আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সর্বগ্রাসী সংকট চলছে অনেক আগে থেকেই। কিন্তু কখনও কখনও তার আঁচ এত বেশি হয়ে ওঠে যে, আমরা নড়েচড়ে উঠে চেষ্টা করি তা থেকে রক্ষা পাওয়ার। যেমন- এই সংকটের লেলিহান শিখার উত্তাপ এসে আমাদের স্পর্শ করছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবাদে। যে চারটি সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই রাষ্ট্রায়ত্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে এবং আজ অবধি পরিচালিত হয়ে আসছে ১৯৭৩ সালের স্বায়ত্তশাসন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, এটি তার অন্যতম। এটি অন্যতম এ কারণেও যে, এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষক ছিলেন ড. শামসুজ্জোহা- যার আত্মদান সামরিক জান্তা আইয়ুব খানের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকেছিল এবং ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান সর্বোচ্চ শিখরে উঠেছিল; সারা পূর্ব বাংলায় আওয়াজ উঠেছিল- 'বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককেও জীবন দিতে হয়েছে! তোমার আমার জীবনের কী এমন মূল্য আছে যে তা বয়ে বেড়াতে হবে?' আবার মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষক মুজিবর রহমান পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সজ্ঞানে, পৃথিবীর সমস্ত ভয়কে অবহেলা করে নিজের নাম পরিবর্তন করে 'দেবদাস' রেখেছিলেন তাদের অত্যাচারের প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে। একাত্তরের যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সেখানে যে বিশেষ সমাবর্তন হয়েছিল, সেই সমাবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আচার্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য খান সারওয়ার মুরশিদের আমন্ত্রণে বিশেষ সম্মানসূচক ডক্টরেট নিতে এসেছিলেন মুক্তিযুদ্ধে সমর্থনকারী ফরাসি মনীষী আন্দ্রে মালরো। এ দেশের নানা মতের নানা পথের যেসব মানুষ আমাদের সমৃদ্ধ করেছেন, সেই বিচারপতি হাবিবুর রহমান, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, সালাহউদ্দীন আহমদ, বদরুদ্দীন উমর, আলী আনোয়ার, সনৎ কুমার সাহার মতো বিদগ্ধ সব মানুষের কাছে একসময় পাঠ নিয়েছেন এ দেশের অসংখ্য বিদ্যার্থী।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই স্বর্ণযুগের সঙ্গে মিলিয়ে এবার এখন একবার চিন্তা করে দেখা যাক- এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই কিনা প্রথম যে শিক্ষক দুই-দু'বারের মতো উপাচার্য হওয়ার 'গৌরব' অর্জন করলেন, তাকে নিয়ে রয়েছে বিস্তর বিতর্ক ও সমালোচনা। প্রথম দফায় দায়িত্ব পালনের সময়ও তাকে বিদায় নিতে হয়েছিল নানা দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ ওঠার কারণে; এখন তার দ্বিতীয় মেয়াদে আবারও নানা দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে তার প্রশাসনের বিরুদ্ধে। ইউজিসি সেসব অনিয়মের সত্যতাও খুঁজে পেয়েছে, যদিও তিনি ইউজিসির তদন্তকাজকে ভুল করে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছিলেন সর্বতোভাবে। এহেন উপাচার্যের দুই মেয়াদের মাঝখানে যিনি উপাচার্য হয়েছিলেন, তার নামেও রয়েছে দুর্নীতি-অনিয়মের  বিস্তর অভিযোগ এবং সেসবের ভারে বিদায় নিতে হয়েছিল তাকেও।
