সাত সাগর তেরো নদীর ওপারে, সুদূর আমেরিকা মহাদেশে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন নিয়ে আমাদের সংবাদমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যম ও জনপরিসর যতটা আগ্রহী; ঘরের কাছে নাফ নদ পেরোলেই যে মিয়ানমার, একই বঙ্গোপসাগরের অভিন্ন তটরেখা যে দেশটিকে আমাদের সঙ্গে বেঁধে রেখেছে, সেখানকার নির্বাচন নিয়ে তার ভগ্নাংশ মনোযোগ দিতেও যেন আপত্তি। সন্দেহ নেই, রাজনৈতিক আদর্শ ও চর্চার দিক থেকে দেখলে যুক্তরাষ্ট্র ও মিয়ানমার দুই মেরুর বাসিন্দা। বাংলাদেশ যদিও তার পঞ্চাশ বছরের জীবনে মিয়ানমারের মতোই সামরিক শাসন ও বেসামরিক ব্যবস্থার 'মিশ্র অভিজ্ঞতা' সঞ্চয় করেছে, মূলধারার ঝোঁক যুক্তরাষ্ট্রের মতো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর দিকেই থাকে।

এসব 'তাত্ত্বিক' কারণে মিয়ানমারে আজ অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের আগ্রহ তলানিতে- এমন সরল নয় বিষয়টি। এর পেছনে একটি বড় 'ব্যবহারিক' কারণ নিঃসন্দেহে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশ সংলগ্ন রাখাইন বা আরাকান প্রদেশে মিয়ানমার সেনাবাহিনী, উগ্রপন্থি বৌদ্ধ সংগঠন কয়েক দশক ধরে হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও লুণ্ঠন চালিয়ে আসছে। সেখান থেকে প্রাণ বাঁচাতে ভিটেমাটি ছেড়ে সর্বশেষ ২০১৭ সালের আগস্টে এবং তার আগে-পরে কয়েক দশক ধরে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের তো বটেই, এখনও যারা রাখাইন প্রদেশে কোনোরকমে মাটি কামড়ে পড়ে রয়েছে বা যারা অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু শিবিরগুলোতে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে, তাদেরও কোনো ভোটাধিকার নেই। অথচ ব্রিটিশ শাসন অবসানের পর থেকে দেশটিতে যত সাধারণ ও স্থানীয় নির্বাচন হয়েছে, তার সবক'টিতে আর দশজন নাগরিকের মতোই অংশ নিয়েছিল রোহিঙ্গারা। তারা নির্বিঘ্নেই নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছে, ভোট দিয়েছে, নির্বাচিতও হয়েছে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- ১৯৫১ সালে অনুষ্ঠিত স্বাধীন বার্মার প্রথম নির্বাচনে অন্তত তিনজন সংসদ সদস্য ছিলেন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী থেকে নির্বাচিত। ১৯৫৬ সালের নির্বাচনে সংসদে রোহিঙ্গা প্রতিনিধিত্ব দ্বিগুণ- ছয়জন হয়েছিল। ১৯৬০ সালের নির্বাচনেও আরাকান থেকে পাঁচজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী থেকে। এরপর দীর্ঘ সামারিক শাসন পেরিয়ে ১৯৯০ সালে, সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানেই, যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেই নির্বাচনেও রোহিঙ্গাদের ভোটাধিকার ও প্রার্থিতা ছিল। অং সান সু চির দল এনএলডি থেকে রাখাইনে অন্তত চারটি সংসদীয় আসনে চারজন রোহিঙ্গা নেতা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সর্বশেষ ২০১০ সালেও মিয়ানমারের নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী।

কেবল নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও নির্বাচিত হওয়া নয়; বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সদস্যও হয়েছেন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা। ১৯৬০ সালের নির্বাচনের পর গঠিত মন্ত্রিসভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন সাবেক আকিয়াব বা বর্তমান সিত্তয়ে থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সুলতান মাহমুদ। এমনকি জেনারেল অং সান দেশটির স্বাধীনতার সময় যে অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রিসভা গঠন করেছিলেন, সেখানে শিক্ষা ও পরিকল্পনামন্ত্রী ছিলেন আব্দুল রাজ্জাক। ১৯৪৭ সালে জেনারেল অং সানের সঙ্গে যে ছয়জন মন্ত্রী 'শহীদ' হয়েছিলেন, তার মধ্যে তিনিও ছিলেন।

রোহিঙ্গাদের ভোটাধিকার নিছক ইতিহাসের বিষয়ও নয়। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরায় শুক্রবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উদ্ৃব্দত হয়েছেন বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শিবিরে অংশ নেওয়া মোহাম্মদ ইউসুফ। তিনি বলছেন- ১৯৭৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রতিটি সাধারণ ও স্থানীয় নির্বাচনে তিনি ভোট দিতে পেরেছেন। কিন্তু ২০১৫ সালের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো এবং ২০২০ সালে এসে দ্বিতীয়বারের মতো রোহিঙ্গারা ভোটাধিকার বঞ্চিত হয়। ২০১৫ সালেও আমরা অনেকে দুরাশা করেছিলাম যে, নির্বাচিত হওয়ার পর বার্মিজ গণতন্ত্রের 'প্রতীক' অং সান সু ুচি রোহিঙ্গাদের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেবেন। ভোটাধিকার দেওয়া দূরে থাক, তাদের নাগরিকত্বও কেড়ে নেওয়া হয়েছে সু চির নেতৃত্বে। কেবল নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া নয়; যেভাবে তাদের হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠনের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, তাতে করে গণতন্ত্রের প্রতীক সু চি এখন গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত। বিষয়টি কেবল নিপীড়িত এই জনগোষ্ঠীর জন্য নয়, তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল বাংলাদেশের জন্যও মর্মবেদনার বিষয়। তাই প্রতিবেশী দেশ হলেও মিয়ানমারের নির্বাচন নিয়ে কথা বলে 'কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে?'

প্রশ্ন হচ্ছে- এক রোহিঙ্গা ইস্যুর কারণেই কি বাংলাদেশ মিয়ানমারের নির্বাচন নিয়ে 'অভিমান' করে মুখ ফিরিয়ে বসে থাকবে? দুই দেশের সম্পর্কের পথে রাখাইন পরিস্থিতি একটি বড়সড় কাঁটা, সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে প্রতিবেশীসুলভ স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি মূলত এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে। এ ক্ষেত্রে মিয়ানমারেরই দায় প্রায় ষোলোআনা, অস্বীকারের অবকাশ নেই। কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুর সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ঢাকা কি রেঙ্গুনের সঙ্গে আর কোনো ইস্যুতেই 'এনগেজমেন্ট' বাড়াবে না? দ্বিতীয়পক্ষীয় একটি ইস্যুর সমাধান না হওয়া পর্যন্ত অন্য সব ইস্যুতে সম্পৃক্ত না হতে চাওয়া কূটনৈতিক যে কোনো বিবেচনাতেই বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না।

বাংলাদেশের অন্য প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে যদি তুলনা করি, তাহলে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের অমীমাংসিত ইস্যু আর নেই বললেই চলে। দুই দেশের সমুদ্র ও স্থলসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে। দাপ্তরিকভাবে স্বীকৃত তিন অভিন্ন নদী নিয়েও ঝামেলার আভাস নেই। দীর্ঘদিন সামরিক শাসন ছিল বলে অদ্ভুত এক উন্নাসিকতা নিয়ে আমরা দশকের পর দশক মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নির্লিপ্ত থেকেছি। অথচ মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে অন্য 'গণতান্ত্রিক' প্রতিবেশীগুলোর এমন ছুৎমার্গ ছিল না।

