আমরা আধুনিক নগরায়ণ নিয়ে চিন্তা করছি। শহরের মানুষকে স্বল্পমূল্যে কীভাবে একটি ঘর দেওয়া যায়, সেটিও এখন আমাদের অনেক বড় একটি চিন্তার বিষয়। কারণ শহরের এক টুকরো জমির দাম আজ আকাশচুম্বী। সব খরচ মিলিয়ে একটি আবাসিক স্থাপনার প্রতিটি ফ্ল্যাটের মূল্য শহরের অলিগলিতে পড়ে থাকা মধ্যবিত্তের হাতের নাগালের বাইরে। এখানে অতি স্বল্প ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর কথা না হয় বাদই দিলাম! সরকারি এবং বেসরকারি বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান এই মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য আবাসন সমস্যার সমাধানকল্পে বহুতলবিশিষ্ট ঘনবসতিপূর্ণ হাউজিং প্রকল্প গ্রহণ করছে। বিবেচনায় রাখছে শুধু স্কয়ার ফুট কিংবা কয়টি শোবার ঘর, কয়টি টয়লেট ইত্যাদি এ ধরনের বস্তুগত বিষয়। অন্যদিকে এই শহরেই আরেক প্রান্তে গড়ে উঠছে বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্প। যেখানে তাদের স্থাপনায় থাকছে সবুজ গাছগাছালি, সুইমিংপুল, সুবিশাল ড্রয়িং রুম কিংবা শোবার ঘর। কিংবা অনেক বড় সবুজ বারান্দা। রং-বেরঙের লাইটিং। সেখানে খরচের ব্যাপারগুলো মুখ্য কোনো সমস্যা নয়।

ঘনবসতিপূর্ণভাবে গড়ে ওঠা বহুতলবিশিষ্ট আবাসন প্রকল্পগুলোতে ছোট আকারের বিভিন্ন ধরনের ফ্ল্যাট সন্নিবেশনের মাধ্যমে আমরা চাইছি 'কম্প্যাক্ট লিভিং'। সাধারণত প্রাথমিকভাবে চিন্তা করা হয় অল্প জায়গাতে কীভাবে অনেক বেশি মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর আবাসন সমস্যার সমাধান করা যায়। আর এই ভাবনাগুলো থেকেই শহরে দিন দিন বেড়ে চলছে এমন ধরনের আবাসন প্রকল্প স্থানীয়ভাবে। তাছাড়া শহরকেন্দ্রিক নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলো আবাসন প্রকল্পে 'কম্প্যাক্ট লিভিং'-এর দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে। সাময়িকভাবে এসব প্রকল্প কিছুটা হলেও শহরভিত্তিক স্থানীয় আবাসন সমস্যার সমাধান করছে বলে প্রতীয়মান। তবে আমাদের ভেবে দেখতে হবে এর ভবিষ্যৎ পরিণতি! শুধু বসবাসের জায়গা প্রদানের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান নয় বরং এর সঙ্গে হয়তোবা ভবিষ্যতে আরও অনেক ধরনের সামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত সমস্যা সংযুক্ত হতে পারে।

অতি অল্প জায়গায় কীভাবে ভালোভাবে জীবন ধারণ কিংবা বসবাস করা যায়, এই ধারণা নতুন কিছু নয়। এমনকি টেকসই উন্নয়নে এই ধারণার উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আমাদের শহরগুলো যেভাবে বেড়ে উঠছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য সঙ্গে নিয়ে, যেভাবে আমরা আমাদের আবাসন প্রকল্পগুলোকে দেখছি কিংবা চিন্তা করছি অথবা সমাধান করার চেষ্টা করছি, সেখানে একটু প্রশ্ন থেকেই যায়!

বিশেষ করে এই অতি উচ্চ ঘনবসতিপূর্ণ আবাসন প্রকল্প সাময়িকভাবে মধ্যবিত্ত বা স্বল্প আয়ের পরিবারের কাছে খরচের দিক থেকে সহজলভ্য। তুলনামূলক কম খরচে তারা সেগুলো ক্রয় করতে পারে। তবে সেখানে কি বসবাসকারীর শারীরিক বা মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়গুলো নিয়ে সঠিকভাবে ভাবা হচ্ছে? অর্থাৎ আমরা যে জায়গায় বসবাস করছি, সেই জায়গাটির সঙ্গে বসবাসকারীর একটি শারীরিক এবং মানসিক সম্পর্ক তৈরি হয়। এমনকি বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে- বসবাসের জায়গার প্রকৃতি, রং, আলো-বাতাসের প্রাচুর্য বসবাসকারীর মনের ওপর ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এমনকি কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে। আর তাই বসবাসের জায়গার সঙ্গে শারীরিক বা মানসিক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় বর্তমান সময়ের জন্য। বিশেষ করে আমাদের ঢাকা শহরের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি শহরে। যেখানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে এবং এই প্রত্যেকটি পরিবারের আলাদা আলাদা নিজস্ব একটি গল্প আছে। যে গল্পগুলোর সঙ্গে একদিকে যেমন তার বসবাসের জায়গাগুলো সম্পৃক্ত, ঠিক অন্যদিকে সে জায়গাটির ওপর নির্ভর করছে তার শারীরিক এবং মানসিক সক্ষমতা কিংবা বিকাশের অনেক বিষয়। যেগুলো আপাতদৃষ্টিতে আবাসন প্রকল্পগুলোতে প্রায় অনুপস্থিত। এ ধরনের ঘনবসতিপূর্ণ আবাসন প্রকল্পে সাধারণত আমরা বস্তুগত বিষয়গুলো বেশির ভাগ সময় জোর দিয়ে থাকি। তবে সমস্যায় জর্জরিত এই শহরকেন্দ্রিক নাগরিক জীবনে দিন দিন যে বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে তার মধ্যে বসবাসকারীর মানসিক এবং শারীরিক সমস্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

সরকারি এবং বেসরকারি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার গবেষণা এবং জরিপে দেখা গেছে, আমাদের ঢাকা শহরের প্রায় অর্ধেকের বেশি মানুষ কোনো না কোনোভাবে শারীরিক কিংবা মানসিক অস্থিরতায় ভুগছেন। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের, নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর মধ্যে এ ধরনের অস্থিরতার প্রবণতা অত্যন্ত বেশি। তাছাড়া শহরবাসী বিভিন্ন কারণে প্রায় একের অধিক বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যায় জর্জরিত এবং এই মানসিক সমস্যা শহরে বসবাসকারীদের মধ্যে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে আমাদের জনবহুল ঢাকা শহরে। এমনকি শহরভিত্তিক হাসপাতালগুলোতেও বর্তমানে মানসিক সমস্যার বিষয়টি প্রাধান্য পাচ্ছে। খিটখিটে মেজাজ, ডিপ্রেশন, রাগান্বিত হওয়া, পড়াশোনায় কিংবা কাজে অমনোযোগী, অস্থিরতা, অবসন্নতা, অতি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন ধরনের শারীরিক এবং মানসিক সমস্যায় আজ প্রায় প্রত্যেকটি পরিবারই জর্জরিত। যদিও এর পেছনে অনেক কারণ রয়েছে, তবে এসব কারণের মধ্যে বসবাসের পরিবেশ অন্যতম একটি প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত। বিশেষ করে এই মহামারির সময় বসবাসের জায়গার ওপর বসবাসকারীর শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের প্রভাবের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বৈশ্বিকভাবে। যা আমাদের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশের আবাসন প্রকল্পগুলোর জন্য অত্যন্ত বেশি প্রয়োজন।

আমরা কথায় কথায় বহুতলবিশিষ্ট আবাসন প্রকল্পের কথা বলি! এই আবাসন প্রকল্পগুলোতে একসঙ্গে কয়েক হাজার পরিবারের আবাসন সমস্যার সমাধানের কথা ভাবি! ছোট জায়গায় বসবাসের কথা বলি! তবে যেহেতু বসবাসের পরিবেশের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের প্রভাব রয়েছে- বিশেষ করে নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর মধ্যে, যাদের খুব সহজেই সেই সামর্থ্য নেই সমস্ত সুযোগ-সুবিধা আছে, এমন জায়গায় বসবাস করার! যে কারণে তাদের বেছে নিতে হচ্ছে কম খরচের কম জায়গার এই আবাসন প্রকল্পগুলো।

এই আবাসন প্রকল্পগুলোতে বসবাস করার জন্য তারা প্রতিনিয়ত প্রতিদিনকার জীবন গতিতে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করছে। সেই সঙ্গে রয়েছে পরিবেশ বিপর্যয়- তাপমাত্রা বৃদ্ধি থেকে শুরু করে বিভিন্ন পরিবেশগত সমস্যা। হয়তো সেগুলোর সঙ্গে তারা নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েও চলছে। তাদের অভিজ্ঞতাগুলো, পরিবারের গল্পগুলো আমাদের জানতে হবে। কারণ এসব অভিজ্ঞতা জানার মধ্য দিয়ে আমরা খুঁজে বের করতে সক্ষম হবো এ ধরনের ছোট জায়গায় বসবাস কিংবা ঘনবসতিপূর্ণ আবাসন প্রকল্পগুলো নিয়ে কীভাবে নতুন করে চিন্তা করতে পারি! যা একদিকে যেমন তাদের আবাসন সমস্যার সমাধান করবে, অন্যদিকে বসবাসকারীর শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে। নইলে এখন যেমন আমরা শহরের ভেতরে বেড়ে ওঠা বস্তিগুলো নিয়ে চিন্তিত! ঠিক তেমনি একটি সময় এই আবাসন প্রকল্পগুলো সত্যিই শহরের ঘনবসতিপূর্ণ জঞ্জালে রূপান্তরিত হবে। কারণ মানুষের বসবাসের চাহিদার সঙ্গে তার মানসিক চাহিদার যোগসূত্র যদি না থাকে, তাহলে সে জায়গাটি একটি সময় অপ্রয়োজনীয় বোঝা হয়ে উঠবে শহরের বুকে। 

শিক্ষক, স্থাপত্য বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক
sajal_c@yahoo.com