আদালতের রায় ও সাংবাদিকতার দায়

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয়

একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব শুধু সংবাদ পরিবেশনই নয়, বরং সত্য উন্মোচিত করে জাতির সামনে উপস্থাপন করা- অস্ত্র মামলার আসামি হয়ে দীর্ঘ ১৭ বছর আদালতের বারান্দায় ঘুরে বেড়ানো অশীতিপর রাবেয়া খাতুনকে অব্যাহতি সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ রায়ের এই ভাষ্যকে আমরা সানন্দে স্বাগত জানাই। বস্তুত বিচার বিভাগসহ রাষ্ট্রের প্রথম তিন স্তম্ভের চিন্তা ও তৎপরতা সম্পর্কে চতুর্থ স্তম্ভ সংবাদমাধ্যমে যে চিত্র বিভিন্ন সময়ে তুলে ধরা হয়, তাতে খোদ রাষ্ট্র ব্যবস্থাই সামষ্টিকভাবে শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হয়। সমকাল সূচনালগ্ন থেকেই এ দায়িত্ব আন্তরিকতা, সংবেদনশীলতা, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে পালন করে আসছে। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা আমাদের সম্পাদকীয় নীতির অনিবার্য ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। আলোচ্য রাবেয়া খাতুনের মামলার দীর্ঘসূত্রতা এবং একজন প্রবীণ নাগরিকের দুর্ভোগ নিয়ে গত বছর এপ্রিলের ২৫ তারিখ সমকালের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত সংবাদটি ছিল সেই দায়িত্বশীলতারই ধারাবাহিকতা। আমরা আনন্দিত যে, সংবাদটি বিষয়ে একজন আইনজীবী উচ্চ আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এর ফলে কয়েক দফা শুনানি শেষে গত বছর অক্টোবর মাসে রাবেয়া খাতুন ওই মামলা থেকে অব্যাহতি লাভ করেন। সম্প্রতি প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে আমরা দেখছি, উচ্চ আদালত সমকাল ও সংশ্নিষ্ট প্রতিবেদকের দায়িত্বশীলতার উচ্চ প্রশংসা করেছেন। আমরা মনে করি, এর ফলে সমকালের দায়িত্বশীলতা আরও জোরালো হলো। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, সত্য উন্মোচিত করে তা জাতির সামনে তুলে ধরার দায়িত্ব পালন সহজ নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, 'সহজ কথা যায় না বলা সহজে'। সত্য কথা বলা বা চিত্র তুলে ধরার ক্ষেত্রে তা নিঃসন্দেহে আরও কঠিন। সত্য চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে সংশ্নিষ্ট পক্ষগুলোর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ রোষানলে তো পড়তে হয়ই; খোদ আদালতের সামনেও সংবাদমাধ্যমকে দাঁড়াতে হয় দৃশ্যত অভিযুক্ত হিসেবে। এ প্রসঙ্গে আমরা অস্বীকার করি না যে, সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকতার মানদণ্ড রক্ষায় সবাই সমান সামর্থ্য অর্জন করতে পারে না।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত ত্রুটিবিচ্যুতি ঘটতে পারে। কিন্তু এটাও স্বীকার করতে হবে যে, অনেক সময় সংবাদমাধ্যম অন্যায্য অভিযোগেরও শিকার হয়। আমাদের মনে আছে, সমকালের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক প্রয়াত গোলাম সারওয়ারসহ দেশের প্রথিতযশা তিনজন সম্পাদক ২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে এমনই এক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন। সেই সময় তার সম্পাদনায় প্রকাশিত দৈনিক যুগান্তরে 'সম্পাদকের জবানবন্দি' শীর্ষক এক বিশেষ নিবন্ধে তিনি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটির আদ্যোপান্ত প্রকাশ করেছিলেন। সেখানে তিনি যথার্থই বলেছিলেন, 'সরকার কিংবা বিরোধী দলের রাজনীতিকরা যখনি রাজনীতির ক্ষুদ্র স্বার্থে আদালতের মর্যাদার ওপর আঘাত হানার চেষ্টা করেছেন, তখনি আদালতের পাশে থেকেছে এ দেশের সংবাদপত্র।' আমরা মনে করি, দেড় দশক পরও এই সম্পর্ক সমান সঙ্গত। স্বস্তির বিষয়, গত দেড় দশকে সংবাদমাধ্যম ও বিচার বিভাগের মধ্যে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন বা অভিমতের সূত্র ধরে উচ্চ আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রায় বা নির্দেশনা প্রদান করেছেন- সাম্প্রতিক সময়ে এমন দৃষ্টান্ত আগের তুলনায় বেড়েছে। অতি সম্প্রতি আমরা দেখেছি, টেলিভিশন টকশো দেখে মধ্যরাতে ভার্চুয়াল আদালত বসিয়ে দুই শিশুকে পিতৃগৃহে তুলে দিয়েছেন উচ্চ আদালত। বিচার বিভাগের এমন স্বতঃস্ম্ফূর্ততা আমাদের কেবল উজ্জীবিত করে না; সংবাদমাধ্যম ও বিচার বিভাগের সম্পূরক সম্পর্কের বিষয়টিও স্পষ্ট করে তোলে। আমরা বিশ্বাস করি, সত্য চিত্র জাতির সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার দায় ও দায়িত্বের ক্ষেত্রে রাবেয়া খাতুন সম্পর্কে আলোচ্য রায়টি মাইলফলক হয়ে থাকবে। বিচার বিভাগসহ রাষ্ট্রের তিন স্তম্ভের সঙ্গে চতুর্থ স্তম্ভও এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশকে আরও ন্যায্য ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য দায়িত্বশীল ভূমিকা অব্যাহত রাখবে।