সংস্কৃতি

লোকশিল্পীদের সুরক্ষায় ব্যবস্থা নিন

প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

নূরুননবী শান্ত

বাংলাদেশের পরিচয়-স্বাতন্ত্র্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক উপাদানগুলোকে। বিশ্বের বেশিরভাগ জনজাতির ক্ষেত্রেই এ কথা প্রযোজ্য। সংগত কারণে সব আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালার আলোকে প্রণীত ইউনেস্কোর বিশ্ব সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের সুরক্ষাবিষয়ক ঘোষণা ১৯৭২ এবং পরিবর্তনশীল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সুরক্ষা সনদ ২০০৩ অনুসারে, বাংলাদেশ ভূখণ্ডের নিজস্ব পরিচয় চিহ্নের ধারক, বাহক ও প্রকাশক ঐতিহ্য সম্পদগুলো সুরক্ষায় বাংলাদেশ সরকার রাষ্ট্রের মালিক জনগণের কাছে ও আন্তর্জাতিক সমাজের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাস্তবে আমরা দেখতে পাচ্ছি- মুক্তবাজারের আগ্রাসন, প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক উন্নয়ন ভাবনা, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং আকাশ সংস্কৃতিসহ যোগাযোগ প্রযুক্তির তথাকথিত বিপ্লবের জোয়ারে দ্রুতই ভেসে যেতে শুরু করেছে ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির মৌলিক উপাদানগুলো। এরই সঙ্গে ভেসে যাচ্ছে এ ভূখণ্ডের আদি মূল্যবোধের ঐক্য। সেখানে জায়গা করে নিচ্ছে অপসংস্কৃতির সন্ত্রাস, যার প্রকাশ ঘটছে সীমাহীন সম্পদাকাঙ্ক্ষা, সমাজ ও রাষ্ট্রের রল্প্রেব্দ রল্প্রেব্দ ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতি, অসহিষ্ণুতা, হত্যাকাণ্ড, কিশোর গ্যাংয়ের প্রাদুর্ভাব, ক্ষমতার মাস্তানি ইত্যাদিতে। এর মধ্যেও আশা জাগায় জনগণের জীবনের সুরক্ষার জন্য সরকারের নূ্যনতম প্রচেষ্টাগুলো। করোনার সংক্রমণ থেকে জনসাধারণকে সুরক্ষা দিতে সরকার বেশকিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে। বিশেষ করে আয়ের উৎস হারিয়ে জীবনযাপনের অনিরাপত্তার ঝুঁকিতে পতিত নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্য ও অর্থ সহায়তা দিতে সরকারের তৎপরতা লক্ষণীয়। তবে, এ ক্ষেত্রে বাংলার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি সেবায় নিবেদিত সাধক-শিল্পীদের প্রতি উপেক্ষা লক্ষণীয়।
করোনা মহামারির প্রাদুর্ভাবের পর থেকেই কবিগান, পুঁথি, জারিগান, গম্ভীরা, আলকাপ, কুশানগান, বাউলগান, যাত্রাপালা, সার্কাসসহ শত প্রকার লোক-ঐতিহ্য পরিবেশনার সাধক-শিল্পীরা সম্পূর্ণ আয়-উপার্জনহীন হয়ে পড়েছেন। বিগত বৈশাখ ঘিরে কোনো আয়োজন না থাকায় তারা যেমন অনেকেই পথে বসেছেন, দুর্বল হয়ে পড়েছে লোকনাট্য দলগুলো; তেমনি বাংলার চিরায়ত পরিবেশনা শিল্পের মৌসুম শীতকালেও এবার কোনোরূপ আনুষ্ঠানিক আয়োজনের সম্ভাবনা না থাকায় লোকশিল্পীরা হঠাৎ পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন। ফলে হাজার বছরের চিরায়ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বলা চলে, আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী পরিচয়চিহ্ন মুছে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জাতীয় জীবনের জন্য এ এক বিপজ্জনক পরিস্থিতি।
গ্রামীণ বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক পরিবেশনার ধারা শুধু সর্বসংকটোর্ধ্ব নির্মল আনন্দেরই উৎস নয়, লোকায়ত জ্ঞান চর্চারও প্রধান মাধ্যম। পারিবারিক-সামাজিক মূল্যবোধের বিকাশসহ লোকশিক্ষা বিস্তারে প্রকৃতপক্ষে এসব অধুনা উপেক্ষিত পরিবেশনা শিল্পই বাংলাদেশসহ বৃহত্তর বাংলা অঞ্চলে সুদূর ঐতিহাসিক কাল থেকেই সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকা রেখেছে। এ ভূখণ্ডের সব শ্রেণির মানুষকে জীবন উপলব্ধি করার, দ্বন্দ্ব পরিহার করে সম্প্রীতির পথে ঐক্যবদ্ধ থাকার, শান্তিপূর্ণ আধ্যাত্মিক জ্ঞানলাভের মধ্য দিয়ে অহিংস পথের সন্ধান দিয়ে এসেছে পালাগান, জারি মার্সিয়া, গিদালের আসর, কেচ্ছার আসরসহ বহুধারার লোকসংস্কৃতি পরিবেশনাগুলো। বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ও লোকসংস্কৃতি গবেষক সাইমন জাকারিয়া বিরচিত 'সাধক কবিদের রচনায় বঙ্গবন্ধুর জীবন ও রাজনীতি' নামক গ্রন্থ থেকে আমরা জানতে পারি, প্রান্তিক জনগণের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনেও লোকশিল্পীরা অপরিসীম ভূমিকা রেখেছেন, আজও রেখে চলেছেন। এ দেশের সরাচিত্র, পটচিত্র, পুঁথি, বাউলগান, বয়াতি গানে চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিফলন বিরল নয়। কিন্তু এটি অত্যন্ত দুঃখের যে, বাংলাদেশের লোকশিল্পীদের কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা সরকারি-বেসরকারি কোনো পর্যায়েই নেই! পরিহাসের বটে যে, স্বাধীনতার পর থেকেই রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্য সুরক্ষায় যথাযথ ভূমিকা পালনে অঙ্গীকারবদ্ধ হলেও রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানই লোকশিল্পীদের তালিকা প্রণয়ন ও হালনাগাদের উদ্যোগ গ্রহণে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। ফলে যে মানুষগুলো সম্পদাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে গান গেয়ে, পালা পরিবেশন করে বেঁচে থাকেন, মানুষকে শান্তি ও সম্প্রীতির পথ দেখান, জাতীয় সংস্কৃতিকে জীবিত রাখেন, সংকটকালে তারা খেতে পান কি পান না, চিকিৎসাসেবা পান কি পান না, তাদের সন্তানরা খাদ্য-পুষ্টি-শিক্ষা অধিকার লাভ করল কি করল না ইত্যাদি বিষয়ে খোঁজ নেওয়ার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া আপাত নেই। বেতার-টেলিভিশনে অন্তর্ভুক্ত বা শিল্পকলা একাডেমির মুখচেনা সামান্য সংখ্যক শিল্পী ও লোকসংস্কৃতি পরিবেশনার দল সাধক লোকশিল্পীরা সমাজের কতটা প্রতিনিধিত্ব করেন, তা প্রশ্নাতীত নয়। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি বা বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের সার্বিক পরিসরের লোকশিল্প চর্চাকারী লোকশিল্পী ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বৈচিত্র্যময় উপাদানে
র তালিকা করতে কেন ব্যর্থ হয়? আমাদের পর্যবেক্ষণ হলো, এই প্রতিষ্ঠানগুলো বৃহত্তর গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনেই ব্যর্থ! মুখচেনা পোশাকি লোকসংগীত গায়কদেরই তারা লোকশিল্পী হিসেবে চিহ্নিত করে। এই অবস্থার পেছনে আছে প্রাতিষ্ঠানিক হীনম্মন্যতা ও অজ্ঞতা।
সম্প্রতি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ভাবনগর ফাউন্ডেশনের একক উদ্যোগে বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার লোকশিল্পীদের একটি প্রাথমিক তালিকা প্রণীত হয়েছে। এই তালিকা প্রণয়নের একক উদ্যোক্তা ভাবনগরের সভাপতি ড. সাইমন জাকারিয়া কয়েকটি উন্মুক্ত ভিডিওবার্তায় তুলে ধরেছেন তালিকা প্রণয়নের সম্পূর্ণ পদ্ধতি। তালিকাটি একটি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে। ভিডিওবার্তায় তিনি এই কাজ করার চ্যালেঞ্জগুলো যেমন তুলে ধরেছেন, তেমনি বলেছেন, এটি একটি প্রাথমিক তালিকামাত্র এবং একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা করা যে সম্ভব, এটি তার একটি সফল উদাহরণ। ভাবনগরের স্বেচ্ছাসেবীরা দীর্ঘমেয়াদে লোকশিল্পীদের সঙ্গে থেকে লোকশিল্প বিষয়ে প্রত্যক্ষ জনসংস্কৃতি সমীক্ষণে নীরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে করতে যে গভীর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, সেই অভিজ্ঞতাই তাদের পাথেয়। সংশ্নিষ্ট কমিউনিটির অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতিতেই তারা উল্লিখিত প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করেছেন। প্রতিটি জেলার প্রকৃত লোকশিল্পীদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ ও আত্মিক সম্পর্কের বলে এই অসম্ভব কাজটি তারা সম্পন্ন করেছেন। আমাদের জানামতে, এটাই বাংলাদেশের লোকশিল্পীদের প্রথম কোনো সমন্বিত তালিকা। তবে, এ ধরনের কাজের জন্য যে কারিগরি ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক সমর্থন প্রয়োজন তার জোগান নিাশ্চিত করা একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বা একজন ব্যক্তির পক্ষে নিঃসন্দেহে দুরূহ।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকেই এগিয়ে আসতে হবে এই তালিকা পূর্ণাঙ্গ করার কাজে। আসলে সরকারি উদ্যোগের বাইরে এ ধরনের তালিকা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃত হওয়ার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। যে কোনো রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংক্রান্ত যে কোনো তালিকা আন্তর্জাতিক সমাজে স্বীকৃত হলে রাষ্ট্রপক্ষের পাশাপাশি সেগুলোর সুরক্ষার দায়িত্ব নেওয়ার বৈশ্বিক দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। কেননা, জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থার নীতিমালা অনুযায়ী নির্দিষ্ট রাষ্ট্রসীমানায় অবস্থিত প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। করোনার মতো মহাদুর্যোগে জাতির পরিচয়-স্বাতন্ত্র্যবাহী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক-বাহক লোকশিল্পীদের পাশে দাঁড়াতে হলে সর্বপ্রথম প্রয়োজন তাদের একটি পূর্ণাঙ্গ নির্ভেজাল তালিকা। সারাদেশের মূলধারা ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার জন্য প্রথমত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে লোকসংস্কৃতি পরিবেশক সাধক-শিল্পীদের। কেননা, শিল্পী বাঁচলে শিল্প বাঁচবে।
গল্পকার, অনুবাদক

বিষয় : সংস্কৃতি