যানে এসেছে। এর মধ্যে বাগেরহাটের মামলাটি আমাদের জন্য আশাজাগানিয়া নিঃসন্দেহে। দেশজুড়ে চলমান ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে আমরা আরও কিছু ইতিবাচক ঘটনা দেখেছি। সাম্প্রতিক অঘটনগুলোতে পুলিশ ও প্রশাসন তৎপর যেমন হয়েছে; তেমনই নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে এসেছে সংশোধনী। প্রধানমন্ত্রীও নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের বিচারে কঠোর হওয়ার কথা বলেছেন। আমরা দেখেছি শারীরিক পরীক্ষার জটিলতা নিরসনে সম্প্রতি আদালত বলেছেন, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়াই পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও সাক্ষ্য বিবেচনায় ধর্ষণ মামলায় আসামিকে সাজা দেওয়া যাবে। এখানে ধর্ষণ প্রমাণে মেডিকেল রিপোর্ট মুখ্য নয়, পাশাপাশি কোনো ভুক্তভোগী দেরিতে মামলা করলে তাকেও মিথ্যা বলা যাবে না। বিচারের ক্ষেত্রে এসব কার্যকর করার পাশাপাশি মোংলার মতো দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করলে এর ইতিবাচক প্রভাব অন্যক্ষেত্রেও পড়বে। আমরা জানি, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে বলা আছে, ধর্ষণের ঘটনায় আসামি ধরা পড়লে পনেরো কার্যদিবসের মধ্যে বিচারকাজ সম্পন্ন করা যাবে। সর্বোচ্চ ছয় মাসের বেশি সময় নেওয়া যাবে না। বাস্তবে আইনের এই নির্দেশনার প্রতিপালন সম্ভব হয় না বোধগম্য নানা কারণে। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, মোংলার মামলাকে উদাহরণ হিসেবে গ্রহণ করে অন্য ধর্ষণ মামলার বিচারও দ্রুত সম্পন্ন করায় সংশ্নিষ্টরা উদ্যোগী হবেন। আমরা চাই, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আলাচ্য মামলায় আন্তরিকতা ও তৎপরতা প্রদর্শন করে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তা অব্যাহত থাকুক। অভিজ্ঞতা বলছে, প্রশাসন চাইলে যে কোনো মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব। যার প্রমাণ ফেনীর নুসরাতের মামলার ক্ষেত্রেও সবাই দেখেছে। কিন্তু এসব দৃষ্টান্ত সত্ত্বেও ধর্ষণের মতো অপরাধ যে কমছে না বরং বাড়ছে, উদ্বেগের বিষয় সেটাই। মঙ্গলবার যখন আমরা সংবাদপত্রে মোংলার আদালতের রায়ের খবর পড়ছি, একই সঙ্গে ফেনীসহ আরও চার স্থানে ধর্ষণের খবরও সবাইকে পড়তে হচ্ছে। ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন রোধে এ সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা বহুমুখী সক্রিয়তা ও সুরক্ষার তাগিদ দিয়েছি। এর প্রথমটি নিঃসন্দেহে আইনের প্রয়োগ ও অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা। এ ব্যাপারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও রাষ্ট্রপক্ষ বা বাদী নিযুক্ত আইনজীবীদের আন্তরিকতা ও দক্ষতার বিষয়টিতে জোর দিতেই হবে। পাশাপাশি ধর্ষক বা নারী নিপীড়কদের রাজনৈতিক প্রশ্রয় না দেওয়ার ব্যাপারে রাজনৈতিক অঙ্গীকারও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। একই সঙ্গে নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণ এবং পারিবারিক অনুশাসন ও শৃঙ্খলার প্রতি মনোযোগ দেওয়ার ব্যাপারটিও ভুললে চলবে না। ধর্ষণবিরোধী সাম্প্রতিক সামাজিক জাগরণ আমাদের যেমন আশান্বিত করছে, তেমিন ধর্ষণের কঠিন আইন ও মোংলার মামলার রায়ও রাষ্ট্রের ইতিবাচক অবস্থান স্পষ্ট করছে। এখন যদি অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনা এবং সম্ভাব্য স্বল্পতম সময়ের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করা যায়, তাহলে ধর্ষণের মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আসবে আশা করা যায়। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের সবাই যদি ধর্ষণ বা নারী নির্যাতনের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে যার যার দায়িত্ব পালন করে যায়, তাহলে এই অপরাধ রুখে দেওয়া অসম্ভব হতে পারে না।