অনেকের মনে থাকার কথা, রোহিঙ্গা শরণার্থীর সর্বশেষ ঢেউয়ের আগে বিলম্বে হলেও বাংলাদেশ তার 'লুক ইস্ট' নীতি বাস্তবায়নে অগ্রসর হয়েছিল। মিয়ানমারের সঙ্গে সড়ক, রেল ও নৌ যোগাযোগ বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। এমনকি দেশটির বিপুল ও উদ্বৃত্ত জ্বালানি সম্পদেও বাংলাদেশ কীভাবে অংশীদারিত্ব বাড়াতে পারে, সে বিষয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছিল। এটা ঠিক, রাখাইনে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে তা ডিঙিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক সহজ নয়। কিন্তু প্রয়োজনে বিকল্প ভাবতে হবে। যেমন দেশটির অন্য রাজ্য চিন প্রদেশের সঙ্গেও রয়েছে আমাদের সীমান্ত। রাখাইন যখন 'ঝামেলাপূর্ণ' তখন প্রয়োজনে চিন প্রদেশ হয়ে যোগাযোগ, বাণিজ্যসহ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হবে।

বস্তুত রোহিঙ্গা ইস্যুতে অচলাবস্থা সত্ত্বেও অন্যান্য ইস্যুতে সচল সম্পর্ক যে ইতিবাচক, তার সর্বসাম্প্রতিক উদাহরণ আমরা দেখেছি পেঁয়াজ সংকটে। ভারত থেকে আকস্মিক পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের ঝাঁজে সামান্য স্বস্তি বাতাস এসেছিল মিয়ানমার থেকে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে সমাধান না হওয়া পর্যন্ত মিয়ানমারের সঙ্গে মুখ দেখাদেখি বন্ধের নীতি থেকে অতি অবশ্যই সরে আসতে হবে। বিশেষত বাংলাদেশের যখন সবেধন নীলমণি দুই প্রতিবেশী; তখন বৃহৎ প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থেও মিয়ানমার থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখা চলবে না।

এই পরিপ্রেক্ষিতে মিয়ানমারে নির্বাচন যেমনই হোক; কথিত অবাধ ও সুষ্ঠু হোক বা না হোক; সেই নির্বাচনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার থাকুক বা না থাকুক; প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশ নির্লিপ্ত থাকতে পারে না। 'একদা স্বদেশ' পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন নিয়ে তো বটেই; ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্য ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয়, মিজোরামের নির্বাচনও ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশের জন্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ, মিয়ানমারের নির্বাচন তার থেকেও বহুগুণ বেশি।

আরও কথা আছে- মিয়ানমারের নির্বাচন একরৈখিক নয়। রোহিঙ্গা ছাড়াও আরও কিছু জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। রাখাইনের মতোই আরও কিছু প্রদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নানা বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে 'নিরাপত্তা' ইস্যুতে। নির্বাচনের আগে গত এক সপ্তাহে দেশটির নির্বাচন কমিশন, প্রেসিডেন্টের দপ্তর, সেনা সদর ও অং সান সু চির দপ্তরের মধ্যে 'টাগ অব ওয়ার' চলছে। নির্বাচনে এবং নির্বাচন পরবর্তী সময়ে দেশটির রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি কোনদিকে যাবে, আমরা জানি না। বুদ্ধিমানের কাজ হচ্ছে, যে কোনো পরিস্থিতিতে যে কোনো পদক্ষেপের জন্য প্রস্তুত থাকা। আর তার পূর্বশর্ত হচ্ছে নির্বাচনটির দিকে নিবিড় নজরদারি।

অস্বীকার করা যাবে না, মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক সহজ নয়। কিন্তু মনে রাখা জরুরি, ভূ-রাজনীতিতে প্রতিবেশী পরিবর্তন করা যায় না। প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের মাত্রা পরিবর্তনে নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়। দুর্বল গণতন্ত্রের সমধান যেমন আরও গণতন্ত্র; তেমনই বিরূপ প্রতিবেশীর সমাধান হচ্ছে সম্পর্ক আরও বাড়িয়ে তাকে কম বিরূপ করে তোলা। নির্বাচনের আগে কয়েক বছর নষ্ট হয়েছে, পরে যেন আমরা কেবল রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বসে না থাকি। কে জানে, অন্যান্য ইস্যুতে সম্পর্কের মাত্রা রোহিঙ্গা ইস্যুতেও সমাধানের পথ খুলে দিতে পারে!

লেখক ও গবেষক

skrokon@gmail.com

বিষয় : প্রতিবেশী শেখ রোকন

মন্তব্য করুন