প্রসঙ্গত বলি, একদিক থেকে আমি সৌভাগ্যবান, আমার চার-চারজন সরাসরি শিক্ষক বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছেন। কিন্তু একই সঙ্গে আমি দুর্ভাগ্যবানও বটে; কারণ এই চারজন উপাচার্যের মধ্যে তিনজনকেই পদ থেকে বিদায় নিতে হয়েছে খুবই বিশ্রীভাবে (অবশ্য তাদের উপাচার্য হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াও তেমন গৌরবজনক কিছু ছিল না)। চতুর্থজন এখনও দায়িত্ব পালন করছেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য যেদিন দ্বিতীয়বারের মতো নিয়োগ পেলেন, সেদিন এক বন্ধুকে বলতে শুনেছিলাম- উপাচার্যদের এখন অনেক ঘাড়। একটা মাথা ফেলবেন তো কী হয়েছে, আরেকটা ঠিকই উঁকি দেবে। এটা ভাবার কারণ নেই যে, অস্বস্তির কারণে তার বা তার পূর্ববর্তী উপাচার্যের নাম আমি সরাসরি লিখছি না। আসলে তাদের বিরুদ্ধে যেসব দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ এসেছে, সে ধরনের অপরাধ করাটা ইতোমধ্যে শুধু রাজশাহী নয়, সব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনেরই একটি সাধারণ প্রবণতায় পরিণত হয়েছে এবং দেখা যাচ্ছে যিনিই উপাচার্যের দায়িত্বে আসুন না কেন, তিনিই একটি চক্র গড়ে তুলছেন এবং এ ধরনের অপরাধে তার পূর্ববর্তীকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় নামছেন। কাজেই অপরাধীর নাম মুখে নিলেই যে অপরাধগুলো দূর হয়ে যাবে, ব্যাপারটি সে রকম পর্যায়ে নেই।
তা ছাড়া আমরা দেখছি, দুর্নীতির এসব খবরও আমাদের সামনে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আসে না। দেখা যায়, শিক্ষকদের একটি অংশ ঘটনাক্রমে সংক্ষুব্ধ হন এবং বিষয়টিকে সবার সামনে নিয়ে আসেন। সংক্ষুব্ধ যে শিক্ষকরা এসব বিষয় সামনে নিয়ে আসেন, তারা সবাই যে পুরোপুরি সৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে কাজটি করেন; সাধারণ মানুষের কাছে সে রকম কখনোই মনে হয়নি। কারণ মানুষ দেখেছে, এই শিক্ষকদের সবাই আসলে একই চেতনাপ্রবাহের মানুষ। কিন্তু একই দলভুক্ত হওয়ার পরও স্বার্থের দ্বন্দ্বে তারা বিভক্ত হয়ে আছেন এবং যতক্ষণ না সেই দ্বন্দ্ব তীব্র হয়ে উঠছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সব দুর্নীতি-অনিয়মই গোপন রয়ে যাচ্ছে। এর আগে এই উপাচার্যকে বিদায় নিতে হয়েছিল এমনই এক মারাত্মক দ্বন্দ্বাত্মক পরিস্থিতিতে এবং মঞ্চে আবির্ভূত হয়েছিলেন নতুন উপাচার্য। তাকেও বিদায় নিতে হয়েছে একই রকম পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে।

তবে এই পরিস্থিতি আমাদের সামনে আবারও নানা প্রশ্ন নিয়ে এসেছে। যেমন- প্রথমত, ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী উপাচার্য নিয়োগের যে নিয়ম, তা আসলেই কতটুকু অনুসরণ করা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যমান আইনে রাষ্ট্রায়ত্ত বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইউজিসির মধ্যকার সম্পর্ক কতটুকু সুনির্দিষ্ট করা আছে? রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য যেভাবে ইউজিসির তদন্ত কাজে বাধা দিয়েছেন এবং সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন করে কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনকে যেভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন, তা কি তিনি করতে পারেন? তৃতীয়ত. সিন্ডিকেটকে কুক্ষিগত করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য দীর্ঘদিন ধরে গোষ্ঠীস্বার্থে প্রতিষ্ঠানের নিয়োগবিধিকে যেভাবে বারবার পরিবর্তন করে থাকেন, তা কতটুকু যৌক্তিক?
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও সাবেক উপাচার্যদের যে ইতিহাস, তাতে পরিস্কার, প্রতিষ্ঠানটির নিয়োগবিধিকে তারা খেলার সামগ্রীতে রূপান্তর করতে পেরেছেন। বছর দেড়েক আগে উপাচার্য নতুন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেছিলেন, 'বর্তমান সময়ের মানুষ স্বার্থপরতার দাস'; যা তিনি বলেননি, তা হলো, এই সত্যের জলজ্যান্ত উদাহরণ তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি মাদ্রাসা স্থাপনের বন্দোবস্তও করেছেন তিনি। বিতর্ক হচ্ছে এই নিয়ে যে, সেটি তিনি তার নিজের নামে করেছেন; যেন নিজের নামে না করলেই বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন করে একটি মাদ্রাসা স্থাপন করা যায়। শেখ রাসেলের নামে বিদ্যালয় স্থাপনের উদ্দেশ্য যে আসলে অবৈধ নিয়োগকে বৈধতা দেওয়া, সেটি সবাই বোঝেন। দুঃখজনক হলো, বোঝেন না কেবল নীতিনির্ধারকরা!
