সংবাদমাধ্যমের আয়নায় সমকাল

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২০     আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক

বাংলাদেশের জনপ্রিয় দৈনিক পত্রিকা সমকালের ১৬তম বর্ষে পদার্পণ উপলক্ষ্যে পত্রিকাটির সম্পাদক, প্রকাশক, সাংবাদিক, কলাকুশলী, বিজ্ঞাপনদাতা এবং দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা অগণিত পাঠকসহ সকলকে আন্তরিকভাবে অভিনন্দন, শুভেচ্ছা ও শুভকামনা জানাই। সমকালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ১১০ বছর আগে রচিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি পঙ্‌ক্তির কথা স্মরণে আসে- 'জীবনে যা চিরদিন/রয়ে গেছে আভাসে/প্রভাতের আলোকে যা/ফোটে নাই প্রকাশে'/

আমাদের দৈনিক জীবনযাপনে বহুমাত্রিক যে তথ্যের প্রয়োজন তা সরবরাহ করে চলেছে সমকাল। একুশ শতকের এই সময়ে বিশেষ করে করোনার এই মহাসংকটে একজন নাগরিকের যে বিচিত্র তথ্য প্রয়োজন হয় তার একটি অর্থপূর্ণ ভান্ডার হিসেবে কাজ করছে সমকাল। প্রতি প্রভাতে সমকালের পাতা উল্টালে আমরা স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক যে খবরাখবরের সন্ধান পাই তা আমাদের দিনের তথ্য চাহিদা পূরণ করে। সেখানে যেমন থাকে সারা পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত সংবাদের বস্তুনিষ্ঠ বিবরণী, তেমনি থাকে তার ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণমূলক গভীর পর্যবেক্ষণ, সমৃদ্ধ সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয় নিবন্ধবলি। সঙ্গে থাকে পর্যাপ্ত পরিসংখ্যান ও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগৃহীত ঘটনাবলির ছবি ও চিত্র। একজন সচেতন পাঠকের প্রয়োজনীয় সকল তথ্য- রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া, বিজ্ঞান, চিকিৎসা, প্রযুক্তি যেকোনো ক্ষেত্রেই হোক না কেন তা বস্তুনিষ্ঠভাবে উপস্থাপিত হয় সমকালের বিভিন্ন পাতায়। সম্পাদনাই যদি হয় সাংবাদিকতার প্রাণ তবে বলতেই হবে যে, সমকাল হচ্ছে বাংলাদেশের একটি সুসম্পাদিত পত্রিকা।

সমকালের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক প্রয়াত গোলাম সারওয়ার সুসম্পাদনার ক্ষেত্রে যে ঐতিহ্য সৃষ্টি করে গেছেন সেটি বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফির নেতৃত্বে অব্যাহত রয়েছে। সারা পৃথিবীতে বিগত ২৪ ঘণ্টায় বিক্ষিপ্তভাবে যে ঘটনা সংঘটিত হয় তা সম্পাদনার দিক থেকে সুবিন্যস্তভাবে বাংলাদেশের পাঠকের উপযোগী করে যেভাবে আমরা পত্রিকার পাতায় এগুলো পড়ার সুযোগ পাই তাতে বোঝা যায় সমকালের সম্পাদনা টেবিলের দক্ষতা ও মুনশিয়ানা। বাংলাদেশের এক সময়ের সেরা বার্তা সম্পাদক গোলাম সারওয়ারের এটি এক অসাধারণ অবদান, যা প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সমকালকে সমৃদ্ধ করেছে। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা ও বিনোদন ক্ষেত্রে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সংবাদই সমকালের দৃষ্টির বাইরে থাকে না। সমকাল পত্রিকার একটি বিশেষ ঝোঁক আমি লক্ষ্য করেছি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সংবাদ পরিবেশনের প্রতি। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের খুঁটিনাটি সংবাদও গুরুত্বের সঙ্গে সমকালের পাতায় উঠে আসে। এতে করে দেশের নীতিনির্ধারণী পদে অবস্থানরত ব্যক্তিদের জন্যও সমকাল একটি অবিকল্প তথ্য উৎস হতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করি।

