স্মরণ

বঙ্গবন্ধুর সহচর হাবু মিয়া

প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

মজিবর রহমান

বঙ্গবন্ধু সরকারের পাট প্রতিমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা মোসলেম উদ্দিন খান হাবু মিয়ার আজ ২১ নভেম্বর অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী। এক কঠিন সময়ে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মানিকগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা মোসলেম উদ্দিন খান হাবু মিয়া পরিণত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর নীতি ও আদর্শের এক মূর্ত প্রতীক হিসেবে। তিনি নিজেকে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। তার কর্মময় জীবনের ব্যাপ্তি ছিল বিশাল ও গভীর। তার মতো মহৎ হৃদয়বান জাতীয় নেতার সাহচর্য লাভের সুযোগ হয়েছে আমার। আমি একজন বড়মাপের মানুষের সেবা ও সান্নিধ্য লাভ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। তার সাহচর্যে যা কিছু শিখেছি, দেখেছি, তা আমাকে সবসময় অভিভূত করেছে। বিশাল হৃদয়ের অধিকারী এই জননেতা সব শ্রেণি-পেশার মানুষের বিপদ-আপদে আপনজন হিসেবে হৃদয় দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন। তার ব্রত ছিল মানবকল্যাণ। আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে সর্বদা তার উপস্থিতি প্রত্যেক নেতাকর্মীর মধ্যে প্রাণসঞ্চার করত।
দুঃসময়ে তিনি কখনও নির্লিপ্ত থাকেননি। একদিন হঠাৎ আমাদের সবার শ্রদ্ধেয় নেতার অসুস্থতার সংবাদ পেয়ে মানিকগঞ্জ-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার এবিএম আনোয়ার হক, দৌলতপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট আজিজুল হক, সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফরিদ আহমেদ ও অ্যাডভোকেট হারুন অর রশিদসহ দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে ঢাকার পরিবাগে মডিউল হাসপাতালে তাকে দেখতে গিয়েছিলাম। দেখা হলো কিন্তু কথা হলো না। নিথর-নিস্তব্ধ; কথা বলতে পারছেন না। শুধুই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলেন আমাদের দিকে। ২০১৩ সালের ১৬ নভেম্বর, সেই দিনটাই ছিল নেতার সঙ্গে আমার শেষ দেখা। ২০১৩ সালের ২১ নভেম্বর রাত ১টায় তিনি স্ত্রী, একমাত্র ছেলে, তিন কন্যাসহ বহু আত্মীয়স্বজন ও রাজনৈতিক নেতাকর্মী রেখে এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে না ফেরার দেশে চলে যান। দীর্ঘ ৮৫ বছরের জীবন পরিক্রমায় '৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি যুক্ত ছিলেন। মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্টম্ন বারবার তাকে তাড়িত করেছে। তার দীর্ঘ জীবন কেটেছে মানুষের মুক্তির সংগ্রামে জীবন উৎসর্গ করে। মনিকগঞ্জ সদরের গড়পাড়ায় এক সল্ফ্ভ্রান্ত, ধনাঢ্য মুসলিম পরিবারে ১৯৩০ সালে জন্মগ্রহণ করেন এই মানবপ্রেমী মানুষটি। বীর মুক্তিযোদ্ধা মোসলেম উদ্দিন খান হাবু মিয়ার মতো ত্যাগী নেতার আজ খুবই প্রয়োজন। তিনি সারাজীবন বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে লালন করে গেছেন।
১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করেন। ১৯৫৫ সালে এলএলবি পাস করার পর ১৯৫৭ সালে মানিকগঞ্জ বারে আইন পেশায় যোগ দেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা মোসলেম উদ্দিন খান হাবু মিয়া আইন পেশায় জীবনের ৫০ বছরের বেশি সময় যুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। সব শ্রেণি-পেশার মানুষের ভালোবাসার এ মানুষটি তিনবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। মানিকগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি জেলা বারের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন দীর্ঘদিন। ১৯৬৫ সালে তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন; পরে তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ১৯৬৬ সালে ৬ দফার দাবিতে ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নিয়ে গোটা মানিকগঞ্জে জনমত গড়ে তোলেন। ১৯৬৯ সালে ১১ দফার দাবিতে ছাত্র আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় সহযোগিতা করেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি আবার আওয়ামী লীগের মনোনয়নে এমএনএ নির্বাচিত হন। স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয় অংশ নেন এবং মুজিবনগর সরকারের নির্দেশে ভারতের বিহার রাজ্যে অন্যান্য এমএনএ ও পরে এমপিদের সঙ্গে এক মাসের সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে  তিনি প্রথম জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং বঙ্গবন্ধু সরকারের পাট প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন  করেন। আমৃত্যু মানবমুক্তির স্বপ্টম্ন দেখা এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

সাংবাদিক

mojibor182@gmail.com