খলিফা হারুন-অর-রশীদ কীভাবে একজন জেলের মনোবাঞ্ছা পূরণে তাকে একদিনের জন্য বাগদাদের তখতে বসিয়েছিলেন, আরব্য রজনীতে আমরা সেই বিবরণ পড়েছি। মুঘল সম্রাট হুমায়ুনও তার ভাইদের বিরোধিতা সত্ত্বেও এক ভিস্তিওয়ালাকে এক দিনের জন্য দিল্লির সিংহাসনে বসিয়েছিলেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। এসব ঘটনার কতটুকু বাস্তব আর কতটুকু নিছক গল্প, তার নিশ্চয়তা ইতিহাসের পাতায় পাওয়া যায় না। কিন্তু বিষয়টি যে কয়েক শতাব্দী পরেও যথেষ্ট কৌতূহলোদ্দীপক, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থায় কেউ চাইলেও এভাবে একজনকে শীর্ষ পদের সর্বময় ক্ষমতা হস্তান্তর করতে পারেন না। তারপরও গত কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন প্রশাসনিক অঞ্চল থেকে প্রায় একই ধরনের খবর আমরা দেখতে পাচ্ছি সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে। বিভিন্ন জেলায় মূলত বিদ্যালয়গামী নারী শিক্ষার্থীরা জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, নারী ও শিশুবিষয়ক কর্মকর্তা, মেয়রসহ মাঠ প্রশাসন ও স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে 'এক ঘণ্টার জন্য' আসীন হচ্ছে। বিষয়টি নেহাত প্রতীকী, সন্দেহ নেই। আমরা জানি, প্রায় এক দশক ধরে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা এই প্রচারণা কর্মসূচি গ্রহণ করে আসছে। এর মধ্য দিয়ে যে বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়- কন্যাশিশু বা নারী শিক্ষার্থীদের প্রতি অবহেলা বা ঔদাসীন্য সঙ্গত নয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও আরও বড় পদে এক ঘণ্টার জন্য দায়িত্ব পালন করেছে নারী শিক্ষার্থীরা। যেমন ডোমিনিকান রিপাবলিকে প্রেসিডেন্ট ও ফিনল্যান্ডে প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন হয়েছিল দু'জন কন্যাশিশু। বৃহস্পতিবারের সমকালে প্রকাশিত সচিত্র প্রতিবেদনে বগুড়া জেলা প্রশাসক হিসেবে পুষ্পা খাতুন ও ভোলার পুলিশ সুপার হিসেবে তাসনিম আজিজ রিমির আসীন হওয়ার বিষয়টিও অবশ্য বাংলাদেশের বাস্তবতায় খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। এর প্রশাসনিক প্রক্রিয়া কতটা বিধিসম্মত- সে প্রশ্ন সরিয়ে রেখে বলা যায়, কর্মকর্তাদের এমন সদিচ্ছা নিঃসন্দেহে সাধুবাদযোগ্য। যদি পদে থেকেও তারা নারীর প্রতি এভাবে সংবেদনশীল হন, তার তাৎপর্য হবে আরও ব্যাপক। মনে রাখতে হবে, বৈশ্বিক কর্মসূচিটি এমন সময় পালিত হচ্ছে, যখন গোটা দেশে নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা বেড়ে গেছে। প্রায় প্রতিদিন ধর্ষণ ও নির্যাতনের অবিশ্বাস্য সব খবর আমরা পাচ্ছি। এমনকি নির্যাতনকারী ও ধর্ষকদের আইনের আওতায় আনা, শাস্তি সত্ত্বেও নৃশংস হত্যাকাণ্ড থেমে নেই। অথচ নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ একটি উজ্জ্বলতর নাম।

আমাদের দেশে যেভাবে টানা তিন দশক ধরে প্রধানমন্ত্রী পদে একজন নারী আসীন হচ্ছেন, তার নজির বিশ্বের আর কোথাও নেই। বর্তমান জাতীয় সংসদে স্পিকার ও বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবেও রয়েছেন নারী। একটি সরকার ব্যবস্থার শীর্ষ তিন পদে নারী আসীন হওয়ার এমন নজির অতীতে বিশ্বের কোথাও দেখা গেছে কিনা- আমরা জানি না। এমনকি যেসব পদে নারী শিক্ষার্থী বা কন্যাশিশুরা এক ঘণ্টার জন্য আসীন হয়েছে, সেসব পদেও এখন নারী প্রশাসক বা জনপ্রতিনিধির সংখ্যা নেহাত কম নয়। তারপরও নারীর প্রতি অবহেলা, সহিংসতা কেন কমছে না? আমরা মনে করি, প্রতীকী পরিবর্তনের পাশাপাশি সমাজে ও রাষ্ট্রে নারীর সত্যিকার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই শুধু এই অন্ধকার আমরা কাটিয়ে উঠতে পারব। বলিউডের 'নায়ক' চলচ্চিত্রে এক দিনের জন্য মুখ্যমন্ত্রী পদ পেয়েও দেখা গেছে পরিবর্তন কত কঠিন। তাই চলচ্চিত্রটির প্রধান চরিত্র সত্যিকার মুখ্যমন্ত্রী পদে আসীন হওয়ার লড়াই শুরু করে। আমরা প্রত্যাশা করি, আজকে প্রতীকী পদে আসীন কন্যাশিশুরাও সেই শপথ গ্রহণ করবে। তাদের পাশে থাকবে দেশের সব নারী ও নারীর প্রতি সংবেদনশীল পুরুষরা। তাহলেই এই প্রতীকী পদের প্রকৃত বার্তা প্রাণ পাবে।

বিষয় : প্রতীকী পদের প্রকৃত বার্তা

মন্তব্য করুন