গত ২৫ অক্টোবর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির রজতজয়ন্তী উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের উদ্দেশে যে কথা বলেছেন তা আজকের বাস্তবতায় অত্যন্ত তাৎপর্যবহ। তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ম্ফোরণ এবং সংবাদমাধ্যম বিকাশ ও বিস্তারের এই যুগে বহু মানুষ এখন সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এমনকি নাগরিক সাংবাদিকতার প্রচলনও আমরা লক্ষ্য করছি। এ সময়ে সংবাদ ক্ষেত্রে ও সাংবাদিকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার বিষয়টির সঙ্গে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার ব্যাপারটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার সঙ্গে সঙ্গে এ দায়িত্ব পালনের কথাই স্মরণ করিয়েছেন, যা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কথারই প্রতিধ্বনি। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের ১৬ জুলাই বঙ্গবন্ধু জাতীয় প্রেস ক্লাবে এসে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের তিন দিনব্যাপী সম্মেলনের উদ্বোধনী ঘোষণায় বলেছিলেন, 'গণতন্ত্রের একটা মূলনীতি আছে। তার জনকল্যাণমূলক একটা নীতিমালা আছে। সাংবাদিকতারও এমন একটা নীতিমালা আছে। সংবাদপত্রের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে। তবে নীতিমালা মেনে পত্রিকাগুলোকে দায়িত্বশীল হতে হবে।' সমকাল প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই পত্রিকার একজন নিয়মিত পাঠক হিসেবে আমি বলতে পারি যে, পত্রিকাটির প্রকাশক-সম্পাদক বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত দিকনির্দেশনা অনুসরণ করেই পত্রিকার সামগ্রিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে চলেছেন।

গণতান্ত্রিক বিশ্বে 'নিউজপেপার অব রেকর্ড' বলে একটি কথা আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকা ১৯১৩ সালে এই অভিধায় অভিহিত হয়েছে। বিশ্ব বাস্তবতায় এ পত্রিকাটি এখন 'নিউজপেপার অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ড' হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। আমার প্রত্যাশা সমকাল পত্রিকাটি বাংলাদেশে 'নিউজপেপার অব রেকর্ড' হিসেবে তার দায়িত্ব পালন করবে। বাঙালি পাঠকদের উদ্দেশে আমার বক্তব্য থাকবে সমকাল পত্রিকা আমাদের অবশ্য পাঠ্য, পৃথিবীর যে প্রান্তেই আমরা থাকি না কেন। সকল জনমত সমগুরুত্ব দিয়ে প্রত্যক্ষ যুক্তির মাধ্যমে সমকাল যেভাবে সারা পৃথিবীর বাংলাভাষী মানুষের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয় তাতে এ আশা আমরা করতেই পারি।

সমকালের পাঠকগোষ্ঠী তাদের স্বাধীন মতামত প্রকাশের যে সুযোগ পায় তাতে আমরা লক্ষ্য করি যে, বহু বৈচিত্র্যময় চিন্তাচেতনার মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেছে সমকাল। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে ভিন্নমত যেমন অতি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, ঠিক তেমনি গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ হিসেবে প্রতিটি দৈনিক পত্রিকায় ভিন্ন জনমতের প্রতিফলন ঘটবে এটাও স্বাভাবিক।

একটি সংবাদমাধ্যমের পথচলায় ১৫ বছর খুব দীর্ঘ সময় নয়, কিন্তু একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠাকালীন পর্বে প্রথম ১৫ বছর খুব গুরুত্বপূর্ণ সময়। কারণ পত্রিকাটির ভিত রচিত হচ্ছে এই সময়েই। পত্রিকাটি ভবিষ্যতে কী রূপ নেবে, এর বৈচিত্র্যময় উপস্থাপনার পরিধি কতটা বিস্তৃত হবে, স্বাধীন মতপ্রকাশের পত্রিকাটি কতটুকু ঝুঁকি নেবে, সংবাদকর্মীরা কতটা নিবেদিত থাকবেন, মালিক-প্রকাশক-সম্পাদক কতটা নিরপেক্ষভাবে পত্রিকাটি পরিচালনা করবেন এ বিষয়গুলো সম্বন্ধে পাঠককুল সম্যকধারণা লাভ করে এ সূচনা পর্বে। এ কারণেই বলছিলাম ১৫ বছর দীর্ঘ সময় না হলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। যেটি সমকাল পেরিয়ে এসেছে এবং বিশাল জনগোষ্ঠীর আস্থা অর্জন করেছে। একটি সংবাদপত্রের মূল সম্পদই হচ্ছে তার বিশ্বাসযোগ্যতা। এই নিরিখে সমকাল মর্যাদার সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছে বিগত ১৫টি বছর।

