'নো মাস্ক নো সার্ভিস'

প্রবিধান স্বাগত, প্রয়োগ জরুরি

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২০     আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয়

স্বাস্থ্য সুরক্ষা সংক্রান্ত মুখোশ বা 'মাস্ক' না পরলে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে কোনো সেবা মিলবে না- রোববার মন্ত্রিসভার বৈঠক থেকে এমন নির্দেশনায় নিশ্চয়ই স্বাগত। বস্তুত কভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ার শুরু থেকেই মাস্ক পরায় বিশেষ জোর দিয়ে আসছেন দেশ ও বিদেশের মহামারি বিশেষজ্ঞরা। করোনা আক্রান্তদের জন্য যখন সুনির্দিষ্ট ওষুধ এখনও পাওয়া যায়নি; করোনা ঝুঁকি প্রতিরোধে প্রতিষেধক টিকা যখন চূড়ান্ত হয়নি; তখন সর্বব্যাপ্ত এই ভাইরাস সংক্রমণ থেকে সুরক্ষায় তিনটি সতর্কতামূলক ব্যবস্থার কথাই প্রথম থেকে বলা হচ্ছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সামাজিক বা শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা যে প্রায় অসম্ভব, ইতোমধ্যে তা প্রমাণ হয়েছে। আমাদের বিপুল জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনায় জীবাণুনাশক বা 'স্যানিটাইজেশন' ব্যবস্থাও সহজ নয়। এমন পরিস্থিতিতে মাস্ক ব্যবহারই করোনাভাইরাস সংক্রমণ ও সম্প্রসারণ রোধে নিঃসন্দেহে কার্যকর ব্যবস্থা। মন্ত্রিসভার বৈঠক থেকে করোনা মোকাবিলায় সরকারের এই নির্দেশনা এমন সময়ে এলো, যখন বলা হচ্ছে দেশে প্রথম দফা সংক্রমণের 'শীর্ষবিন্দু' মে থেকে আগস্ট মাসে পার হয়ে গেছে। কিন্তু প্রথম ঢেউ কমে যাওয়ার স্বস্তির সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় ঢেউয়ের শঙ্কাও তৈরি হয়েছে। আমরা মনে করি, এক্ষেত্রে মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার বিকল্প নেই। আমরা আশা করতে পারি, এর মধ্য দিয়ে করোনা আক্রান্তদের থেকে অন্যের মাঝে ছড়ানোর হার কমবে। আর কিছু না হোক, মাস্ক ব্যবহারের ফলে বায়ুবাহিত অন্যান্য রোগব্যাধির ঝুঁকি কমে গিয়ে করোনা প্রতিরোধে ব্যক্তির সক্ষমতা বাড়িয়ে তুলবে। কিন্তু যে বিষয়ে আমরা সন্দিহান, তা হচ্ছে এই নির্দেশনার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া। করোনাভাইরাস সংক্রমণ ও সম্প্রসারণের শুরু থেকে স্বাস্থ্যবিধি ও সতর্কতামূলক নির্দেশনা কম আসেনি। একটি হিসাবে দেখা গেছে, অন্তত ৯ দফা নির্দেশনা এসেছে সরকার থেকে। কিন্তু তার কত অংশ আসলে মাঠ পর্যায়ে প্রতিপালিত হয়েছে? এমনকি গত জুলাই মাসে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জারি করা নির্দেশনাতেও মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার কথা ছিল। তা কি প্রতিপালিত হয়েছে? সিদ্ধান্ত গ্রহণে অহেতুক বিলম্ব ও তা বাস্তবায়নে অর্থহীন বিভ্রান্তি না থাকলে করোনা মোকাবিলায় আমরা সম্ভবত আরও এগিয়ে থাকতাম।

চীনের উহানে প্রথম যখন করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়, তখন থেকেই আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে পুনঃপুন তাগিদ দিয়েছি যে- অবিলম্বে বিমান, নৌ ও স্থলবন্দরসহ দেশের প্রবেশপথগুলোতে পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ জোরদার করা হোক। আমরা চেয়েছিলাম, দেশের প্রবেশপথগুলোতে করোনা শনাক্ত বা সন্দেহভাজনদের কঠোরভাবে প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিগত পর্যায়ে সঙ্গনিরোধ ব্যবস্থা প্রয়োগ করা হোক। কিন্তু দেখা গেছে, বিমানবন্দরে আটক বা পরীক্ষা না করে পরে পুলিশের কাছে তালিকা নিয়ে বাড়ি বাড়ি খোঁজ করা হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের আশঙ্কা সত্য প্রমাণ করে দেশের প্রথম পর্যায়ের করোনা আক্রান্তরা প্রবাস ফেরত বাংলাদেশি কিংবা তাদের আত্মীয়-স্বজনের মধ্য থেকেই এসেছিলেন। দেশে প্রথম যখন করোনায় বা করোনা উপসর্গে মৃত্যু হতে থাকে, তখনও যদি গোটা দেশ কার্যকর লকডাউন করা যেত, তাহলে হয়তো পরিস্থিতি এতদূর গড়াত না। সেক্ষেত্র কী ঘটেছে, সে ব্যাপারে যত কম বলা যায়, ততই মঙ্গল। স্বীকার করতেই হবে- সরকারের তরফে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সদিচ্ছার ঘাটতি ছিল না।

করোনা চিকিৎসায় হাসপাতালগুলোতে যে চিকিৎসা ও সেবা দেওয়া হচ্ছে, তাও তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশের জন্য অনেক। কিন্তু বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় ফাঁক থাকলে সরকারের সদিচ্ছাও যে কাঙ্ক্ষিত ফল লাভে ব্যর্থ হতে পারে, তা গত সাত মাসে অনেকবারই দেখেছি। মাস্ক ব্যবহার নিয়ে সর্বশেষ নির্দেশনা যাতে ব্যর্থ না হয়, সেজন্য সর্বাত্মক উদ্যোগের বিকল্প নেই। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগগুলোও এগিয়ে আসতে পারে সচেতনতামূলক কর্মসূচি নিয়ে। অতীতে অনেকবারই স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে যে ঔদাসীন্য দেখা গেছে, এবার তার পুনরাবৃত্তি আমরা দেখতে চাই না। সরকারের প্রবিধান ভালো, সন্দেহ নেই; কিন্তু প্রয়োগ নিশ্চিত করা না গেলে তা কাগুজে নির্দেশনা হয়েই থাকবে।