এক সময় গ্রাম-গঞ্জ, পাড়া-মহল্লার বাড়ির উঠানে জারি-সারি-ভাটিয়ালি কিংবা বাউল গানের আসর বসত। মধ্যরাত পর্যন্ত চলত সে আসর। কৃষক, কামার-কুমারসহ সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশ নিত। সমাজের নানা জনহিতকর কাজের জন্য এলাকার মাতবররা তরুণদের নিয়ে উঠান বৈঠক করতেন। সময়ের বিবর্তন এবং আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেসব দৃশ্য এখন তেমন চোখে পড়ে না। তবে হ্যাঁ, উঠান বৈঠক সম্পর্কে মানুষের ধারণায় আরও ব্যাপকতা এসেছে। রূপ পাল্টে সেই উঠান বৈঠক এখন আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে রক্তস্নাত বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে। আওয়ামী লীগ সরকারের সেই উন্নয়নমূলক কাজ সরাসরি তৃণমূলের কাছে তুলে ধরতে এই উঠান বৈঠক একটি শক্তিশালী মাধ্যম। যদিও সরকারের কাজগুলো বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে উঠান বৈঠকের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন কোনো কোনো জনপ্রতিনিধি। তবে এটা সন্তোষজনক নয়। আরও ব্যাপকভাবে করা উচিত।

বর্তমান সময়ে জনবান্ধব আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়নমূলক সব কাজ সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরতে আমিই প্রথম এই উঠান বৈঠক শুরু করেছিলাম। জনগণের সঙ্গে হৃদয়তা বাড়ানো, জবাবদিহির সুযোগ তৈরি করে দেওয়া; সমস্যা, সম্ভাবনা ও উন্নয়নের কথা সরাসরি বলার জন্য এর চেয়ে ভালো কোনো মাধ্যম নেই। বাঙালির আস্থা ও ভরসার একমাত্র ঠিকানা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকেই এই উঠান বৈঠকের ধারণা নিয়েছিলাম প্রথম। গণতন্ত্রের মানসকন্যা শেখ হাসিনা আমাকে গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়ার পরপরই গণভবনে একটি বর্ধিত সভায় আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। সরকারের উন্নয়নমূলক কাজগুলো সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটা ধারণা সেদিন প্রধানমন্ত্রী দিয়েছিলেন তার বক্তব্যে। বলেছিলেন উঠান বৈঠকের কথা। মাতৃতুল্য জননেত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হয়ে ফিরে আসি এলাকায়। এর পর থেকেই গাজীপুরের পাড়া-মহল্লায় শুরু করি উঠান বৈঠক। এ বৈঠকে নেই কোনো মঞ্চ, চেয়ার-টেবিল কিংবা ব্যানার। এমনকি চিরাচরিত নিয়মের কোনো অতিথিও নেই। খেজুরপাতার পাটি কিংবা চট বিছিয়ে প্রায় ৭০০ উঠান বৈঠক করেছি। বিশেষ করে আমার নির্বাচনী এলাকা শ্রীপুর, পিরুজালী, ভাওয়ালগড় ও মির্জাপুর এলাকার মানুষকে একত্রিত করে একের পর এক উঠান বৈঠক করি। নারী-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধসহ নানা পেশার হাজার হাজার মানুষ অংশ নিয়েছেন প্রতিটি উঠান বৈঠকে।

নানা গণমাধ্যমে উন্নয়নের কথা জানলেও সাধারণ মানুষ দলীয় কোনো নেতাকর্মী বা জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে সেই খবর জানতে পেরে পরম তৃপ্তি পান। বলতে পারেন তাদের সুখ-দুঃখের কথা। সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা। কোথাও কোনো দুর্নীতি তাদের চোখে পড়লে সে কথাও জানাতে পারেন। এতে নেতার সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক আরও প্রগাঢ় হয়। আস্থা তৈরি হয়। দক্ষ নেতৃত্ব, দারিদ্র্য বিমোচন, উন্নয়নের রূপকার, সততা আর বুদ্ধিমত্তার জন্য শেখ হাসিনা অর্জন করেছেন বিশ্বের নামিদামি পুরস্কার। সবচেয়ে বড় পুরস্কার তিনি পেয়েছেন তার বাবার হাতে গড়া বাংলাদেশের মানুষের কাছ থেকে। অর্জন করেছেন সব শ্রেণি-পেশার ভালোবাসা ও আস্থা। উঠান বৈঠকে সরাসরি এই তথ্যগুলো মানুষের কানে পৌঁছে দেওয়া যায়। দেশের মানুষের মুখে যে হাসি ফোটানোর জন্য বঙ্গবন্ধু পুরোটা জীবন লড়াই করেছেন। জাতির পিতার হাতে গড়া বাংলাদেশের মানুষ এখন সুখে আছে, শান্তিতে ঘুমাতে পারে। কাউকে এখন আর না খেয়ে দিন কাটাতে হয় না। এ সবকিছুই বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কৃতিত্ব। বাঙালি জাতির জন্য আশীর্বাদস্বরূপ এসেছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। তার শাসনামলেই দেশের মানুষের ভাগ্যবদল হয়েছে; মানুষ সুখে বাঁচে, শান্তিতে ঘুমায়। এই খবরগুলো মানুষের কাছে না পৌঁছালে বড্ড কৃপণতা হয়ে যাবে। জাতি হিসেবে আমরা অকৃতজ্ঞ হয়ে যাব। যদিও নানা মাধ্যমে মানুষ জানে এসব কথা। তার পরও সরাসরি বলা এবং শোনার মধ্যে একটা তৃপ্তি রয়েছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে উঠান বৈঠককে আরও বেগবান করার জন্য অনুরোধ করছি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের। এই উঠান বৈঠকের মাধ্যমেই সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায় সরকারের উন্নয়নের কথা।

বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। উন্নয়নের মহাসড়কে হাঁটছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার প্রথমবার ক্ষমতায় এসেই চালু করে দুস্থ নারী ও বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, বয়স্কদের জন্য শান্তি নিবাস, আশ্রয়হীনদের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্প এবং একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প ও বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু। অর্জন করেছে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ পরিণত হয় মানুষের আস্থা ও ভরসার স্থলে। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি, ভারতের সঙ্গে গঙ্গা নদীর পানি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম শুরু, রাজনৈতিক হত্যা; বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা, কারাগারে জাতীয় চার নেতা হত্যাসহ সব হত্যার বিচার কার্যক্রম নিষ্পত্তি করে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সামুদ্রিক জলসীমা বিরোধ, চিকিৎসাসেবার জন্য সারাদেশে প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন, প্রতিটি ইউনিয়নে ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন, মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীর মধ্যে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণের উদ্যোগ গ্রহণ। শেখ হাসিনা বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে শুরু করেন পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন কাজ। স্বপ্নের সেই পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শেষের পথে। এ ছাড়া বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীতকরণ, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, দারিদ্র্যের হার হ্রাস। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও তথ্যপ্রযুক্তিতে এবার বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয়। শেখ হাসিনা বিশ্বের বুকে নজির স্থাপন করেন ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে। তিনি দেশের প্রথম স্যাটেলাইট 'বঙ্গবন্ধু-১' মহাকাশে উৎক্ষেপণ, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের মতো অসংখ্য অসম্ভব কাজ সম্ভব করেছেন। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে উত্থান হওয়া জঙ্গিবাদ নির্মূল করেছেন। বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া বাংলাদেশকে তারই কন্যা আজ বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর পথ করে দিয়েছেন। বাঙালি জাতির কাণ্ডারি শেখ হাসিনার দ্বারাই সম্ভব এত কাজ একসঙ্গে করা।

এসব কাজের কথা মানুষকে জানানো আমাদের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। সরাসরি জনগণের কাছে এসব উন্নয়নের কথা তুলে ধরার সবচেয়ে ভালো মাধ্যম হলো উঠান বৈঠক। দলীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা উদ্যোগী হয়ে নিজ নিজ এলাকায় উঠান বৈঠক করে সরকারের উন্নয়নের কথা তুলে ধরতে পারেন।

সংসদ সদস্য, গাজীপুর-৩