একটি সংবাদমাধ্যমের অনন্তকালের যাত্রাপথে এ বিশ্বাসযোগ্যতাকে ভিত্তি ধরেই এগিয়ে যেতে হবে। বিশ্বাসযোগ্যতা কোনো বিমুক্ত বস্তু নয়। বিশ্বাসযোগ্যতায় অন্তর্ভুক্ত আছে সম্পাদক-প্রকাশের বিশ্বাসযোগ্যতা, কর্মরত সাংবাদিকদের বিশ্বাসযোগ্যতা ও সর্বোপরি উপস্থাপিত প্রতিবেদন, সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয় ও অন্যান্য 'কনটেন্টে'র এমনকি বিজ্ঞাপনের বস্তুনিষ্ঠতা ও যথার্থতা। এ কারণেই প্রতিটি সংবাদমাধ্যম- তা সম্প্রচার বা মুদ্রণ মাধ্যম যাই হোক না কেন তাদের পরিচালনায় নিয়োজিত প্রত্যেক পেশাজীবীকেই বস্তুনিষ্ঠতার অতন্দ্রপ্রহরী হিসেবে কাজ করতে হয়। মুহূর্তের অসাবধানতার কারণে কখনও কখনও বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা থাকে। বিগত বছরগুলোতে সমকাল সে পরীক্ষায়ও সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে বলে মনে করি। গণজীবনকে কলুষমুক্ত করা, জনরুচির উত্তরোত্তর উন্নয়ন ঘটানো ও সমাজে মানবতাবোধের প্রতিষ্ঠা করাও সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের দেশের প্রথিতযশা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার আকস্মিক মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে ১৯৬৯ সালের ৯ জুন তারিখে স্মৃতিচারণমূলক যে নিবন্ধ দৈনিক ইত্তেফাকে লিখেছিলেন, তাতে বলেছিলেন- 'অহংকারের বাহুল্য চমকতার বিষয়বস্তু কোনোদিন আবৃত করতে পারেনি। জনগণের কথা বলার জন্য মানিক মিয়া লেখনী হাতে নিয়েছেন। জনগণের ভাষায় তিনি কথা বলতেন, তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল গণমুখী। তিনি নিজে সৃষ্টি করেছিলেন এক নতুন সাংবাদিক ভাষা। কঠিন তাত্ত্বিক আলোচনার মাঝে রসালো গ্রামীণ গল্প ও সর্বজন পরিচিত কাহিনি সংযোগ করে তিনি তার রচনাগুলোতে প্রাণ সঞ্চার করতেন। শব্দ সংগ্রহ ও প্রয়োগে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সতর্ক ও সিদ্ধহস্ত। তার ব্যবহূত শব্দগুলো অনেক সময় নিজস্ব আভিধানিক অর্থ ছড়িয়ে নতুন অর্থ ব্যক্ত করতো। তিনি ছিলেন উঁচু দরের গাল্পিক।' ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সেই সময়ে ইত্তেফাকের সম্পাদকের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু যে কথাগুলো বলেছিলেন তাতে আজকের দিনে সকল সংবাদপত্রের জন্য অনেক কিছু শিক্ষণীয় আছে। বঙ্গবন্ধু নিজেও প্রত্যক্ষভাবে ছাত্রজীবন থেকে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা ও বন্ধুরা সেই সময় প্রথিতযশা সাংবাদিক ছিলেন। সাংবাদিক মহলে বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তা, ঘনিষ্ঠতা, আন্তরিকতা আমাদের সব সময় অনুপ্রাণিত করে। বঙ্গবন্ধু সর্বদাই গণমানুষের সঙ্গে গণমাধ্যমের সক্রিয় সংযোগে প্রভূত ভূমিকা রেখেছেন এবং সেখানে ছিল বঙ্গবন্ধুর হিমালয়সম ব্যক্তিত্ব ও বিশ্বস্ততা।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই শুভক্ষণে আমরা আশা করব বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে ও গণমানুষের সার্বিক ক্ষমতায়নে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে ১৬ কোটি মানুষের মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করবে সমকাল। ভারত উপমহাদেশে আনুমানিক ২৫০ বছরের সংবাদপত্র সংস্কৃতিতে সমকাল অনন্তকালের যাত্রাপথে ব্যতিক্রমী অধ্যায় রচনা করবে- এই বিশ্বাস আমাদের আছে।

গণযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ; সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়