মেয়ে ও জামাতার অবৈধ নিয়োগকে গ্রহণযোগ্য করতে অবৈধভাবেই নিয়োগ দিতে হয়েছে আরও ৩১-৩২ জনকে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে কী কারণে মেধাশূন্য হয়ে পড়ছে; কেন শিক্ষার্থীরা আর শিক্ষকদের কাউকে পথিকৃৎ ব্যক্তিত্ব ভাবতে পারছে না; কেন দেশের মানুষ আর কোনো শিক্ষকের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে বলে ওঠে না- 'তোমার আমার জীবনের কী এমন মূল্য আছে যে, বয়ে বেড়াতে হবে'; তা বোঝার জন্য তো এটুকুই যথেষ্ট।
ইউজিসি তদন্ত সাপেক্ষে যেসব সুপারিশ করেছে, সেগুলোকে তাই হেলাফেলা করার উপায় নেই। বরং বাস্তবায়ন করা হোক, এটাই সবার প্রত্যাশা। তবে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্বে আছেন, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের হয়তো বিভাগে শিক্ষকতার কাজে ফেরত পাঠানো হবে; কিন্তু তাদের কাছ থেকে কী শিক্ষা নেবে শিক্ষার্থীরা?
মনে পড়ছে স্পেনের পোর্ট সিটি বিলবাওয়ের মিগুয়েল ডি উনামুনোর কথা। ১৯৩৬ সালের শেষ দিনে মৃত্যু ঘটেছে তার। শিক্ষক ছিলেন তিনি। ছিলেন প্রাবন্ধিক, কবি, নাট্যকার ও ঔপন্যাসিক। ইউনিভার্সিটি অব সালামানকায় তিনি পর পর দুই পর্বে রেক্টরের দায়িত্ব পালন করেন। একবার ১৯০০ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত, আরেকবার ১৯৩০ থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত। স্পেনের সামরিক জান্তা মিগুয়েল প্রিমো দি রিভেরা ১৯২৪ সালে রেক্টর পদ থেকে অপসারণ করেন মিগুয়েল উনামুনোকে। তারপর থেকে নির্বাসিত ও পলাতক জীবন যাপন করতে হয় তাকে দীর্ঘ কয়েক বছর। ১৯৩০ সালে এই সামরিক জান্তার পতন ঘটে, তখন উনামুনো স্পেনে ফিরে আসেন এবং পুনরায় রেক্টরশিপ শুরু করেন।
সালামানকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে উনামুনো পুনরায় রেক্টর পদে যোগ দিয়ে তার প্রথম ভাষণ শুরু করেছিলেন এভাবে, 'অ্যাজ উই অয়্যার সেইং ইয়েস্টারডে...'। যেন তিনি মাঝখানের দিনগুলোতেও সেখানে ছিলেন। শিক্ষার্থীদের পাশেই ছিলেন, মধ্যে ছিলেন।
মুশকিল হলো, আমাদের এই অভিযুক্ত শিক্ষক বা শিক্ষকরা মোটেও স্পেনের ওই শিক্ষকদের সহযাত্রী নন। তারা দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শিক্ষা, মুক্তচিন্তা ও গবেষণার উপযোগী একটি স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার দায়িত্ব নিয়ে এলেও তা পালন করেননি। এবং একাডেমিক দায়িত্ব নিয়ে যখন ফের ক্লাসরুমে ফিরে যাবেন, তখন তাদের এমনটি বলার যোগ্যতাও নেই- অ্যাজ উই অয়্যার সেইং ইয়েস্টারডে...।
লেখক ও সাংবাদিক

e-mail : imtiar@gmail.com

বিষয় : বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন