ট্রাম্পে অনাস্থা পুঁজিবাদেরও?

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২০     আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

এডাম টুজ

ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখছে তার ইলেকটোরাল ভোট। তার ইলেকটোরালের ভিত্তি হলো শ্বেতাঙ্গ, গ্রামীণ ও ছোট শহরের ভোটার এবং ছোট ব্যবসায়ী শ্রেণি। ট্রাম্প যা বলবেন, তারা তাই শুনবেন। তবে অন্য গ্রুপকেও ট্রাম্পের স্বাভাবিক সমর্থক বলা যায়। তারা হলো বড় ব্যবসায়ী, অর্থনীতির বাজার এবং ব্যবসায়ী সমিতির মতো লবি। সোজা কথায় বললে 'পুঁজি'। কিন্তু এখন সেখানে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। জো বাইডেনের শক্ত অবস্থানে দেখা যাচ্ছে ওই পুঁজিপতিরা আশান্বিত হচ্ছেন। মার্কিন নির্বাচনে ভোটের আগে হওয়া প্রায় সব জনমত জরিপেই জো বাইডেন ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে এগিয়ে রয়েছেন। এই এগিয়ে থাকা গত নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটনের এগিয়ে থাকার চেয়ে বেশি ব্যবধানে। অর্থাৎ, এবার এমন অনেকেই বাইডেনকে সমর্থন দিচ্ছেন, যারা ২০১৬ সালে হিলারিকে সমর্থন দেননি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ধনিক শ্রেণি আর বিভিন্ন কোম্পানির পরিচালক (সিইও) দিয়ে ঠাসা হলেও এবারের নির্বাচনে তারা ঝুঁকছেন ডেমোক্রেটিক পার্টির জো বাইডেনের দিকে। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টি সাধারণত ব্যবসায়ীদের দল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেও ব্যবসায়ী। তিনি ব্যবসায়ীদের স্বার্থে ক্ষমতায় থেকে কাজ করেছেন। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা নির্বাচিত করেছেন জো বাইডেনকে। রাজনীতিতে মধ্যপন্থি বাইডেন ১৯৭৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত দিলওয়ার অঙ্গরাজ্যের সিনেটর ছিলেন। অর্থনীতিকীকরণের সময় এ রাজ্যটি ছিল পশ্চিমাবিশ্বের ট্যাক্সধারীদের অন্যতম বড় আশ্রয়স্থল। ট্রাম্পের শেষ বছরে আমরা দেখেছি, করোনা দুর্যোগের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি কঠিন সময় পার করছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র আর এমন সংকটে পড়েনি।

এ রকম পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসন ও কংগ্রেসের ভূমিকা ছিল প্রত্যাশার চেয়েও অকার্যকর। মার্কিন কংগ্রেসে পাস হওয়া কেয়ারস অ্যাক্ট তথা করোনভাইরাসের কারণে সহায়তামূলক আইন সাধারণ মানুষের জন্য যা, ব্যবসায়ীদের জন্যও তা। অর্থাৎ, সবার জন্য সমান। এপ্রিল থেকে ট্রাম্প করোনা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এ অবস্থায় ব্যবসায়ী নেতারা ট্রাম্পকে সমর্থনের ব্যাপারে বিশেষ সতর্ক হয়ে যান।

২০১৬ সালে সমর্থন পেতে ট্রাম্পকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। ব্যবসায়ীদের সংগঠন চেম্বার অব কমার্স ছিল তখন নিরপেক্ষ। তারা তখন ট্রাম্পকে যেমন সমর্থন দিতে পারেনি, তেমনি হিলারি ক্লিনটনের পক্ষেও দাঁড়াতে পারেনি। যে প্রকাশ্যে অভিবাসীদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করে সরাসরি ফেডারেল রিজার্ভের প্রধান জানেট ইয়েলেন এর সমালোচনা করেন। সংগত কারণেই তখন সমর্থন দিতে পারেনি। কিন্তু ওই বছরের ৮ নভেম্বর ট্রাম্পের বিজয়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সব দ্বিধা ঝরে যায়। মার্কেট চাঙ্গা হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বাজারনীতি ছিল সবচেয়ে বেশি আগ্রাসী। নব্বইয়ের দশক থেকে চীনের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের যে সম্পর্ক ছিল, তার অবনতি ঘটে শীতল যুদ্ধে রূপ নেয়। গত বছর ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান জেরোমি পাওয়ালের কঠোর সমালোচনা করেন। এ বছর গুজব ছড়ায় যে, ট্রাম্প পাওয়ালকে বরখাস্ত করতে পারেন। অধিকন্তু ট্রাম্প রাজনৈতিক ফায়দার জন্যই অভিবাসীদের বিদ্বেষ জিইয়ে রাখেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায় সস্তা শ্রমে লাতিন আমেরিকা থেকে শ্রমিক পায়। অথচ সেখান থেকে শ্রমিক আসা কমে গেছে। যার মূল কারণ হলো তাদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবাদী আচরণের বিচার হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থায় অর্থনীতির দ্বিতীয় জাগরণ জরুরি। তবে ভুলে গেলে চলবে না যে, যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তি। বড় ভয় হলো নির্বাচনী দ্বন্দ্ব। যেটা যুক্তরাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত নাড়িয়ে দিতে পারে। কথা হলো, বাইডেন নির্বাচনে জিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হলেও রিপাবলিকানদের সিনেটের শক্তি থেকেই যাবে। সে ক্ষেত্রে বাইডেনকে বারাক ওবামার মতো কৌশলী অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এ দুঃসময়ে অর্থনীতির জন্য, মার্কিন সংবিধানের জন্য ডেমোক্র্যাটদের একটা ভূমিধস জয়ের বিকল্প নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের অধ্যাপক; গার্ডিয়ান থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক